ঢাকা মঙ্গলবার, ০৫ মে ২০২৬, ২২ বৈশাখ ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

১২ ঘণ্টা পর থানা থেকে ছাড়া পেলেন সেই বিএনপি নেতা

১২ ঘণ্টা পর থানা থেকে ছাড়া পেলেন সেই বিএনপি নেতা

আটকের ১২ ঘণ্টা পর থানা থেকে ছাড়া পেলেন কুমিল্লা আদর্শ সদর উপজেলা বিএনপির সভাপতি রেজাউল কাইয়ুম। গত রোববার দুপুর ১২টার দিকে তাকে আটক করে পুলিশ। এরপর নানা নাটকীয়তা শেষে এদিন দিবাগত রাত ১২টার দিকে উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদকসহ অন্য নেতাদের জিম্মায় তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়।

ঘটনার পর থেকেই পুলিশ রেজাউল কাইয়ুমকে আটকের বিষয়টি নিশ্চিত করলেও ঠিক কী কারণে তাকে আটক করা হয়েছে, সেটা জানাতে গড়িমসি করে। তবে ওই বিএনপি নেতাকে ছাড়ার পর পুলিশ জানিয়েছে, তার বিরুদ্ধে কুমিল্লার অন্যতম বৃহৎ ও ব্যস্ততম শাসনগাছা বাস টার্মিনালকেন্দ্রিক চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ ছিল। সেই অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তাঁকে আটক করা হয়। পুলিশের দাবি, দীর্ঘ সময় জিজ্ঞাসাবাদে ঘটনার সত্যতা না পাওয়ায় রেজাউলকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।

এর আগে রোববার দুপুর ১২টার দিকে কুমিল্লা শহরের শাসনগাছা এলাকার বাসা থেকে রেজাউল কাইয়ুমকে আটক করেন কোতোয়ালি মডেল থানা ও জেলা পুলিশের গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) সদস্যরা। পরে তাকে কুমিল্লা কোতয়ালি থানায় নেওয়া হয়। রেজাউল কাইয়ুমকে আটকের প্রতিবাদ ও মুক্তির দাবিতে বিএনপি নেতা-কর্মী ও তার সমর্থকেরা কুমিল্লা কোতোয়ালি মডেল থানার সামনে অবস্থান নেন। দুপুর থেকে রেজাউল কাইয়ুমকে ছাড়ার পর পর্যন্ত থানার প্রধান ফটকের সামনে কয়েক শ নেতা-কর্মী ছিলেন। রেজাউলের মুক্তির দাবিতে তারা বিভিন্ন স্লোগান দিয়েছেন।

রাতে কুমিল্লা কোতোয়ালি মডেল থানা থেকে ছাড়া পেয়ে রেজাউল কাইয়ুম দাবি করেন, তার বিরুদ্ধে একটি মহল বড় ধরনের ষড়যন্ত্র করেছে। সবাইকে উদ্দেশ করে তিনি বলেন, ‘আমাকে নিয়ে বড় ধরনের ষড়যন্ত্র হয়েছিল; অবশেষে সেটি মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে। ভিত্তিহীন অভিযোগে আমাকে আটক করা হয়েছিল। আমার বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ আনা হয়, তার বিন্দুমাত্র সত্যতা নেই। আমি আমাদের নেতা–কর্মীরসহ সকলের প্রতি ধন্যবাদ জানাচ্ছি। দিনভর আমার জন্য যারা কষ্ট করেছেন, সকলের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি।’

নাম প্রকাশ না করার শর্তে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একাধিক সূত্র জানিয়েছে, সরকারের উচ্চপর্যায়ের নির্দেশে রেজাউল কাইয়ুমকে আটক করা হয়েছিল। তার বিরুদ্ধে শাসনগাছা বাস টার্মিনালসহ একই এলাকায় সিএনজি ও ব্যাটারিচালিত অটোরিকশাসহ বিভিন্ন যানবাহনে চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ রয়েছে। বিশেষ করে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর শাসনগাছা বাস টার্মিনাল নিয়ন্ত্রণে নিয়ে চাঁদা তোলার ঘটনায় আলোচনায় আসেন রেজাউল কাইয়ুম, তার ভাই এবং স্থানীয় বিএনপির কিছু আনুসারী। রেজাউল কাইয়ুমের বাসাও শাসনগাছা বাস টার্মিনালের পাশে। একাধিক গোয়েন্দা সংস্থার গোপন প্রতিবেদনে রেজাউল কাইয়ুমের চাঁদাবাজির বিষয়টি সরকারের উচ্চপর্যায়ে পৌঁছে। এরপরই তাকে আটকের নির্দেশ দেওয়া হয় পুলিশকে। তবে সর্বশেষ সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে সবুজ সংকেত পেয়েই ১২ ঘণ্টা পর ছেড়ে দেওয়া হয় তাকে।

এদিকে এই বিএনপি নেতার বাস টার্মিনালের নিয়ন্ত্রণ বিষয়টি তার আটকের পরও বোঝা গেছে। রোববার দুপুরে রেজাউল কাইয়ুমকে আটকের সঙ্গে সঙ্গেই শাসনগাছা বাস টার্মিনাল অবরোধ করেন বিভিন্ন পরিবহনের চালক, শ্রমিকসহ তার অনুসারীরা। এ ঘটনায় ওই টার্মিনাল থেকে কুমিল্লা-ঢাকা, কুমিল্লা-সিলেটসহ বেশ কয়েকটি রুটে বাস চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এ ছাড়া রেজাউলের অনুসারী একদল লোক ব্যবসায়ীদের হুমকি দিয়ে ওই এলাকার সব ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেন। প্রায় সাড়ে তিন ঘণ্টা পর রোববার বেলা সাড়ে তিনটার দিকে টার্মিনাল থেকে বাস চলাচল স্বাভাবিক হয়। এরপর ওই এলাকার দোকানপাট খোলা হয়।

দিবাগত রাত সাড়ে ১২টার দিকে কুমিল্লা কোতোয়ালি মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা তৌহিদুল আনোয়ার বলেন, রেজাউল কাইয়ুমের বিরুদ্ধে শাসনগাছা বাস টার্মিনালকেন্দ্রিক চাঁদাবাজি-সংক্রান্ত কিছু অভিযোগ আসে উচ্চপর্যায়ে। পরে পুলিশ সদর দপ্তরের নির্দেশে তাঁকে আটক করে হেফাজতে নেওয়া হয়। কিন্তু দীর্ঘ সময়ে জিজ্ঞাসাবাদ এবং যাচাই-বাছাইয়ে অভিযোগগুলোর সত্যতা পাওয়া যায়নি। এ জন্য রাতে আদর্শ সদর উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক সফিউল আলম রায়হানসহ অন্য নেতাদের জিম্মায় তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।

এদিকে থানা থেকে রেজাউল কাইয়ুমের ছাড়া পাওয়ার পর তার অনুসারীদের আনন্দ-উচ্ছ্বাস প্রকাশ করতে দেখা গেছে। রাত ১২টা ১৫ মিনিটে কুমিল্লা আদর্শ সদর উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক সফিউল আলম (রায়হান) বলেন, ‘আমরা রেজাউল কাইয়ুমকে বাসায় নিয়ে যাচ্ছি। জিজ্ঞাসাবাদ শেষে আমাদের উপজেলা বিএনপির সভাপতিকে ছেড়ে দিয়েছে পুলিশ। এ বিষয়ের বিস্তারিত পুলিশই আপনাদের জানাবেন।’

এর আগে রেজাউলের বিরুদ্ধে আসা চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ প্রসঙ্গে সফিউল আলম বলেছিলেন, বাস টার্মিনালের কোনো বিষয়ে রেজাউল কাইয়ুম যুক্ত নেই। এসব অভিযোগ ভিত্তিহীন। একটি মহল ষড়যন্ত্র করে বিষয়টি সামনে এনেছে। থানায় দীর্ঘ সময় জিজ্ঞাসাবাদ করার পরও পুলিশ এমন ঘটনার কোনো প্রমাণ পায়নি।

রোববার দুপুর থেকে রাত পর্যন্ত কুমিল্লা কোতোয়ালি থানায় দেখা গেছে, দিনভর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার কক্ষে রেজাউল কাইয়ুমকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। কুমিল্লার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) সাইফুল মালিকসহ পুলিশের কয়েকজন কর্মকর্তা তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করেন। রাত ১০টার দিকে সেখান থেকে সরিয়ে রেজাউলকে নেওয়া হয় থানার নারী ও শিশুবিষয়ক সেবা দেওয়ার একটি কক্ষে। সেখান থেকেই রাত ১২টার দিকে তাকে ছাড়া হয়।

এ প্রসঙ্গে বিস্তারিত কথা বলতে জেলা পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামানের মুঠোফোনে রোববার দুপুর থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে কল করা হলেও তিনি ধরেননি। অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) সাইফুল মালিক বলেন, ‘আমরা বিএনপি নেতা রেজাউল কাইয়ুমকে কিছু সুনির্দিষ্ট অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করেছিলাম।’

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত