ঢাকা রোববার, ২৯ মার্চ ২০২৬, ১৫ চৈত্র ১৪৩২ | বেটা ভার্সন

সুসংবাদ প্রতিদিন

মিষ্টি কুমড়ার ফলনে কৃষকের তৃপ্তির হাসি

মিষ্টি কুমড়ার ফলনে কৃষকের তৃপ্তির হাসি

সবজি ভান্ডার খ্যাত শেরপুরের নকলা উপজেলায় এবার মিষ্টি কুমড়ার বাম্পার ফলন হয়েছে। বিশেষ করে উপজেলার চরঅষ্টধর, চন্দ্রকোনা, পঠাকাটা, উরফা, টালকী ও বানেশ্বরদী ইউনিয়নের খাল-বিল ও নদ-নদীর তীরে এবং অপেক্ষাকৃত অনুর্বর ও পতিত জমিতে মিষ্টি কুমড়ার আবাদ বেশি হয়েছে। কুমড়া চাষে নামমাত্র শ্রমে ও অল্প খরচে বেশি আয় করা যায়। এবার ভালো ফলনের পাশাপাশি ভালো দাম পাচ্ছেন কৃষকরা। এসব কারণে বারোমাসী এই সবজি চাষের দিকে ঝুঁকছেন কৃষক।

নকলায় দিন দিন বাড়ছে মিষ্টি কুমড়ার আবাদ। এবার উপজেলায় বাম্পার ফলনের পাশাপাশি ভালো দাম পাওয়ায় কৃষকের মুখে হাসি ফুটে উঠেছে। স্থানীয় বাজারের চাহিদা মিটিয়ে এখানকার মিষ্টি কুমড়া যাচ্ছে ঢাকা ও ময়মনসিংহসহ বিভিন্ন জেলা-উপজেলার বাজারে। উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, এ বছর উপজেলায় ২৯৭ একর (১২০ হেক্টর) জমিতে মিষ্টি কুমড়া আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিলো, তবে অর্জন ২৪ একর বেড়ে হয়েছে ৩২১ একর (১৩০ হেক্টর)। এসব জমিতে বাণিজ্যিকভাবে উচ্চ ফলনশীল সুইটি, বেঙ্গল, মিনিস্টার ও রাজা জাতের মিষ্টি কুমড়ার আবাদ বেশি করা হয়েছে।

এছাড়া সরেজমিনে উপজেলার চরঅষ্টধর ও চন্দ্রকোনা ইউনিয়সহ বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, উপজেলায় অন্তত শত একর জমিতে চাষ করা গোলআলু খেতে সাথী ফসল হিসেবে এই কুমড়ার আবাদ করা হয়েছেন। তাছাড়া পরিবারের চাহিদা মিটাতে প্রায় সব কৃষক পরিবারের বাড়ির আঙ্গিনায় মিষ্টি কুমড়ার গাছ রোপণ করা হয়েছে। এতে সবমিলিয়ে উপজেলায় আরও অন্তত ৫০ একর জমিতে মিষ্টি কুমড়ার আবাদ হয়েছে বলে ধারণা করছেন উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তাসহ কৃষক-কৃষাণীরা।

চরঅষ্টধর ইউনিয়নের নারায়নখোলা দক্ষিণ পাড়া এলাকার কৃষক গোলাপ জল জানান, এ বছর ৮০ শতাংশ জমিতে আবাদ করা গোলআলুর ক্ষেতে সাথী ফসল হিসেবে মিষ্টি কুমড়া রোপণ করেছেন। গোলআলু উঠানোর পরে কুমড়ার গাছ ছড়িয়ে পড়ে সারা খেতে। গোলআলু খেতে কুমড়া চাষ করায় বাড়তি তেমন কোনো খরচ করতে হয়নি। তার জমিতে ১৪ পেকেট কুমড়ার বীজ, বাড়তি হিসেবে ২ বার হালকা সেচ, একবার নিড়ানি ও সামান্য পরিমাণ জৈব সার দিতে হয়েছে। এতে করে সব মিলিয়ে তার অতিরিক্ত খরচ হয়েছে ১৬ হাজার টাকা। তিনি এ পর্যন্ত ৭০ হাজার টাকার মিষ্টি কুমড়া বিক্রি করেছেন। আর এলাকার বাজারে আরও অন্তত ১০ হাজার থেকে ১৫ হাজার টাকার খুচরা বিক্রি করা হয়েছে। এখনও খেতে যে পরিমাণ কুমড়া রয়েছে তা থেকে আরও অন্তত ২০ হাজার থেকে ২৫ হাজার টাকা আয় করা সম্ভব বলে তিনি আশাব্যক্ত করেন। গোলাপ জল বলেন, ‘আমাদের এলাকার গোলআলু চাষিদের প্রায় সবাই আলু খেতে সাথী ফসল হিসেবে মিষ্টি কুমড়ার আবাদ করেন। এতে একই জমিতে এক সঙ্গে দুটি ফসল পাওয়া যায়। গোলআলু খেতে কুমড়ার আবাদ করে অধিক মুনাফা অর্জনের মতো সহজ আয়ের আর কোনো উপায় আছে বলে আমার জানা নেই।’

অন্য এক কৃষক আকবর আলী জানান, তারা অনুর্বর জমিগুলোতে আগে না বুঝে অনেক কিছু চাষ করতেন; তাতে লাভ কম হতো। কিন্তু কৃষি অফিসের পরামর্শে কয়েক বছর ধরে এসব জমিতে মিষ্টি কুমড়া চাষ শুরু করেছেন। এতে লাভ বেশি হওয়ায় এখন সবাই মিষ্টি কুমড়ার দিকে ঝুঁকেছেন। তাছাড়া উৎপাদিত মিষ্টি কুমড়া বিক্রি করতে তাদের চিন্তা করতে হয় না। বিভিন্ন এলাকার পাইকাররা এসে সরাসরি খেত থেকে কুমড়া কিনে নিচ্ছেন। এতে দাম কিছু কম পেলেও, সময় ও শ্রম বেঁচে যাওয়ায় লাভে কোনো কমতি হচ্ছে না বলে তিনি মন্তব্য করেন। তিনি আরও জানান, শুরুতে প্রতি কেজি মিষ্টি কুমড়া ২০ টাকা থেকে ২৫ টাকা করে বিক্রি করা হয়েছে। এখন ভরা মৌসুম হওয়ায় প্রতি কেজি মিষ্টি কুমড়া ১২ টাকা থেকে ১৫ টাকা করে পাইকারি বিক্রি করা হচ্ছে।

শাকসবজির পাইকার আব্দুল হালিম, মোতালেব, মোকসেদ ও সজিবসহ অনেকে জানান, প্রায় অর্ধযুগ ধরে তারা মৌসুমী শাক সবজির পাইকারি ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। তারা এখানকার মিষ্টি কুমড়া পাইকারি কিনে নিয়ে রাজধানী ঢাকা ও ময়মনসিংহসহ বিভিন্ন বিভাড় ও জেলা-উপজেলার বাজারের ক্ষুদ্র পাইকার ও খুচরা বিক্রেতার নিকট অল্প লাভে বিক্রি করেন। অনেকে প্রতি বছর মিষ্টি কুমড়ার গাছসহ ২০ কাঠা (১০০ শতাংশ) জমি ৭৫ হাজার থেকে ৮০ হাজার টাকায় চুক্তিতে কিনেন। এতে যে লাভ হয় তা দিয়েই তাদের সংসারের সব খরচসহ ছেলে মেয়েদের লেখাপড়ার খরচ চলে। পরিবারের সব খরচ বাদে বছরে অন্তত ২৫ হাজার টাকা থেকে ৫০ হাজার টাকা তাদের সঞ্চয় থাকে বলেও তারা জানান। ভূরদী খন্দকারপাড়া কৃষিপণ্য উৎপাদক কল্যাণ সংস্থার প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি আলহাজ মো. ছায়েদুল হক জানান, নকলার প্রায় সব উঁচু এলাকাতে কম-বেশি মিষ্টি কুমড়ার আবাদ করা হয়। এই কুমড়ার শাক বেশ পুষ্টিকর, তাই চাহিদাও বেশি। তিনি আরও জানান, শীতকালীন ফসলের জন্য অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর এবং গ্রীষ্মকালীন ফসলের জন্য ফেব্রুয়ারি থেকে মে মাস পর্যন্ত মিষ্টি কুমড়ার বীজ বপন করা হয়। সবজি ভান্ডার খ্যাত নকলা উপজেলায় সুস্বাদু সবজি মিষ্টি কুমড়া সারা বছরই পাওয়া যায় বলে কৃষকরা জানান। কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা কৃষিবিদ সাগর চন্দ্র দে জানান, এবার আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় উপজেলায় মিষ্টি কুমড়ার বাম্পার ফলন হয়েছে। বর্তমান বাজারে দাম ভালো থাকায় কৃষকরাও খুশি। মৌসুম ভিত্তিক নিরাপদ শাকসবজিসহ বিভিন্ন ফসল চাষে কৃষকদের নিয়মিত উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে। অপেক্ষাকৃত অনুর্বর ও পতিত জমিতে শাকসবজি আবাদে সময়, শ্রম ও খরচ কম হওয়ায় প্রতি বছরই মিষ্টি কুমড়ার পাশাপাশি অন্যান্য সবজির আবাদ দিন দিন বাড়ছে বলে তিনি মনে করেন। অতিরিক্ত কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ তাবাসসুম মকবুলা দিশা জানান, মিষ্টি কুমড়ার আবাদ বৃদ্ধির লক্ষ্যে কৃষকদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণসহ নিয়মিত পরামর্শ সেবা দেওয়া হয় এবং হচ্ছে। চলতি মৌসুমে মিষ্টি কুমড়ার বাম্পার ফলন ও অর্জন লক্ষ্যমাত্রা অতিক্রম করায় আগামীতে অনেক কৃষক এই সুস্বাধু সবজি চাষের দিকে এগিয়ে আসবেন বলে আশা ব্যক্ত করেন তিনি। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মো. আবদুল ওয়াহেদ খান জানান, স্বল্প মেয়াদি এই সবজি চাষে কৃষকরা লাভ বেশি পাচ্ছেন। বাজারদর ভালো থাকলে কৃষকরা অন্যান্য ফসলের তুলনায় মিষ্টি কুমড়ায় বেশি লাভবান হবেন। সঠিক পরিচর্যা ও রোগবালাই নিয়ন্ত্রণে এবং অনুকূল আবহাওয়া বজায় থাকলে ও বড় কোন প্রাকৃতিক দুর্যোগের মোকাবিলায় না পড়লে চলতি মৌসুমে কৃষকরা কয়েকগুণ লাভ পাবেন। অল্প ব্যয়ে ও স্বল্প শ্রমে এই সবজি আবাদ করে যে কেউ স্বাবলম্বী হতে পারেন বলে তিনি মন্তব্য করেন।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত