ঢাকা সোমবার, ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ৩ ফাল্গুন ১৪৩২ | বেটা ভার্সন

কিছু বিচ্যুতি থাকলেও ভোট ছিল শান্তিপূর্ণ ও সুষ্ঠু

কিছু বিচ্যুতি থাকলেও ভোট ছিল শান্তিপূর্ণ ও সুষ্ঠু

কিছু বিচ্ছিন্ন অনিয়ম ও পর্যবেক্ষকদের কাজে বাধার ঘটনা ঘটলেও ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট সামগ্রিকভাবে শান্তিপূর্ণ, সহিংসতামুক্ত এবং সুষ্ঠু পরিবেশে অনুষ্ঠিত হয়েছে বলে জানিয়েছে হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস)। সংস্থাটি মনে করে, পূর্ববর্তী নির্বাচনের তুলনায় এবারের নির্বাচন ছিল বেশি নিরপেক্ষ ও উৎসবমুখর। গতকাল রোববার জাতীয় প্রেসক্লাবের জহুর হোসেন চৌধুরী হলে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এই পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদন তুলে ধরেন এইচআরএসএসের নির্বাহী পরিচালক ইজাজুল ইসলাম। এইচআরএসএসের নির্বাহী পরিচালক জানান, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট পর্যবেক্ষণের জন্য আমরা দেশের ৬৪ জেলায় ৫৬৫ জন পর্যবেক্ষক নিয়োগ করি। এসব পর্যবেক্ষক ১০০টি আসনের ১ হাজার ৭৩৩টি ভোটকেন্দ্রে নির্বাচনী কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করেন। এর মধ্যে ৩৪৭ জন পর্যবেক্ষক ভোট গণনার সময় সরাসরি উপস্থিত থেকে গণনা কার্যক্রম প্রত্যক্ষ করেন। তবে অন্তত ৪৮ জন পর্যবেক্ষককে ভোট গণনা কক্ষে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি বা বাধার মুখে পড়তে হয়েছে।

তিনি বলেন, সারাদেশে ভোট গ্রহণ সামগ্রিকভাবে সুষ্ঠু হলেও অন্তত ২১টি কেন্দ্রে কিছু অনিয়মের প্রাথমিক তথ্য পাওয়া গেছে। সিলেট- ৪ আসনের কাগাইল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে একটি রাজনৈতিক দলের কর্মীদের কেন্দ্র দখলের অভিযোগ পাওয়া গেছে। সুনামগঞ্জের একটি কেন্দ্রে পর্যবেক্ষককে হেনস্থা করে বের করে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। হবিগঞ্জ- ৩ আসনের একটি কেন্দ্রে পর্যবেক্ষকদের প্রবেশে বাধা দেওয়া হয়। ভোলার কিছু কেন্দ্রে হামলা ও ভোট জালিয়াতির অভিযোগ পাওয়া গেছে। এ ছাড়া বরিশাল বিভাগের কয়েকটি কেন্দ্রে ভোটারদের ভয়ভীতি প্রদর্শন, ময়মনসিংহ বিভাগের একটি কেন্দ্রে ৩০০ ব্যালট পেপার ছিনতাই এবং কিছু কেন্দ্রে ব্যালট বাক্সের নিরাপত্তা ব্যবস্থা খোলা থাকার অভিযোগ পাওয়া গেছে। ইসলামপুর থানার গাইবান্দা ইউনিয়নের কয়েকটি কেন্দ্রে অস্বাভাবিক হারে ভোট পড়ার তথ্য পাওয়া গেছে। একটি কেন্দ্রে দুপুর ২টার মধ্যে প্রায় ৮০ শতাংশ ভোট পড়েছে বলে জানানো হলেও প্রিজাইডিং কর্মকর্তা এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য দিতে পারেননি। রংপুর, কুমিল্লা, রাজশাহী, ঢাকা ও গাজীপুরের কিছু কেন্দ্রে পর্যবেক্ষকদের প্রবেশে বাধা, গণনা পর্যবেক্ষণে প্রতিবন্ধকতা এবং মৌখিকভাবে হেনস্থার ঘটনা ঘটেছে। কিছু কেন্দ্রে ভোটের আগে ব্যালট পেপারে স্বাক্ষর ও সিল দেওয়ার অভিযোগ এবং ভোটারদের ভোট আগে দেওয়া হয়ে যাওয়ার অভিযোগও পাওয়া গেছে। যদিও কয়েকটি ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জ ভোট দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়।

ইজাজুল ইসলাম বলেন, তবে এসব বিচ্ছিন্ন ঘটনার বাইরে বড় ধরনের সহিংসতা বা গুরুতর অনিয়ম আমাদের পর্যবেক্ষণে আসেনি। সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজনের জন্য অন্তর্বর্তীকালীন সরকার, নির্বাচন কমিশন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ধন্যবাদ জানাচ্ছি। একই সঙ্গে নির্বাচনে অংশ নেওয়া রাজনৈতিক দল, প্রার্থী ও ভোটারদের শান্তিপূর্ণ অংশগ্রহণের জন্য ধন্যবাদ জানাচ্ছি। আশাকরি ভবিষ্যতেও এই সহনশীল রাজনৈতিক পরিবেশ বজায় থাকবে। পাশাপাশি যেসব অনিয়ম ও সীমাবদ্ধতা চিহ্নিত হয়েছে, সেগুলো নিরসনে সরকার, নির্বাচন কমিশন এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানাচ্ছি।

নির্বাচন শান্তিপূর্ণ ও গ্রহণযোগ্য পরিবেশে হয়েছে- আনফ্রেল : ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন শান্তিপূর্ণ ও বিশ্বাসযোগ্যভাবে অনুষ্ঠিত হয়েছে বলে জানিয়েছেন এশিয়ান নেটওয়ার্ক ফর ফ্রি ইলেকশনের (এএনএফআরইএল) চেয়ারপারসন রোহানা এন হেতিয়ারাচ্চি। রোববার রাজধানীর গুলশানে জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট পর্যবেক্ষণ নিয়ে প্রাথমিক প্রতিবেদন প্রকাশ উপলক্ষে আয়োজিত প্রেস ব্রিফিংয়ে তিনি এ মন্তব্য করেন।

তিনি জানান, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক স্থাপন করেছে এবং সার্বিকভাবে এটি শান্তিপূর্ণ ও গ্রহণযোগ্য পরিবেশে সম্পন্ন হয়েছে। তবে ভবিষ্যতে ভোট গণনার প্রক্রিয়া আরও স্বচ্ছ করার আহ্বান জানান তিনি। পাশাপাশি নির্বাচনি প্রচারণার ব্যয়ের বিস্তারিত হিসাব জনসমক্ষে প্রকাশেরও পরামর্শ দেন। তিনি বলেন, তরুণ ও নারী ভোটারদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি নিশ্চিত করা রাজনৈতিক দলগুলোর গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।

আনফ্রেল তাদের প্রতিবেদনে জানায়, বাংলাদেশের ২০২৬ সালের সংসদ নির্বাচন এবং গণভোট ২০২৪ সালের জুলাইয়ের যুব-নেতৃত্বাধীন অভ্যুত্থান এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর উচ্চতর গণতদন্তের মধ্যে একটি রূপান্তর প্রেক্ষাপটে অনুষ্ঠিত হয়েছিল। সেই পটভূমিতে, এএনএফআরইএল নির্বাচনের দিন পরিবেশ পর্যবেক্ষণ করে— যা প্রায় সব জায়গাতেই শান্তিপূর্ণ, সুশৃঙ্খল এবং নিরাপদ ছিল। এটি বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনের দৃশ্যমান অপারেশনাল পরিকল্পনা এবং নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে তার সমন্বয়ের একটি ফসল। যার মধ্যে ঝুঁকি-ভিত্তিক মোতায়েন এবং কেন্দ্রীভূত পর্যবেক্ষণ এবং প্রযুক্তি-সক্ষম তদারকির মতো স্বচ্ছতার ব্যবস্থা ব্যবহার করা হয়েছে। এই প্রচেষ্টাগুলো ভোটগ্রহণ কার্যক্রম স্থিতিশীল করতে সহায়তা করেছে এবং নির্বাচনের দিন ভোটগ্রহণ পরিচালনায় জনগণের আস্থা তৈরি করেছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নির্বাচনের দিন এএনএফআরইএল-এর পর্যবেক্ষণে আরও দেখা গেছে, ভোটদান এবং গণনা সুশৃঙ্খলভাবে এগিয়ে যায়, স্টেকহোল্ডাররা সবাই সেখানে উপস্থিত ছিলেন। তবুও গুরুত্বপূর্ণ স্বচ্ছতাণ্ডসুরক্ষাগুলো অসমভাবে প্রয়োগ করা হয়েছে। ভোট গণনার সময়, কিছু ক্ষেত্রে ব্যালট বাক্স খোলার সময় মূলত যাচাইয়ের ধারাবাহিকভাবে পদক্ষেপগুলো প্রয়োগ করেনি এবং পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা সমানভাবে প্রয়োগ করা হয়নি। তবে পদ্ধতিগত এই ফাঁকফোকরগুলো প্রমাণ করে না যে, পরিদর্শন করা স্থানগুলোতে ফলাফল পরিবর্তন করা হয়েছে। এই উদ্বেগগুলো ভবিষ্যতের নির্বাচনে অবশ্যই সমাধান করা উচিত। এতে আরও বলা হয়, অন্তর্ভুক্তির ফলাফল মিশ্র ছিল। ভোটার তালিকা নারী ও পুরুষের মধ্যে প্রায় সমতা ছিল এবং প্রথমবারের ভোটারদের মধ্যে এবং রাজনৈতিক সমাবেশে তরুণদের সম্পৃক্ততা নির্বাচনে একটি দৃশ্যমান শক্তি হিসেবে রয়ে গেছে। যদিও প্রার্থী হিসেবে নারীদের উল্লেখযোগ্যভাবে কম প্রতিনিধিত্ব ছিল। অনেক দল কোনও নারীকে প্রার্থী করেনি। সংখ্যালঘু এবং প্রান্তিক সম্প্রদায়গুলো কিছু অঞ্চলে ভয় এবং ভোট বর্জনের কথা জানিয়েছে। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা ভোটে অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে বাধার কথা জানিয়েছে। অবশেষে, প্রশাসনিক প্রেক্ষাপট দীর্ঘমেয়াদী আস্থার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়ে গেছে। সাবেক ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের স্থগিতাদেশ অন্তর্ভুক্তি এবং রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার ধারণাকে রূপ দিতে থাকে। অপরদিকে গণভোটের ফলাফল জুলাই সনদের অধীনে সংস্কার প্রতিশ্রুতির বিশ্বাসযোগ্য অনুসরণের প্রত্যাশা জোরদার করে। আনফ্রেলের অন্তর্বর্তীকালীন মূল্যায়ন হচ্ছে, বাংলাদেশের নির্বাচনি দিনের আস্থা অর্জন কেবল তখনই টেকসই থাকবে— যখন নির্বাচন-পরবর্তী শাসন আইনভিত্তিক জবাবদিহির ওপর ভিত্তি করে একটি অন্তর্বর্তীকালীন বিচার প্রক্রিয়ার দিকে মনোনিবেশ করবে।

এর মধ্যে রয়েছে প্রয়োগযোগ্য রাজনৈতিক ও প্রচারাভিযানের অর্থায়ন তদারকি, সুস্পষ্ট অভিযোগ প্রক্রিয়া এবং সংস্কার— যা পৃষ্ঠপোষকতা, জোরজবরদস্তি এবং পুনরাবৃত্তির রাজনৈতিক উত্থানের ক্ষেত্রে আগ্রহ কমায়।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত