
লাল মাটির পথ পেরিয়ে বাগানে ঢুকতেই চোখে পড়ে সারি সারি সবুজ গাছ। গাছের ডালে থোকায় থোকায় ঝুলছে সোনালি-বাদামি রঙের লংগান। দেখতে অনেকটা লিচুর মতো হলেও স্বাদ ও বৈশিষ্ট্যে আলাদা এই বিদেশি ফল এখন ময়মনসিংহের ভালুকার গোয়ারী গ্রামের একটি বাগানে তৈরি করেছে নতুন আকর্ষণ। শুধু সৌন্দর্য নয়, লংগান চাষের মাধ্যমে সম্ভাবনার নতুন দিগন্তও দেখছেন উদ্যোক্তারা।
কয়েক বছর আগেও এই জমিতে দেশীয় ফলের চাষ করতেন উদ্যোক্তা শেখ মামুন ও আশরাফ শুভ। আম, পেয়ারা কিংবা বরই চাষ করে কাঙ্ক্ষিত লাভ না পাওয়ায় তারা ভিন্ন কিছু করার চিন্তা করেন। সেই চিন্তা থেকেই ২০২০ সালের শেষ দিকে থাইল্যান্ড থেকে লংগানের চারা এনে শুরু করেন পরীক্ষামূলক চাষ।
পরীক্ষামূলক সেই উদ্যোগ এখন ধীরে ধীরে বাণিজ্যিক সাফল্যে রূপ নিচ্ছে। প্রায় ২০ বিঘা জমির বাগানে রয়েছে ফোর সিজন, কোহালা, রুবি, হোয়াইট, পিংপং ও ডায়মন্ড রিভারসহ বিভিন্ন জাতের লংগান। পাশাপাশি থাই কাটি মন, পেঁপেসহ অন্যান্য দেশি-বিদেশি ফলেরও চাষ হচ্ছে।
উদ্যোক্তা আশরাফ শুভ বলেন, লংগানের বিভিন্ন জাত নিয়ে কয়েক বছর ধরে তারা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছেন। বাংলাদেশের আবহাওয়ায় কোন জাত সবচেয়ে ভালো ফলন দেয়, কোনটির স্বাদ বেশি এবং কোন জাতের শাঁস তুলনামূলক বেশি- এসব বিষয় পর্যবেক্ষণ করছেন তারা।
তিনি আরও বলেন, তাদের লক্ষ্য শুধু ফল উৎপাদন ও বিক্রি নয়। বাংলাদেশের মাটি ও আবহাওয়ার জন্য সবচেয়ে উপযোগী লংগানের জাত নির্বাচন করাও তাদের অন্যতম উদ্দেশ্য। এবার বাগান থেকে প্রতি কেজি লংগান প্রায় ৪০০ টাকা দরে বিক্রি হয়েছে। দেশের বিভিন্ন ফলের আড়ত ও সুপারশপের প্রতিনিধিরা সরাসরি বাগান থেকে ফল সংগ্রহ করেছেন। লংগান চাষের একটি মজার সমস্যার কথাও জানান উদ্যোক্তা আশরাফ শুভ। তাঁর ভাষায়, ‘লংগানের সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী মানুষ নয়, পাখি।’ ফল পাকতে শুরু করলেই বাগানে পাখির আনাগোনা বেড়ে যায়। তবে পাখিদের তাড়াতে গাছে জাল ব্যবহার করেন না তারা। প্রকৃতির অংশ হিসেবে পাখিদের জন্যও কিছু ফল গাছে রেখে দেন।
বাগানটি এখন শুধু ফল উৎপাদনের জায়গা নয়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ইউটিউবের কারণে অনেকটা কৃষিপর্যটনের কেন্দ্রেও পরিণত হয়েছে। দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ এখানে আসছেন লংগান দেখতে, ফল কিনতে এবং চারা সংগ্রহ করতে।
উদ্যোক্তারা জানান, বিদেশি ফল হলেও বাংলাদেশের আবহাওয়ায় লংগান ভালোভাবে মানিয়ে নেওয়ার সম্ভাবনা দেখা গেছে। তাই ভবিষ্যতে এর বাণিজ্যিক চাষ আরও বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে তাদের। ভালুকা উপজেলা কৃষি বিভাগের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা নূর জাহান বলেন, বাংলাদেশের আবহাওয়ায় লংগান গাছ ভালোভাবেই বেড়ে উঠছে এবং ফলনও পাওয়া যাচ্ছে। তুলনামূলক কম পরিচর্যায় ভালো ফলন পাওয়ার সম্ভাবনা থাকায় বাণিজ্যিকভাবে এ ফলের চাষের সুযোগ রয়েছে।