
দেশে ডিজিটাল সেবা বা ই-গভর্নেন্স চালুর উদ্যোগ নেওয়া হলেও এর কাঙ্ক্ষিত সুফল পাচ্ছে না নারী, তরুণ ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর বড় একটি অংশ। অবকাঠামোগত দুর্বলতা, ডিজিটাল দক্ষতার ঘাটতি, ইন্টারনেট বিভ্রাট ও তথ্যের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের কারণে অনলাইনে আবেদন করার পরও অনেক নাগরিককে সেবা নিতে সরকারি দপ্তরে সশরীরে যেতে হচ্ছে। ১০০ স্কোরের মধ্যে স্থানীয় সরকার দপ্তরগুলোর সার্বিক ই-গভর্নেন্স প্রস্তুতি সূচকে স্কোর পাওয়া গেছে মাত্র ৩৮ দশমিক ৯। বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) 'ইস্টাবলিশিং ইফেক্টিভ অ্যান্ড অ্যাকাউন্টাবল ই-গভর্নেন্স টু স্ট্রেন্থেন লোকাল গভর্নমেন্ট ইনস্টিটিউশনস' শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
ইউএসএআইডি, সুইজারল্যান্ড, কানাডা ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের সহায়তায় পরিচালিত এ গবেষণায় ২ হাজার ৬১১ জন নাগরিক এবং ইউনিয়ন ও উপজেলা পর্যায়ের ২৯৭টি সরকারি দপ্তর থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। গতকাল সোমবার রাজধানীর গুলশানের লেকশোর হোটেলের লা ভিটা হলে 'ই-গভর্নেন্স অ্যাট দ্য লোকাল গভর্নমেন্ট ইনস্টিটিউশনস: কারেন্ট স্টেট অ্যান্ড ওয়ে ফরওয়ার্ড' শীর্ষক সংলাপে গবেষণা প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়।
গবেষণার তথ্যমতে, সরকারি সেবাকে ডিজিটাল বলা হলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে পুরো প্রক্রিয়া অনলাইনে শেষ করার সুযোগ নেই। জরিপে অংশ নেওয়া নারীদের মাত্র ১ দশমিক ৮ শতাংশ এবং তরুণদের ২ দশমিক ৯ শতাংশ সম্পূর্ণ অনলাইন প্রক্রিয়ায় সেবা নিতে পেরেছেন। প্রায় ৩৭ শতাংশ নারী ও তরুণ জানিয়েছেন, অনলাইনে আবেদন করার পরও পরবর্তী প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে তাদের কাগজপত্র জমা দিতে এবং সশরীরে লাইনে দাঁড়াতে হয়েছে। প্রায় এক-তৃতীয়াংশ নাগরিককে অফলাইনে ফি পরিশোধ কিংবা স্বাক্ষর করতে হয়েছে। সরকারি সেবা পেতে ঘুষ দেওয়ার অভিযোগও করেছেন অনেক নাগরিক।
ই-গভর্নেন্সের পথে বড় বাধা হিসেবে ডিজিটাল দক্ষতার ঘাটতি ও ইন্টারনেট বিভ্রাটকে চিহ্নিত করেছে সিপিডি। গবেষণায় দেখা গেছে, প্রায় অর্ধেক নাগরিকের ডিজিটাল সাক্ষরতায় ঘাটতি রয়েছে। অধিকাংশ পরিবারের সদস্যদের মৌলিক কম্পিউটার ব্যবহারের প্রয়োজনীয় দক্ষতাও নেই।
ডিজিটাল সেবায় ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা নিয়েও নাগরিকদের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে। বিশেষ করে নারীদের একটি বড় অংশ ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে তথ্য হ্যাক হওয়া কিংবা সরকারি কর্মীদের মাধ্যমে ব্যক্তিগত তথ্যের অপব্যবহারের আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন।
সরকারি দপ্তরগুলোর অবকাঠামোগত দুর্বলতার চিত্রও উঠে এসেছে প্রতিবেদনে। ১০০ স্কোরের মধ্যে স্থানীয় সরকার দপ্তরগুলোর সার্বিক ই-গভর্নেন্স প্রস্তুতি সূচকে স্কোর মাত্র ৩৮ দশমিক ৯।
মাঠপর্যায়ের বিভিন্ন সরকারি কার্যালয়ে কম্পিউটার অকেজো অবস্থায় পড়ে থাকার তথ্য পাওয়া গেছে। অধিকাংশ দপ্তরেই জরুরি বিদ্যুৎ সরবরাহের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেই।
ই-গভর্নেন্সের প্রস্তুতিতে অঞ্চলভেদেও বড় পার্থক্য রয়েছে। ময়মনসিংহ ও রাজশাহী বিভাগ তুলনামূলক ভালো অবস্থানে থাকলেও রংপুর বিভাগের পারফরম্যান্স সবচেয়ে নিচে রয়েছে।
সেবা নিতে গিয়ে সমস্যায় পড়লেও অধিকাংশ নাগরিক প্রাতিষ্ঠানিক অভিযোগ প্রক্রিয়া সম্পর্কে জানেন না। ফলে ভোগান্তির শিকার হওয়ার পরও তারা অভিযোগ দায়ের করেন না।
পরিস্থিতি উত্তরণে প্রতিটি পরিবার থেকে অন্তত একজন সদস্যকে সরকারি ই-সেবা ব্যবহারে দক্ষ করে তুলতে 'ওয়ান ডিজিটাল মেম্বার পার হাউসহোল্ড' কর্মসূচি গ্রহণের সুপারিশ করেছে সিপিডি।
একই সঙ্গে আবেদন থেকে শুরু করে সেবা পাওয়ার শেষ ধাপ পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়াকে অনলাইনের আওতায় আনা, তৃণমূল পর্যায়ের সরকারি দপ্তরে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও আধুনিক যন্ত্রপাতি নিশ্চিত করা এবং নাগরিকদের তথ্যের নিরাপত্তা জোরদারের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
নাগরিক ভোগান্তি কমাতে সহজ অভিযোগ ব্যবস্থা চালু এবং প্রতিটি সেবা পেতে নির্ধারিত সময়সীমা দৃশ্যমান স্থানে উল্লেখ করারও সুপারিশ করেছে সিপিডি।
সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুনের সভাপতিত্বে সংলাপে প্রধান অতিথি ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা বিষয়ক উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর।
আলোচনায় অংশ নেন আইসোশ্যালের চেয়ারম্যান ড. অনন্য রায়হান, পাবলিক ফাইন্যান্স ম্যানেজমেন্টের এমআইএস বিশেষজ্ঞ আমিনুল মহাইমেন, এটুআইয়ের জ্যেষ্ঠ পরামর্শক ফজলুল জাহেদ পাভেল, বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালসের জনপ্রশাসন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মোহাম্মদ নূর উল্লাহ এবং সাভার উপজেলা মহিলাবিষয়ক কর্মকর্তা মোহাম্মদ হাফিজুর রহমান।