
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাঞ্ছারামপুর উপজেলার অসাধারণ সুন্দর গ্রাম সোনারামপুর ইউনিয়নের কানাইনগর। মেঘনা নদীর কোল ঘেঁষা গ্রামটি। বাড়ির পাশে মেঘনার নদী থাকায় অন্যান্য হাঁসের পাশাপাশি অধিক লাভজনক রাজহাঁস পালনের দিকে ঝুঁকছে গৃহবধূরা।
ফলে, দিনভর রাজহাসের হাঁসের কলকলানিতে মুখর থাকে গ্রামটি। গ্রামের বেশির ভাগ দরিদ্র ,নিম্নবিত্ত পরিবারের নারীরা রাজহাঁস পালন করে সংসারের অভাব অনটন দূর করার পাশাপাশি অর্থনৈতিকভাবে স্বচ্ছল হয়ে উঠছে। রাজহাঁস পালন করে সন্তানদের পড়ালেখার খরচ জোগানোসহ সংসারের যাবতীয় ব্যয় মেটাচ্ছে জীবন সংগ্রামী এসব নারী।
জানা গেছে, দু’দশক আগে এ অঞ্চলে রাজহাঁস পালন শুরু হয়। যত দিন যাচ্ছে ততো রাজহাঁসের সংখ্যা বাড়ছে।
সকালে বাড়ি থেকে হেলতে দুলতে রাজহাঁস আহারের সন্ধানে বের হয়। নদী ও ডাঙ্গা থেকে এরা খাবার খায়। সন্ধ্যার আগে বাড়ি ফিরে আসে। বাড়ি ফিরলে হাঁসকে ধানের কুঁড়া, ভাত বা সবজির ফেলে দেয়া অংশ খেতে দেয়া হয়। স্থানীয় একটি এনজিও কর্মী শায়লা শারমিন বলেন, আগে এ গ্রামের বহু নারীর অনেক স্বপ্নই ছিল অধরা। গাঁটে টাকা পয়সা থাকত না বলে নিজের এবং ছেলে মেয়ের আবদারও পূরণ করতে পারছিলেন না তারা। কিন্তু মেঘনা অধ্যুষিত সোনারামপুর ও পার্শ্ববর্তী দরিয়াদৌলত ইউনিয়নে কানাইনগর, শিবপুর, শান্তিপুর, ইছাপুর, মরিচাকান্দি, তাতুয়াকান্দিসহ বেশকিছু গ্রামের এই নারীরা এখন বাড়তি আয়ের পাশাপাশি স্বপ্নও দেখছেন। কারণ, সংসারে কাজের ফাঁকে রাজহাঁস পালন করে এখানকার নারীরা নিজেদের সাবলম্বি করে তুলেছেন। এখন তাদের আর টাকার জন্য বাড়ির কর্তার কাছেও ধরনা দিতে হয়না। স্বামীদেরও সহযোগিতা করছে নারীরা।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাজহাঁস সাধারণত দলবদ্ধ হয়ে বাস করতে পছন্দ করে। প্রত্যেক দলে ৮-১২টি হাঁস থাকে। একটি স্ত্রী রাজহাঁস বছরে একবারই ১-১২টি ডিম দিয়ে থাকে। প্রতিটি ডিম ১০০ থেকে ১২০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়। ওই ডিমগুলো সাধারণত বাচ্চা ফুটানোর জন্যই ক্রয়-বিক্রয় হয়ে থাকে। প্রতিটি রাজহাঁসের বাচ্চার দাম ২৫০-২৬০ টাকা। ডিমে ২৮-৩০ দিন তাপ দিলে বাচ্চা ফুটে। আর এ কাজটি মা রাজহাঁস সম্পন্ন করে থাকে। রাজহাঁস ঘাস, লতাণ্ডপাতা, কচুরিপানা খেয়ে জীবন ধারণ করে থাকে। বাড়তি খাবার কম লাগায় রাজহাঁস পালনে ব্যয় খুবই কম। একটি বড় পুরুষ রাজহাঁসের ৪-৫ কেজি পর্যন্ত মাংস হয়ে থাকে। আকার ভেদে প্রতিটি রাজহাঁস দেড় থেকে দুই হাজার টাকায় বিক্রি হয়। কানাইনগর গ্রামের রাজহাঁস পালনকারী গৃহিণী আছমা বলেন, ‘আমার বাড়িতে আটটি হাঁস আছে। তিন থেকে পাঁচ মাস বয়স হলে বিক্রি করে দেব। এখান থেকে ১০ হাজার টাকা পেলে আমার ছেলে-মেয়ের পড়ালেখার বই খাতার দাম হয়ে যাবে। টাকার জন্য বাড়ির কর্তার কাছে ধরনা দেওয়ার দরকার পড়ে না। গ্রামের লাকি বেগম বলেন, তার ৫টি রাজহাঁস আছে। একটি মেয়ে হাঁস বছরে দু’বার ডিম পাড়ে। একেক বারে ১০-১১টি করে ডিম দেয়। ডিম ফুটিয়ে এক দিন বয়সের এক জোড়া বাচ্চা ৫০০ টাকায় বিক্রি হয়। একটি হাঁস থেকে বছরে ৩ হাজার টাকা আয় হয়ে থাকে। আর একটি বড় হাঁস বিক্রি হয় ১৫০০ থেকে ২ হাজার টাকায়। শিবপর গ্রামের গৃহবধূ তানিয়া আক্তার জানান, একেকটি রাজহাঁস তিন থেকে আটটি ডিম দেয়। চার মাস বয়সের একটি রাজহাঁস থেকে চার-পাঁচ কেজি মাংস পাওয়া যায়। আমার ও আমার সন্তানদের টুকটাক কেনাকাটা, চাহিদার জন্য স্বামীর কাছ থেকে টাকা খুঁজতে হয় না। রাজহাসের আয় থেকে উপার্জিত টাকা থেকে ব্যয় করি। হাঁস-মুরগির পাইকার বাতেন মিয়া জানান, তিনি সোনারামপুর হাট থেকে রাজহাঁস ও অন্যান্য জাতের হাঁস ক্রয় করে ঢাকায় নিয়ে বিক্রি করেন। বড় শহরগুলোতে রাজহাঁসের চাহিদার কারণে লাভও ভালো হয়।
বাঞ্ছারামপুর প্রাণিসম্পদ কার্যালয়ের ভেটেরিনারি সার্জন ডা. সেরদাতুল ইসলামের ভাষ্য, রাজহাঁস যে পরিমাণ প্রোটিন গ্রহণ করে তা অন্য কোনো প্রাণী গ্রহণ করে না। তারা ঘাস, লতাণ্ডপাতা খেয়ে জীবন ধারণ করে তাই এদের তৃণভোজি প্রাণী বলা হয়। তিনি আরও জানান, অন্যান্য প্রাণীর তুলনায় রাজহাঁসের রোগ-ব্যাধি খুব কম। তারপরও আমরা হাস পালনকারীদের প্লেগ ও কলেরা ভ্যাকসিন দেয়ার পরামর্শ দেই।
বাড়ির পাশে ঘাস চাষের ব্যবস্থা থাকলে বাণিজ্যিকভাবে রাজহাঁস পালন করে লাভবান হওয়া সম্ভব বলে মনে করেন তিনি।