ঢাকা শুক্রবার, ১৭ জুলাই ২০২৬, ২ শ্রাবণ ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রভাবে কর্মহীন হবেন ৬০ শতাংশ নারী

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রভাবে কর্মহীন হবেন ৬০ শতাংশ নারী

বাংলাদেশের তৈরি পোশাক (আরএমজি) শিল্পে দ্রুত বাড়ছে অটোমেশন বা স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির ব্যবহার। উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, খরচ কমানো এবং আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার লক্ষ্য নিয়ে কারখানাগুলো যন্ত্রনির্ভর হয়ে উঠলেও এর সবচেয়ে বড় মূল্য দিতে হতে পারে লাখ লাখ শ্রমিককে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), অটোমেশন এবং প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদন ব্যবস্থার দ্রুত বিস্তারের ফলে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাত বড় ধরনের কর্মসংস্থান সংকটের মুখে পড়তে পারে বলে সতর্ক করেছে গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)। সংস্থাটির আশঙ্কা, বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকলে ২০৪১ সালের মধ্যে তৈরি পোশাক খাতের প্রায় ৬০ শতাংশ নারী কর্মী চাকরি হারানোর ঝুঁকিতে পড়বেন। একই সঙ্গে অটোমেশনের কারণে প্রায় ১২ লাখ ২০ হাজার পোশাক শ্রমিকের কর্মসংস্থানও ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।

প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলা, শ্রমবাজারভিত্তিক নীতি সংস্কার এবং কার্যকর রাষ্ট্রীয় প্রস্তুতি না থাকলে দেশের কর্মসংস্থান পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠবে বলে মনে করছে সংস্থাটি। গত বুধবার রাতে সিপিডি আয়োজিত ‘পরিবর্তনশীল কর্মপরিবেশ: বিশ্বের দক্ষিণাঞ্চলে কর্মপরিবেশের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে দূরদৃষ্টি’ শীর্ষক ভার্চুয়াল ওয়েবিনারে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়। অনুষ্ঠানে ‘ভবিষ্যতের কর্মজগতের জন্য বাংলাদেশ প্রস্তুত? অটোমেশন, এআই ও কাঠামোগত পরিবর্তনের জন্য শ্রমবাজারকে প্রস্তুত করা’ শীর্ষক গবেষণাপত্র উপস্থাপন করেন সিপিডির গবেষণা পরিচালক ড. তৌফিকুল ইসলাম খান। উপস্থাপনায় বলা হয়, বাংলাদেশ যখন স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের প্রস্তুতি নিচ্ছে, তখনই বৈশ্বিক অর্থনীতিতে দ্রুতগতির প্রযুক্তিগত পরিবর্তন দেশের শ্রমবাজারের জন্য নতুন বাস্তবতা তৈরি করছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, অটোমেশন, ডিজিটাল অর্থনীতি, জলবায়ু পরিবর্তন, বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য কাঠামোর পরিবর্তন আগামী দিনের কর্মসংস্থানের ধরন বদলে দেবে। ফলে কম দক্ষতাসম্পন্ন শ্রমিকদের জন্য ঝুঁকি বাড়বে এবং উচ্চ দক্ষতাভিত্তিক কর্মসংস্থানের চাহিদা বৃদ্ধি পাবে।

ড. তৌফিকুল ইসলাম বলেন, তৈরি পোশাকশিল্প বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হলেও এই খাতেই অটোমেশনের প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়তে পারে। গবেষণার বিশ্লেষণে দেখা গেছে, উৎপাদন প্রক্রিয়ায় স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রায় ১২ লাখ ২০ হাজার চাকরি ঝুঁকির মুখে পড়বে। এর সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়বে নারী শ্রমিকদের ওপর। কারণ এই খাতে কর্মরত শ্রমিকদের বড় অংশই নারী। গবেষণায় বলা হয়, ২০৪১ সালের মধ্যে তৈরি পোশাক শিল্পে কর্মরত প্রায় ৬০ শতাংশ নারী কর্মী তাদের বর্তমান কর্মসংস্থান হারাতে পারেন, যদি প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ পুনঃদক্ষতা অর্জন এবং নতুন ধরনের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা না যায়। ফলে কর্মসংস্থান রক্ষার পাশাপাশি দক্ষতা উন্নয়নকে এখনই জাতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করার আহ্বান জানানো হয়েছে।

সিপিডির গবেষণায় উঠে এসেছে, ২০২৪ সালে দেশে প্রায় ১৩ লাখ কর্মসংস্থান কমেছে। উদ্বেগজনক বিষয় হলো, হারিয়ে যাওয়া এসব কর্মসংস্থানের প্রায় ৯০ শতাংশই নারী কর্মীদের। এতে বোঝা যায়, শ্রমবাজারে পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় চাপ বহন করছেন নারীরাই। প্রতিবেদনে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের তথ্যও তুলে ধরা হয়। সেখানে বলা হয়েছে, ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বব্যাপী কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও অটোমেশনের কারণে প্রায় এক কোটি ১০ লাখ নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হলেও প্রায় ৯০ লাখ চাকরি বিলুপ্ত হবে। অর্থাৎ প্রযুক্তিগত পরিবর্তন একই সঙ্গে নতুন সুযোগ ও নতুন সংকট তৈরি করবে। যেসব দেশ দক্ষ জনশক্তি তৈরি করতে পারবে, তারাই এই পরিবর্তনের সুফল ভোগ করবে।

সিপিডি বলছে, বাংলাদেশের উৎপাদন খাতে কর্মসংস্থান দীর্ঘদিন ধরে প্রায় ৮১ লাখের কাছাকাছি স্থির রয়েছে। অথচ একই সময়ে উৎপাদনের পরিমাণ বেড়েছে। এর অর্থ হলো, উৎপাদন বাড়লেও কর্মসংস্থান একই হারে বাড়ছে না। প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদন ব্যবস্থায় শ্রমের পরিবর্তে যন্ত্রের ব্যবহার বাড়ায় এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।

অন্যদিকে দেশের সেবা খাতে বর্তমানে প্রায় আড়াই কোটি মানুষ কর্মরত থাকলেও তাদের বড় অংশ অনিরাপদ, নিম্ন উৎপাদনশীল এবং অনানুষ্ঠানিক কর্মসংস্থানে নিয়োজিত। ফলে এই খাতও দীর্ঘমেয়াদে টেকসই কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে পারছে না। গবেষণায় আরও বলা হয়, শিক্ষা ব্যবস্থা থেকে যে দক্ষতা নিয়ে শিক্ষার্থীরা বের হচ্ছেন, তার সঙ্গে শ্রমবাজারের চাহিদার বড় ধরনের অমিল রয়েছে। মাধ্যমিক পর্যায়ে কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ এখনও ২০ শতাংশের নিচে। একই সময়ে শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়ন খাতে সরকারি ব্যয় মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) মাত্র ১ দশমিক ৩ শতাংশ, যা পরিবর্তিত শ্রমবাজারের প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম।

সিপিডি ১৪টি বৈশ্বিক এবং ১৩টি জাতীয় চালিকাশক্তি, মোট ২৭টি পরিবর্তনশীল উপাদান বিশ্লেষণ করে ২০৩৫ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের শ্রমবাজারের চারটি সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ চিত্র তৈরি করেছে। এসব বিশ্লেষণে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডিজিটাল অর্থনীতি, জলবায়ু পরিবর্তন, বৈশ্বিক বাণিজ্য, গিগ অর্থনীতি, প্রযুক্তিগত রূপান্তর, রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং দক্ষতার ঘাটতির মতো বিষয়গুলো বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।

গবেষণায় বলা হয়, ভবিষ্যতের সম্ভাব্য পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারে, তবে পাঁচটি বিষয় প্রায় নিশ্চিত। প্রথমত, ডিজিটালায়ন আর থামানো যাবে না। দ্বিতীয়ত, কর্মসংস্থান ধীরে ধীরে উচ্চমূল্য সংযোজনকারী সেবা খাতের দিকে স্থানান্তরিত হবে। তৃতীয়ত, শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়ন ব্যবস্থা শ্রমবাজারের পরিবর্তনের তুলনায় পিছিয়েই থাকবে। চতুর্থত, বৈশ্বিক বাণিজ্য, জলবায়ু পরিবর্তন ও আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ধাক্কার ঝুঁকি অব্যাহত থাকবে। পঞ্চমত, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতাই নির্ধারণ করবে এই পরিবর্তনের সুফল কতটা কাজে লাগানো সম্ভব হবে।

গবেষণায় বর্তমান নীতিমালার চারটি বড় ঘাটতির কথাও তুলে ধরা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে গিগ ও প্ল্যাটফর্মভিত্তিক শ্রমিকদের জন্য সমন্বিত নীতিমালার অভাব, অটোমেশনের প্রভাব নীতিনির্ধারণে যথাযথভাবে প্রতিফলিত না হওয়া, দক্ষতা উন্নয়ন পরিকল্পনায় বাস্তব চাহিদার প্রতিফলন না থাকা এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে সুস্পষ্ট বাস্তবায়ন পরিকল্পনার অনুপস্থিতি। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সিপিডি কয়েকটি সুপারিশ করেছে। সংস্থাটির মতে, শিল্পের চাহিদাভিত্তিক কারিগরি শিক্ষা সংস্কার করতে হবে। পাশাপাশি আজীবন পুনঃদক্ষতা অর্জনের সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে, যাতে কর্মীরা প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে পারেন। কর্মসংস্থান সৃষ্টির সঙ্গে শিল্প প্রণোদনাকে যুক্ত করা, শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়ন খাতে সরকারি বিনিয়োগ বাড়ানো, জাতীয় শ্রমবাজার তথ্যব্যবস্থা গড়ে তোলা, গিগ ও প্ল্যাটফর্ম কর্মীদের সামাজিক সুরক্ষার আওতায় আনা এবং নারী, তরুণ ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক কর্মসংস্থান কৌশল গ্রহণের সুপারিশও করা হয়েছে।

ওয়েবিনারে সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, বিশ্ব দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে এবং সেই পরিবর্তনের সঙ্গে কর্মসংস্থানের ধরনও বদলে যাচ্ছে। কিন্তু নীতিনির্ধারকরা এই পরিবর্তনের গতির সঙ্গে তাল মেলাতে হিমশিম খাচ্ছেন। একদিকে দীর্ঘদিনের কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা, অন্যদিকে শ্রমবাজারের চাহিদা ও দক্ষতার মধ্যে বড় ধরনের অমিল রয়েছে। একই সময়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও অটোমেশনের বিপ্লব শ্রমবাজারকে নতুন বাস্তবতায় নিয়ে যাচ্ছে। তিনি বলেন, এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো পরিবর্তনের বাস্তবতা স্বীকার করে সময়োপযোগী নীতি গ্রহণ করা। অন্যথায় প্রযুক্তিগত অগ্রগতির সুফল সীমিত মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে এবং বিপুলসংখ্যক শ্রমিক কর্মসংস্থান হারানোর ঝুঁকিতে পড়বেন।

তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের শ্রমবাজার এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। প্রযুক্তিগত পরিবর্তন ঠেকানো সম্ভব নয়, তবে পরিকল্পিত নীতি, দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়ন, কার্যকর বাস্তবায়ন এবং রাজনৈতিক অঙ্গীকারের মাধ্যমে এই পরিবর্তনকে দেশের অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানের জন্য সুযোগে পরিণত করা সম্ভব। অন্যথায় প্রবৃদ্ধি বাড়লেও তা টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক কর্মসংস্থানে রূপান্তর করা কঠিন হয়ে পড়বে।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত