
দেশের গ্রামিণ এলাকায় চলছে বিদ্যুতের ভয়াবহ লোডশেডিং। বিদ্যুৎ কখন আসবে আর কখন যাবে, তার কোনো ঠিকঠিকানা নেই। একদিকে ৩৫ থেকে ৩৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসের তীব্র গরম, অন্যদিকে অসহনীয় বৈদ্যুতিক যন্ত্রণা-এই দুইয়ের যাঁতাকলে পিষ্ট সিলেটবাসী। এমন এক চরম বিপর্যস্ত পরিস্থিতির মধ্য দিয়েই শুরু হচ্ছে এবারের এইচএসসি পরীক্ষা। ফলে চরম বিপাকে পড়েছেন লাখ লাখ পরীক্ষার্থী। গত কয়েকদিনে সিলেটে বিদ্যুতের বিপর্যয় অসহনীয় পর্যায়ে পৌঁছেছে। বিদ্যুৎ একবার গেলে আসার নাম থাকে না, প্রায় ঘণ্টাখানেকেরও বেশি সময় পর ফিরলেও অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই তা আবারও উধাও হয়ে যায়। উপজেলাগুলোর পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ। সেখানে দিন-রাতে প্রায় ১৪ থেকে ১৫ ঘণ্টাই বিদ্যুৎ থাকছে না বলে অভিযোগ উঠেছে। গুরুত্বপূর্ণ এই পাবলিক পরীক্ষার সময় এমন পরিস্থিতিতে ক্ষোভ ও অসন্তোষ প্রকাশ করছেন শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা। অনেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে স্ট্যাটাস দিয়ে এই চরম অব্যবস্থাপনার প্রতিবাদ জানাচ্ছেন। সিলেট সরকারি কলেজের এইচএসসি পরীক্ষার্থী আবিদুল হাসান ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, পরীক্ষা কেমন হবে জানি না। বিদ্যুতের এই যন্ত্রণার কারণে ঠিকমতো প্রস্তুতিই তো নিতে পারছি না।
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) সূত্রে জানা গেছে, চাহিদার তুলনায় বিদ্যুৎ সরবরাহ অনেক কম হওয়ায় এই লোডশেডিং পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। সিলেটে পিক আওয়ারে পিডিবির বিদ্যুৎ চাহিদা ২৪০ থেকে ২৫০ মেগাওয়াট। কিন্তু তার বিপরীতে সরবরাহ মিলছে মাত্র ১৪০ থেকে ১৫০ মেগাওয়াট। ফলে প্রতিদিন প্রায় ১০০ মেগাওয়াটের মতো লোডশেডিং করতে হচ্ছে। এ বিষয়ে পিডিবি সিলেটের প্রধান প্রকৌশলী মো. ইমাম হোসেন বলেন, চাহিদার তুলনায় সরবরাহ অনেক কম থাকায় লোডশেডিং বেড়েছে। তবে পরিস্থিতির উন্নতি হতে ঠিক কত দিন সময় লাগতে পারে, তা এই মুহূর্তে নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।
নোয়াখালীতে লোডশেডিংয়ে দুশ্চিন্তায় এইচএসসি পরীক্ষার্থীরা
বছরের অন্যান্য সময়ের তুলনায় গত কয়েক সপ্তাহ ধরে নোয়াখালীজুড়ে আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে লোডশেডিং। বিদ্যুতের এই তীব্রসংকটে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন সাধারণ মানুষ, শিক্ষার্থী ও ব্যবসায়ীরা। উচ্চমাধ্যমিক (এইচএসসি) পরীক্ষার মধ্যে বড় ধরনের বিঘ্ন সৃষ্টি হয়েছে। সরেজমিন দেখা গেছে, উপকূলীয় জেলা হওয়ায় বছরের এ সময়ে নোয়াখালীতে প্রায়ই আকস্মিক ঝড়-বৃষ্টি এবং দিনের বেলাতেও মেঘাচ্ছন্ন আবহাওয়া বিরাজ করে। এর মধ্যে ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাটে পরীক্ষার্থীদের পড়াশোনা ব্যাহত হচ্ছে। একই সঙ্গে পরীক্ষার দিনগুলোতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ না থাকলে পরীক্ষা কার্যক্রম পরিচালনাও কঠিন হয়ে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এবার নোয়াখালীর ৯টি উপজেলায় ৪৪টি কেন্দ্রে প্রায় ২২ হাজার পরীক্ষার্থী এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে। চাটখিলের এইচএসসি পরীক্ষার্থী তাসমিয়া বলেন, ‘একদিকে প্রচণ্ড গরম, অন্যদিকে বারবার লোডশেডিং। ফলে ঠিকমতো পড়াশোনা করা সম্ভব হচ্ছে না।’ আরেক পরীক্ষার্থী মোসা. মাইমুনা বলেন, ‘বৃষ্টি না হওয়ায় গরম অনেক বেড়েছে। তার ওপর ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের কারণে গরমণ্ডঠান্ডাজনিত সমস্যায় প্রায়ই অসুস্থ হয়ে পড়ছি। এতে পড়াশোনাও ব্যাহত হচ্ছে।’ নোয়াখালী সরকারি কলেজের শিক্ষার্থী জোবায়ের বলেন, ‘এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের কথা বিবেচনা করে অন্তত পরীক্ষার সময়টাতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা হলে আমরা উপকৃত হব। এতে ভালোভাবে প্রস্তুতি নিতে পারব এবং ফলাফলও ভালো হবে।’
চৌমুহনী সরকারি সালেহ আহমেদ কলেজের শিক্ষার্থী তাসপিয়া বলেন, ‘গত কয়েক সপ্তাহ ধরে লোডশেডিংয়ের কারণে পড়াশোনায় সমস্যা হচ্ছে। আমরা আশা করি, পরীক্ষার সময় সরকার লোডশেডিং কমানোর ব্যবস্থা নেবে।’ হাতিয়া উপজেলা সরকারি দ্বীপ কলেজের একাধিক শিক্ষক জানান, বর্ষাকালে বিদ্যুৎ বিপর্যয়ের আশঙ্কা কিছুটা থাকলেও এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের কথা বিবেচনায় নিয়ে বিদ্যুৎ বিভাগ সতর্ক থাকলে দুর্যোগের মধ্যেও নিরবচ্ছিন্নভাবে পরীক্ষা নেওয়া সম্ভব হবে। পরীক্ষার্থীদের পাশাপাশি অভিভাবকরাও এ পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাদের আশঙ্কা, গুরুত্বপূর্ণ এই সময়ে বিদ্যুতের এমন সংকট শিক্ষার্থীদের ফলাফলে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। দ্রুত সমস্যার সমাধানে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।
সদর উপজেলার এক বাসিন্দা বলেন, ‘প্রতিদিন সন্ধ্যা থেকে রাত পর্যন্ত তিন থেকে চার ঘণ্টা লোডশেডিং থাকে। দিনের বেলাতেও একই অবস্থা। দু-একদিন পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক থাকলেও পরবর্তী চার-পাঁচ দিন আবারও লোডশেডিং বেড়ে যায়।’ বিদ্যুৎ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, গ্রীষ্মকালে নোয়াখালীতে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) ও পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির সম্মিলিত বিদ্যুতের চাহিদা ২০০ মেগাওয়াটেরও বেশি। তবে গত দুই দিন ধরে কিছুটা বৃষ্টিপাত হওয়ায় চাহিদা কমে ১৬০ থেকে ১৭০ মেগাওয়াটে নেমে এসেছে। এতে লোডশেডিংয়ের তীব্রতা কিছুটা কমলেও সংকট পুরোপুরি কাটেনি। বর্তমানে মোট চাহিদার বিপরীতে গড়ে মাত্র ৭০ শতাংশ বিদ্যুৎ সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে। পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির নোয়াখালী জোনের জেনারেল ম্যানেজার মকবুল আলম জানান, নোয়াখালীর ৯টি উপজেলায় তাদের প্রায় ৮ লাখ ৩০ হাজার গ্রাহক রয়েছে। জাতীয় গ্রিড থেকে চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ বরাদ্দ না পাওয়ায় প্রতিদিন ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত লোডশেডিং দিতে হচ্ছে। তবে কেন্দ্রীয়ভাবে বিদ্যুৎ সরবরাহ ও বরাদ্দ বাড়ানো গেলে গ্রাহক পর্যায়ের এই দুর্ভোগ অনেকটাই কমানো সম্ভব হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
এদিকে পরীক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবকরা অনতিবিলম্বে বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক করার পাশাপাশি অন্তত এইচএসসি পরীক্ষাকালীন সময়ে লোডশেডিংমুক্ত বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি জোর দাবি জানিয়েছেন।
সম্প্রতি জাতীয় সংসদে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ জানিয়েছেন, কারিগরি ত্রুটির কারণে দেশের দুটি বড় বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ হয়ে গেছে। এতে জাতীয় গ্রিডে প্রায় ৩ হাজার মেগাওয়াটের ঘাটতি তৈরি হয়েছে, যা এই দেশব্যাপী লোডশেডিংয়ের মূল কারণ। এটিকে ‘জাতীয় সংকট’ উল্লেখ করে তিনি আশা প্রকাশ করেছেন যে, আগামী দুই দিনের মধ্যে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হতে পারে।
তবে আশ্বাসের বাণী ছাপিয়ে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের এখন একটাই দাবি- পরীক্ষার্থীদের ভবিষ্যতের কথা বিবেচনা করে অন্তত পরীক্ষার দিনগুলোতে যেন সিলেটে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা হয়।