ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৯ জুলাই ২০২৬, ২৫ আষাঢ় ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

ফের খুলছে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার

* আগাম অর্থ লেনদেন না করার অনুরোধ মন্ত্রণালয়ের * আশার পালে হাওয়া * কর্মী যাবে বিনা খরচে
ফের খুলছে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার

দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য আবারও উন্মুক্ত হতে যাচ্ছে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাম্প্রতিক কূটনৈতিক সফরকে ঘিরে এই অগ্রগতি সাধিত হয়েছে, যা কিনা গত দুই দশকের ইতিহাসে বারবার চড়াই-উতরাই পার করা এই বাজারটির জন্য নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে মালয়েশিয়াগামী কর্মীদের আগাম অর্থ লেনদেন না করার অনুরোধ জানিয়েছে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়। মালয়েশিয়া গমনেচ্ছু কর্মী এবং সংশ্লিষ্ট রিক্রুটিং এজেন্টদের উদ্দেশ্যে একটি জরুরি সতর্কতামূলক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানায় মন্ত্রণালয়। এতে বলা হয়েছে, মালয়েশিয়ায় কর্মী প্রেরণের বিষয়ে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় থেকে আনুষ্ঠানিক বিজ্ঞপ্তি জারি না হওয়া পর্যন্ত কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে এ সংক্রান্ত কোনো প্রকার যোগাযোগ বা আর্থিক লেনদেন না করার জন্য সংশ্লিষ্ট সবাইকে অনুরোধ জানানো যাচ্ছে। একই সঙ্গে কর্মী প্রেরণ প্রক্রিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হওয়ার পূর্বে কোনো প্রকার মেডিকেল টেস্ট বা এ বাবদ কোনো অর্থ লেনদেন থেকে বিরত থাকার নির্দেশনা দিয়েছে মন্ত্রণালয়। রিক্রুটিং এজেন্টদের জন্য নির্দেশনায় বলা হয়েছে, সরকারের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত না হওয়া পর্যন্ত কোনো এজেন্সি মালয়েশিয়া গমনেচ্ছু কর্মীদের সঙ্গে কোনো বিষয়ে চুক্তিবদ্ধ হতে পারবে না। এছাড়া পাসপোর্ট সংগ্রহ, মেডিকেল টেস্ট এবং কোনো প্রকার আর্থিক লেনদেন করা থেকেও রিক্রুটিং এজেন্টদের বিরত থাকার জন্য কঠোর নির্দেশ প্রদান করা হলো।

মালয়েশিয়া গমন বা এ সংক্রান্ত যেকোনো বিষয়ে অভিযোগ অথবা তথ্যের জন্য প্রবাসী কল সেন্টারের ১৬১৩৫ (দেশ থেকে) এবং +৮৮০৯৬১০১০২০৩০ (বিদেশ থেকে) নম্বরে যোগাযোগ করার জন্য অনুরোধ করা হয়েছে।

আগের দিন গত মঙ্গলবার সিলেট সার্কিট হাউসে এক সংবাদ সম্মেলনে প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী এই ঘোষণা দেন। তিনি জানান, আগামী এক থেকে দুই মাসের মধ্যেই সম্পূর্ণ বিনা খরচে মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু হবে বলে সরকার আশাবাদী। মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার নিয়ে বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা কখনো-ই একরৈখিক ছিল না। এটি এমন এক গল্প, যেখানে আশা আর হতাশার দোলাচলে সাধারণ শ্রমিকের স্বপ্ন বারবার ভেঙে গেছে। এই বাজারের প্রথম বড় ধাক্কাটি আসে ২০০৮ সালে। ব্যাপক অনিয়ম, দুর্নীতি ও শ্রমিক হয়রানির গুরুতর অভিযোগ ওঠায় সে বছরই বাংলাদেশ থেকে কর্মী নেওয়া বন্ধ করে দেয় মালয়েশিয়া। একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেটের আবির্ভাব ঘটে, যারা মালয়েশিয়ান পক্ষের যোগসাজশে পুরো বাজারটিকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসে।

দীর্ঘ আট বছর পর ২০১৬ সালে কূটনৈতিক তৎপরতার মাধ্যমে বাজারটি পুনরায় চালু করা সম্ভব হয়েছিল। কিন্তু নীতিনির্ধারক মহলের ব্যর্থতায় সে সুযোগ বেশিদিন কাজে লাগানো যায়নি। চালুর মাত্র দুই বছরের মাথায় ২০১৮ সালে আবারও দুর্নীতি, উচ্চ অভিবাসন ব্যয় এবং একচেটিয়া সিন্ডিকেটের দাপটে বাংলাদেশ থেকে শ্রমিক নেওয়া সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়া হয়। এরপর ২০২২ সালের আগস্টে সীমিত পরিসরে আবারও কর্মী যাওয়া শুরু হয়। কিন্তু এই স্বল্পমেয়াদি সচলতাও দীর্ঘস্থায়ী হয়নি; ২০২৪ সালের ১ জুন থেকে আবারও বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য শ্রমবাজারটি বন্ধ হয়ে যায়। এই সময়টিতে সবচেয়ে বড় সংকটে পড়েন সেই ৭ হাজার ৮৭৩ জন কর্মী, যারা ভিসা-টিকিট হাতে পেয়েও শেষ মুহূর্তে যেতে পারেননি। অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে তাদের সে যন্ত্রণা ছিল অবর্ণনীয়।

ঠিক এমনই এক ক্রান্তিকালে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মালয়েশিয়া সফর একটি টার্নিং পয়েন্ট হিসেবে কাজ করে। দুই দেশের উচ্চপর্যায়ের আলোচনার মাধ্যমে দীর্ঘদিনের আইনি ও কূটনৈতিক জটিলতা কাটিয়ে এই শ্রমবাজার আবারও সচল হওয়ার পথ প্রশস্ত হয়েছে। অতীতের দিকে তাকালে দেখা যায়, এই বাজারের সবচেয়ে বড় অভিশাপ ছিল সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য ও অত্যধিক অভিবাসন ব্যয়। সরকারি নিয়ম অনুযায়ী খরচ নির্ধারিত থাকলেও, হাতেগোনা কয়েকটি রিক্রুটিং এজেন্সি বাজারকে নিজেদের কব্জায় নিয়ে ইচ্ছেমতো ফি আদায় করত। বাস্তবে একজন কর্মীকে গুনতে হতো তিন থেকে চার লাখ টাকা পর্যন্ত। এই অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের চাপই ছিল প্রতারণা, ভুয়া ভিসা ও হয়রানির মূল উৎস। অসাধু দালালচক্র ভুয়া চাকরির লোভ দেখিয়ে অনেক শ্রমিকের সর্বস্বান্ত করত, গন্তব্যে পৌঁছে কাজ না পেয়ে তাদের মানবেতর জীবনযাপন করতে হতো।

আরেকটি বড় সমস্যা ছিল এজেন্সি নির্বাচনে বাংলাদেশের নিয়ন্ত্রণহীনতা। এতদিন মালয়েশিয়া নিজেরাই তাদের পছন্দের কয়েকটি এজেন্সিকে তালিকাভুক্ত করত, যার সুযোগে একচেটিয়া সিন্ডিকেট গড়ে উঠত অবাধে। প্রধানমন্ত্রীর এই সফর-পরবর্তী পরিস্থিতিতে সেই চিত্রে বড় রকমের পরিবর্তন আসতে চলেছে। সরকার ঘোষণা দিয়েছে যে, এবার আর মালয়েশিয়ার ওপর নির্ভর না করে বাংলাদেশ নিজেই রিক্রুটিং এজেন্সি নির্বাচন করবে। অতীতের তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে সিন্ডিকেট ও দুর্নীতি সম্পূর্ণরূপে এড়াতে এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যেখানে এজেন্সিগুলোর সঙ্গে সরকারের একটি সমন্বিত প্রক্রিয়া কাজ করবে। সর্ববৃহৎ যে সুখবরটি এসেছে, তা হলো সম্পূর্ণ বিনা খরচে কর্মী পাঠানোর প্রতিশ্রুতি।

অভিবাসনের পুরো আর্থিক ভারটিই একটি সমন্বিত ব্যবস্থাপনার আওতায় আনা হবে, ফলে গরিব শ্রমিককে আর উচ্চ সুদে ঋণ করে দালালের পেছনে ছুটতে হবে না। এই পদক্ষেপটি বাস্তবায়িত হলে তা হবে বাংলাদেশের শ্রম অভিবাসনের ইতিহাসে এক যুগান্তকারী পরিবর্তন। পাশাপাশি, ২০২৪ সালে আটকে পড়া সেই সাত হাজারের বেশি কর্মীর দুর্ভোগ লাঘবেও জোরালো উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তাদের পাঠানোর সম্পূর্ণ দায়িত্ব সরকারি সংস্থা বোয়েসেলকে দেওয়া হয়েছে, এবং এরই মধ্যে তিন হাজার কর্মী মালয়েশিয়ায় পৌঁছেও গেছেন। বাকি কর্মীদের দ্রুত পাঠাতে পৃথক সিদ্ধান্ত প্রক্রিয়াধীন বলে মন্ত্রী জানিয়েছেন।

শুধু মালয়েশিয়া-ই নয়, এই সফলতা ঘিরে ভবিষ্যতে আরও বৃহৎ পরিসরে প্রবাসী আয়ের দুয়ার খোলার ইঙ্গিত দিয়েছেন প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রী। তিনি জানান, রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়াতে সরকার মধ্যপ্রাচ্য, জাপান ও মরিশাসের মতো বিকল্প শ্রমবাজার অনুসন্ধানে সক্রিয়ভাবে কাজ করছে। এর মাধ্যমে একক কোনো বাজারের ওপর নির্ভরশীলতার ঝুঁকিও কমবে। প্রধানমন্ত্রীর তৎপরতার ফসল হিসেবে মালয়েশিয়ার বাজার পুনরায় সচল হওয়ায় লাখো সম্ভাব্য প্রবাসী শ্রমিকের মনে নতুন স্বপ্নের সঞ্চার হয়েছে। তবে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই অগ্রগতি ধরে রাখতে হলে জনশক্তি রপ্তানি প্রক্রিয়ায় পুরোপুরি স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। সিন্ডিকেটমুক্ত রাখতে না পারলে এবং ‘বিনা খরচে’ পাঠানোর প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে বিচ্যুতি ঘটলে দীর্ঘমেয়াদে এই বাজার আবারও অস্থিরতার মুখে পড়তে পারে। সব মিলিয়ে, দীর্ঘ এক টালমাটাল ইতিহাসের পর মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার থেকে এখন যে সুখবর এসেছে, তার সাফল্য পুরোপুরি নির্ভর করছে ভবিষ্যৎ বাস্তবায়নের ওপর।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত