
বাংলাদেশে গত দেড় দশকে আর্থিক সেবার পরিধি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। প্রচলিত ব্যাংকিং ব্যবস্থার পাশাপাশি মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস), এজেন্ট ব্যাংকিং, বেসরকারি আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও ডিজিটাল ইন্স্যুরেন্সের মতো নতুন সেবা যুক্ত হওয়ায় মানুষের কাছে আর্থিক সেবা পৌঁছানোর পথ সহজ হয়েছে। তবে শুধু লেনদেনের সুযোগ বাড়ানো নয়, মানুষের আর্থিক ঝুঁকি মোকাবিলার সক্ষমতা বাড়াতেও এখন গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। এক্ষেত্রে আর্থিক অন্তর্ভুক্তির নতুন দিগন্ত খুলতে পারে বিমা খাত।
খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ব্যাংকিং ও ডিজিটাল আর্থিক সেবার বিস্তারের পাশাপাশি সাশ্রয়ী ও সহজলভ্য বিমা সেবা সম্প্রসারণ করা গেলে দেশের আর্থিক অন্তর্ভুক্তির পরবর্তী ধাপে নতুন গতি আসতে পারে। বিশেষ করে কর্মস্থলভিত্তিক বিমা কাভারেজের মাধ্যমে বিপুলসংখ্যক শ্রমজীবী মানুষকে আর্থিক সুরক্ষার আওতায় আনা সম্ভব। ফলে আর্থিক অন্তর্ভুক্তির অর্থ শুধু ব্যাংক হিসাব বা লেনদেনের সুযোগে সীমাবদ্ধ না থেকে মানুষের জীবন, আয় ও সম্পদের ঝুঁকি মোকাবিলার সক্ষমতা তৈরির দিকেও বিস্তৃত হতে পারে। একসময় ব্যাংক হিসাব খোলা, টাকা জমা বা উত্তোলনের মতো সাধারণ আর্থিক সেবা নিতে গ্রাহকদের ব্যাংকের শাখায় যেতে হতো। বর্তমানে ডিজিটাল প্রযুক্তির বিস্তারের ফলে অনেক আর্থিক লেনদেন ও সেবা ঘরে বসেই নেওয়া সম্ভব হচ্ছে। ডিজিটাল ব্যাংকিং, এমএফএস, ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও ডিজিটাল ইন্স্যুরেন্স সব মিলিয়ে আর্থিক সেবার ধরনেও এসেছে বড় পরিবর্তন।
বাংলাদেশে মোবাইলের মাধ্যমে আর্থিক সেবার যাত্রা শুরু হয় ২০১১ সালের মার্চে। শুরুতে টাকা পাঠানো ও উত্তোলনের মধ্যে এমএফএসের ব্যবহার সীমিত থাকলেও সময়ের সঙ্গে এর পরিধি বেড়েছে। এখন বেতন দেওয়া, রেমিট্যান্স গ্রহণ, বিল পরিশোধ, দোকানে কেনাকাটায় মূল্য পরিশোধ এবং সরকারি অর্থ বিতরণের মতো বিভিন্ন সেবাও মোবাইল আর্থিক ব্যবস্থার মাধ্যমে দেওয়া হচ্ছে। এর ফলে প্রচলিত ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে থাকা মানুষের আনুষ্ঠানিক আর্থিক সেবার সঙ্গে যুক্ত হওয়ার সুযোগ সহজ হয়েছে। বিশ্বব্যাংকের গ্লোবাল ফিনডেক্সের তথ্যেও আর্থিক অন্তর্ভুক্তির অগ্রগতির চিত্র পাওয়া যায়।
সংস্থাটির তথ্য বলছে, ২০১১ সালে বাংলাদেশে ১৫ বছর ও তার বেশি বয়সী মানুষের ৩১ দশমিক ৭৪ শতাংশের ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানে অ্যাকাউন্ট ছিল। ২০২৪ সালে এই হার বেড়ে দাঁড়ায় ৪৩ শতাংশে। একই মানদণ্ডে হিসাব করা এ পরিসংখ্যান দেখায়, এক দশকের বেশি সময়ে আনুষ্ঠানিক আর্থিক ব্যবস্থার আওতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
বিমার আওতায় আনার ক্ষেত্রে কোনো নির্দিষ্ট শ্রেণিকে বাদ দেওয়া উচিত নয়। একেবারে দরিদ্র জনগোষ্ঠী থেকে শুরু করে আল্ট্রা রিচ বা অতি ধনী সমাজের সর্বস্তরের মানুষকে বিমার আওতায় আনা সম্ভব। একইভাবে বিভিন্ন শিল্প ও প্রতিষ্ঠানের সম্পদ এবং কর্মীদেরও এ ব্যবস্থার মধ্যে আনা যায়। তবে আর্থিক অন্তর্ভুক্তির অর্থ শুধু একটি ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানে অ্যাকাউন্ট থাকা নয়। মানুষ সেই আর্থিক সেবা ব্যবহার করে ভবিষ্যতের জন্য সঞ্চয় করতে পারছেন কি না এবং আকস্মিক আর্থিক ঝুঁকি মোকাবিলা করতে পারছেন কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। গ্লোবাল ফিনডেক্সের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে আনুষ্ঠানিকভাবে সঞ্চয় করেন মাত্র ১১ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ। অর্থাৎ, আর্থিক সেবায় প্রবেশের সুযোগ তৈরি হলেও সঞ্চয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ ব্যবহারে এখনও বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে।
আকস্মিক আর্থিক সংকটের ক্ষেত্রে এ ঘাটতির গুরুত্ব আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। অসুস্থতা, দুর্ঘটনা কিংবা কোনো কারণে আয় বন্ধ হয়ে গেলে একটি পরিবারের ওপর বড় ধরনের আর্থিক চাপ তৈরি হতে পারে। ফলে আর্থিক অন্তর্ভুক্তির পরবর্তী পর্যায়ে শুধু লেনদেনের সুযোগ নিশ্চিত করাই যথেষ্ট নয়, মানুষের আর্থিক ঝুঁকি মোকাবিলার সক্ষমতাও বাড়ানো প্রয়োজন। এখানেই বিমা সেবার গুরুত্ব সামনে আসে।
বিমা বিপদের বন্ধু হলেও বাংলাদেশে বিমা প্রবেশ হার দীর্ঘদিন ধরেই নিম্ন পর্যায়ে অবস্থান করছে। বর্তমানে জিডিপিতে বিমা খাতের অবদান শূন্য দশমিক ৪০ শতাংশের মতো। ২০২০ সালে এ হার ছিল জিডিপির প্রায় শূন্য দশমিক ৫০ শতাংশ। অর্থনীতির আকার ও জনগণের আয় বৃদ্ধি পেলেও বিমা খাতের সম্প্রসারণ সেই অনুপাতে ঘটেনি, যা দেশের আর্থিক খাতের একটি গুরুত্বপূর্ণ সীমাবদ্ধতাকে নির্দেশ করে। অন্যদিকে, এশিয়ার বিভিন্ন দেশ বিমা খাতের বিকাশে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। মালয়েশিয়ায় ২০২৪ সালে বিমা প্রবেশ হার ছিল সাড়ে ৪ থেকে ৫ শতাংশের মধ্যে। শ্রীলঙ্কায় ২০২০ সালে ছিল ১ দশমিক ৩০ শতাংশ, সেখান থেকে বেড়ে ২০২৪ সালে ১ দশমিক ৪০ থেকে ১ দশমিক ৬০ শতাংশে পৌঁছেছে।
একই সময়ে ভারতে বিমা প্রবেশ হার ৩ দশমিক ২০ শতাংশ থেকে বেড়ে প্রায় ৩ দশমিক ৭০ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। চীনে এ হার ৪ শতাংশ থেকে সাড়ে ৪ শতাংশেরও বেশি। অন্যদিকে, জাপান এশিয়ার অন্যতম শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে, যেখানে বিমা প্রবেশ হার দীর্ঘদিন ধরে জিডিপির ৮ থেকে ১০ শতাংশেরও বেশি।
এ বিষয়ে প্রগতি লাইফের মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মো. জালালুল আজিম বলেন, আর্থিক অন্তর্ভুক্তির আলোচনায় সাধারণত ব্যাংকিং খাতকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হলেও বিমা খাতও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। সর্বস্তরের জনগণকে বিমার আওতায় আনা এবং সব ধরনের সম্পদকে বিমা সুরক্ষার মধ্যে নিয়ে আসা সম্ভব হলে দেশের অর্থনীতিতে বিমা খাত আরও ভালো ভূমিকা রাখতে পারবে। বাংলাদেশে আনুষ্ঠানিকভাবে সঞ্চয় করেন মাত্র ১১ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ। অর্থাৎ, আর্থিক সেবায় প্রবেশের সুযোগ তৈরি হলেও সঞ্চয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ ব্যবহারে এখনও বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে। তিনি বলেন, আমরা ইনক্লুসিভ ইন্স্যুরেন্স বলতে সর্বস্তরের জনগণকে বিমার আওতায় আনা এবং সব ধরনের সম্পত্তিকে বিমা সুরক্ষার মধ্যে নিয়ে আসাকে বুঝি। এগুলো করা সম্ভব হলে অর্থনীতিতে একটি ভালো ভূমিকা রাখা সম্ভব।
বিপুলসংখ্যক মানুষকে বিমার আওতায় আনার মাধ্যমে কম প্রিমিয়ামে বিমা সুরক্ষা দেওয়া সম্ভব বলে মনে করেন জালালুল আজিম। তার ভাষ্য, দুর্ঘটনা বিমার ক্ষেত্রে আপনি যদি ১৮ কোটি মানুষের মধ্যে ১০ কোটি মানুষকে আনতে পারেন, তাহলে খুব কম প্রিমিয়ামের মধ্যেই তাদের দুর্ঘটনা বিমার আওতায় আনা সম্ভব। কয়েক লাখ মানুষকে আনলে প্রিমিয়াম বেশি হবে। কিন্তু কয়েক কোটি মানুষকে আনতে পারলে অনেক কম টাকায় এই সেবা দেওয়া সম্ভব। তিনি আরও বলেন, প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক মানুষ বাস ও ট্রেনে যাতায়াত করছেন। তাদের টিকিটের সঙ্গে ৫ বা ১০ টাকা প্রিমিয়াম যুক্ত করে বড় অঙ্কের বিমা ঝুঁকির আওতায় আনা সম্ভব। একইভাবে অফিস-আদালত, বাড়িঘর, মিল-কারখানা, অ্যাপার্টমেন্টসহ বিভিন্ন সম্পদকে বিমার আওতায় আনতে পারলে কম প্রিমিয়ামে সেগুলোর ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা করা সম্ভব। জালালুল আজিম বলেন, বিমার আওতায় আনার ক্ষেত্রে কোনো নির্দিষ্ট শ্রেণিকে বাদ দেওয়া উচিত নয়। একেবারে দরিদ্র জনগোষ্ঠী থেকে শুরু করে আল্ট্রা রিচ বা অতি ধনী সমাজের সর্বস্তরের মানুষকে বিমার আওতায় আনা সম্ভব। একইভাবে বিভিন্ন শিল্প ও প্রতিষ্ঠানের সম্পদ এবং কর্মীদেরও এ ব্যবস্থার মধ্যে আনা যায়।
বিশেষত কর্মস্থলভিত্তিক উদ্যোগের মাধ্যমে অধিকসংখ্যক মানুষের কাছে বিমা সুরক্ষা পৌঁছে দেওয়া সম্ভব। কর্মস্থলকে কেন্দ্র করে বিমা সুবিধা দেওয়া হলে প্রত্যেক ব্যক্তিকে আলাদাভাবে সেবা খুঁজে নেওয়ার প্রয়োজন কমে যায়। একই সঙ্গে স্বল্পআয়ের মানুষকে আনুষ্ঠানিক আর্থিক ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করাও সহজ হয়- এমন অভিমত দেন প্রগতি লাইফের সিইও। এই আর্থিক অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রে দেশের তৈরি পোশাকশিল্প গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। ২০২৪ সালে জাতীয় সংসদে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দেশে তৈরি পোশাক খাতে মোট ৫০ লাখ ১৭ হাজার ৬৫২ জন শ্রমিক রয়েছেন। এত বড় একটি কর্মীশক্তিকে বিমা সুরক্ষার আওতায় আনা গেলে বিপুলসংখ্যক মানুষের আর্থিক নিরাপত্তা বাড়ানোর পাশাপাশি তাদের আনুষ্ঠানিক আর্থিক ব্যবস্থার সঙ্গে আরও কার্যকরভাবে যুক্ত করা সম্ভব। সম্প্রতি বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স এাসোসিয়েশন (বিকেএমইএ) এবং গার্ডিয়ান লাইফ ইন্স্যুরেন্সের মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারক এ ধরনের উদ্যোগের একটি উদাহরণ। সমঝোতার আওতায় বিকেএমইএর আড়াই হাজারের বেশি সদস্য কারখানার শ্রমিক-কর্মীরা বছরে মাত্র ২৫০ টাকা প্রিমিয়ামে বিমা সুবিধা পাবেন। পাশাপাশি ২৪ ঘণ্টা চিকিৎসা পরামর্শ এবং ৫০০টির বেশি হাসপাতালে মূল্যছাড়ের সুবিধাও পাওয়া যাবে। এ সুবিধার আওতায় পরিবারের সদস্যদেরও অন্তর্ভুক্ত করার সুযোগ রয়েছে। সহজ ও সাশ্রয়ী ইন্স্যুরেন্স সেবা আরও মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে পারলে আর্থিক অন্তর্ভুক্তির পরিধি যেমন বাড়বে, তেমনই মানুষের আর্থিক সক্ষমতাও আরও শক্তিশালী হবে।
বিকেএমইএর সঙ্গে গার্ডিয়ান লাইফের এ উদ্যোগকে অন্তর্ভুক্তিমূলক বিমার উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেন জালালুল আজিম। তিনি বলেন, বিকেএমইএর সঙ্গে যে ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, এটিকেও ইনক্লুসিভ ইন্স্যুরেন্সের মধ্যে ফেলা যায়। এর আগে বিজিএমইএর সঙ্গেও এ ধরনের উদ্যোগ ছিল, যা বর্তমানে বন্ধ হয়ে গেছে। বিভিন্ন শিল্প সংগঠনের সঙ্গে এ ধরনের উদ্যোগ সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, বিজিএমইএ, বিকেএমইএ, সিরামিক ইন্ডাস্ট্রি এসোসিয়েশনসহ যত ধরনের শিল্প সংগঠন আছে, সবার সঙ্গেই এ ধরনের উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে।