ঢাকা শনিবার, ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ২৪ মাঘ ১৪৩২ | বেটা ভার্সন

বাংলাদেশসহ চারদেশীয় ফোরাম করতে চায় পাকিস্তান

বাংলাদেশ, চীন ও মিয়ানমারকে নিয়ে পাকিস্তান একটি আঞ্চলিক ফোরাম গঠনের প্রস্তাব দিয়েছে
বাংলাদেশসহ চারদেশীয় ফোরাম করতে চায় পাকিস্তান

পারস্পরিক সহযোগিতার মাত্রা আর মজবুত করতে বাংলাদেশ, চীন ও মিয়ানমারকে নিয়ে পাকিস্তান একটি আঞ্চলিক ফোরাম গঠনের প্রস্তাব দিয়েছে। কয়েক মাস ধরে জোট গঠনের প্রক্রিয়া নিয়ে সংশ্লিষ্টদের আলোচনা ও বৈঠক চলছে। এই ফোরাম গঠনে বাংলাদেশ রাজি থাকলে শিগগির ইসলামাবাদে বৈঠক করবে পাকিস্তান।

কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে, পাকিস্তান চার দেশীয় আঞ্চলিক ফোমার গঠনে জানুয়ারির শেষ সপ্তাহে বাংলাদেশের উচ্চপর্যায়ে প্রস্তাব দেয়। এমনকি ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের আগেই ইসলামাবাদে বাংলাদেশ, চীন, মিয়ানমারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের নিয়ে বৈঠক আয়োজনের প্রস্তুতি নিয়েছে। সবকিছু ঠিক থাকলে কয়েক দিনের মধ্যেই ইসলামাবাদে বৈঠক করতে চায় পাকিস্তান। কিন্তু নির্বাচনের দিনক্ষণ ঘনিয়ে আসায় এখনই এমন কোনো বৈঠক বা সভায় যোগ দেওয়ার পক্ষপাতী নয় বাংলাদেশ। অন্তর্বর্তী সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের এক কর্মকর্তা জানান, পাকিস্তানের প্রস্তাবে প্রাথমিকভাবে ইতিবাচক সাড়া দিয়েছে বাংলাদেশ। পাকিস্তান এই বৈঠক ফেব্রুয়ারির প্রথমার্ধে করার বিষয়ে বেশ আগ্রহী। পররাষ্ট্র উপদেস্টা মো. তৌহিদ হোসেন বলেন, চার দেশকে নিয়ে পাকিস্তান একটি সহযোগিতার কাঠামো গড়ে তোলার প্রস্তাব দিয়েছে। এ জন্য দেশটি একটি বৈঠক করতে চায়। অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদ এখন শেষ পর্যায়ে। তাই এই বৈঠক নতুন সরকার আসার পর হতে পারে বলে জানানো হয়েছে ইসলামাবাদকে।

কবে ও কীভাবে পাকিস্তানের প্রস্তাব : গত মাসে পাকিস্তানের উপপ্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দারের সঙ্গে পররাষ্ট্র উপদেষ্টার বেশ কয়েকবার কথা হয়েছে। বাংলাদেশের বাইরে একাধিক বহুপক্ষীয় ফোরামের বৈঠকের ফাঁকে তারা দুজন আলোচনায় বসেছিলেন। এর পাশাপাশি জানুয়ারিতে অন্তত তিনবার তাদের মধ্যে ফোনালাপ হয়। প্রতিবারই ইসহাক দারকে ফোন করেন তৌহিদ হোসেনকে। এসব আলোচনায় দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের পাশাপাশি আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক নানা বিষয়ে একে অন্যকে সহযোগিতার বিষয়ে কথা হয়। গত ২৪ জানুয়ারি পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ফোন করেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্র উপদেষ্টাকে। ইসলামাবাদে মিয়ানমারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী থান সুয়ের দ্বিপক্ষীয় সফরের দুই দিন আগে ইসহাক দারের সঙ্গে তৌহিদ হোসেনের এই ফোনালাপ হয়।

জানা গেছে, দুজনের মধ্যে ১৫ মিনিটের বেশি সময় ধরে আলাপ চলে। ওই ফোনালাপে দ্বিপক্ষীয় ও আঞ্চলিক নানা বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়। দ্বিপক্ষীয় বিষয়ের মধ্যে ১৪ বছর পর ঢাকা- করাচি সরাসরি বিমান চলাচল আবার চালু করা (যা ১৪ বছর বিরতির পর ২৯ জানুয়ারি চালু হয়েছে), করাচি- চট্টগ্রাম রুটে সরাসরি পণ্যবাহী জাহাজ চলাচল শুরু, ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন- পরবর্তী সময়ে দুই দেশের উচ্চপর্যায়ের সফর বিনিময়, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং পাকিস্তানের জেএফ- ১৭ যুদ্ধবিমান কেনার মতো বিষয়গুলো আলোচনায় আসে।

মিয়ানমারের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ইসলামাবাদ সফরের প্রসঙ্গ টেনে পাকিস্তানের উপপ্রধানমন্ত্রী জানতে চান, রোহিঙ্গা ইস্যুটি তিনি উত্থাপন করতে পারেন কি না, এ বিষয়ে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র উপদেষ্টার মতামত কী? এ সময় তৌহিদ হোসেন তাকে রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে সহযোগিতায় ভূমিকা রাখতে পারেন বলে মত দেন।

ত্রিদেশীয় ফোরামের বিকল্প : গত বছরের জুনে চীনের কুনমিংয়ে একটি অনানুষ্ঠানিক বৈঠকের আয়োজন করে ত্রিদেশীয় ফোরাম গঠনে সক্রিয় ছিল বেইজিং ও ইসলামাবাদ। বাংলাদেশ সম্মত না হওয়ায় শেষ পর্যন্ত তা আলোর মুখ দেখেনি। কুনমিংয়ের পাশাপাশি ওই উদ্যোগ নিয়ে ঢাকা এবং কুয়ালামাপুরে একাধিক আলোচনায় বিষয়টি বাংলাদেশের কাছে তুলেছিল চীন ও পাকিস্তান।

বেইজিং ও ইসলামাবাদের ধারাবাহিক প্রচেষ্টা সত্ত্বেও বাংলাদেশ- চীন- পাকিস্তান ত্রিপক্ষীয় আঞ্চলিক জোট সক্রিয় হতে পারেনি। বাংলাদেশের যুক্তি ছিল, শ্রীলঙ্কা বা নেপাল- এমন কোনো চতুর্থ দেশকে যুক্ত না করলে দক্ষিণ এশিয়ায় এ ধরনের জোট ফলপ্রসূ হবে না। জানুয়ারির শুরুতে পাকিস্তান ইসলামাবাদে তিন দেশের একটি আনুষ্ঠানিক বৈঠকের প্রস্তাব দেয়। তবে বাংলাদেশ ওই প্রস্তাবিত বৈঠকে অংশ নিতে অসম্মতি জানিয়ে বলে, আসন্ন নির্বাচনের পর গঠিত সরকারই এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে।

২৪ জানুয়ারি ইসহাক দার ইসলামাবাদে বাংলাদেশ, চীন, মিয়ানমার ও পাকিস্তানকে নিয়ে একটি আঞ্চলিক বৈঠক আয়োজনের প্রস্তাব দেন। এর জবাবে তৌহিদ হোসেন জানান, প্রথম বৈঠকটি যুগ্ম সচিব পর্যায়ে হতে পারে। তবে ইসহাক দার অতিরিক্ত সচিব পর্যায়ে বৈঠক করার প্রস্তাব দেন। শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত হয়, চার দেশের প্রথম বৈঠক ইসলামাবাদে অতিরিক্ত সচিব পর্যায়ে অনুষ্ঠিত হবে; যদিও বাংলাদেশের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা বৈঠকটি ফেব্রুয়ারির নির্বাচন পর্যন্ত স্থগিত রাখতে চান। তবে পাকিস্তান নির্বাচনের আগেই বৈঠকটি আয়োজন করতে আগ্রহী। তবে অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদ শেষের সময়ে এ ধরনের উদ্যোগে যুক্ত হওয়া কতটা সমীচীন হবে, সেটি ভেবে তারপরই সিদ্ধান্ত নেওয়ার পক্ষপাতী সাবেক রাষ্ট্রদূত এবং বাংলাদেশ এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউটের (বিইআই) প্রেসিডেন্ট এম হুমায়ুন কবির।

এম হুমায়ুন কবির বলেন, বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার প্রেক্ষাপটে বঙ্গোপসাগর গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ফলে এখানে চীন একধরনের আগ্রাসী মনোভাব নিয়ে নানা উদ্যোগ নিচ্ছে। আবার বাংলাদেশে ’২৪ সালের আগস্ট–পরবর্তী রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর পাকিস্তানও নানাভাবে সক্রিয় হয়ে উঠেছে। তাই সহযোগিতা শেষ পর্যন্ত চূড়ান্তভাবে দ্বিপক্ষীয় ও আঞ্চলিক ইস্যু নির্দিষ্ট গণ্ডিতে সীমিত থাকছে না। এর পাশাপাশি প্রতিনিয়ত পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ ধাপে এসে নতুন এমন কোনো উদ্যোগে সক্রিয়ভাবে যুক্ত হওয়াটা কতটা সমীচীন, সেটা ভাবা দরকার।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত