ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৯ ভাদ্র ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

বাসের দখলেই মহাখালীর রাস্তা

বাসের দখলেই মহাখালীর রাস্তা

রাজধানীর যানজট কমাতে ও সড়ক সুশৃঙ্খল করতে মহাখালী বাস টার্মিনালের দীর্ঘদিন অলস বসে থাকা বাসগুলোকে পূর্বাচলের ৩ নম্বর সেক্টরে নবনির্মিত অস্থায়ী বাস ডিপোতে সরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কিন্তু এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে বাস মালিক ও চালকদের অনাগ্রহ তৈরি হওয়ায় মহাখালী ও আশপাশের রাস্তাগুলোতে এখনও আগের মতোই বাসের দখল কাটেনি। মহাখালী, তেজগাঁও ও তেজগাঁও লিংক রোড এলাকায় বাসগুলো সার বেঁধে রাস্তার ওপর রাখা হচ্ছে আগের মতোই। অস্থায়ী ডিপোর স্থানটির নাম একসময় ছিল আলমপুরা গ্রাম। এখন সেটিকে পূর্বাচল তিন নম্বর সেক্টরের নতুন বাস ডিপো বললে মানুষ চেনে। স্থানটি অনেকটা গ্রাম-শহরের মিশেল। একদিকে গরু চড়ছে, আরেকদিকে চলছে বিরাট ডিপো নির্মাণের কাজ। কাছেই ৩০০ ফিট এক্সপ্রেসওয়ে, দিনভর কেবল দ্রুতগামী যানবাহনের শাঁ শাঁ ছুটে চলার শব্দ। গত ১৫ জুলাই মহাখালী বাস টার্মিনালে অলস বসে থাকা বাসগুলোকে পূর্বাচলের নতুন ডিপোতে নেওয়া শুরু হয়। তবে কার্যক্রম শুরুর দেড় মাসেও সেখানে যাচ্ছে না অলস বাসগুলো।

মহাখালী বাস টার্মিনাল থেকে প্রায় ১৮ কিলোমিটার দূরের ওই ডিপোতে বাস কর্মীদের ঘুমানোর জন্য একটি অস্থায়ী তাঁবু করা হয়েছে। বাথরুম, খাবারের রেস্তোরাঁসহ গাড়ি ধোয়ার সুবিধাও যুক্ত করা হচ্ছে। তবে কাজ এখনো পুরোপুরি শেষ হয়নি। সেই কারণেই এখনো সেখানে যেতে অনীহা বলে জানাচ্ছেন পুলিশ ও বাস মালিক নেতারা। তারা বলছেন, সেখানে এখনো পুরোপুরি নির্মাণকাজ শেষ হয়নি, বৃষ্টি হলে গাড়ি তলিয়ে যায়। থাকার জায়গাও পুরোপুরি তৈরি হয়নি। দ্রুতই নির্মাণকাজ শেষ হয়ে যাবে জানিয়ে তারা বলছেন, আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে সেখানে বাধ্যতামূলকভাবে গাড়ি পাঠানো শুরু হবে। ২৪ অগাস্ট পূর্বাচলের ওই বাস ডিপোতে গিয়ে সব মিলিয়ে ১৪টির মতো বাস দেখা গেল। মহাখালীতে এলাকায় যখন বাস রাখতে ঠেলাঠেলি, পুলিশের সঙ্গে হরদম লুকোচুরি খেলা; তখন পূর্বাচলের ১০ একর জায়গার এই বাস ডিপো প্রায় খালিই বলা যায়।

মহাখালী থেকে মূলত বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চলের বাস যাতায়াত করলেও নতুন ডিপোতে ময়মনসিংহ রুটের বাস নেই বললেই চলে। দেখা গেল আহনাফ পরিবহনের চারটি বাস, বিলাস পরিবহনের তিনটি এবং ইউনাইটেড, শ্যামলী বাংলা, নিউ পিংকি, এসআর প্লাস পরিবহনের কয়েকটি করে বাস রাখা। শ্যামলী বাংলা বাসটি বাদে এগুলোর সবই উত্তরবঙ্গ ও সিলেট রুটে চলাচল করছে।

থাকা-খাওয়ার সুবিধা পরিপূর্ণ হয়নি : অস্থায়ী ডিপোর একটি বেশ বড় তাঁবুর নিচে প্রায় ২০টির মতো চৌকি পাতা। তাতে ঘুমাচ্ছিলেন বেশ কয়েকজন গাড়ি চালক। ঘরে আছে ফ্যানের ব্যবস্থা। এ তাঁবুটি পুলিশ করে দিয়েছে। তবে সেখানে মহাখালীর বাস পুরোমাত্রায় রাখা শুরু হলে পাঁচশর মতো গাড়ি আসবে বলে ধারণা দিয়েছেন কর্মকর্তারা। ভোর বেলা তাবুতে এসে এক ঘুম দিয়ে সকালে চা হাতে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন আহনাফ পরিবহনের বাস চালক জাহাঙ্গীর আলম শুভ। তিনি বলছেন, পঞ্চগড়-নীলফামারী থেকে ভোরবেলা ট্রিপ নিয়ে মহাখালীতে যাত্রী নামিয়ে এখানে চলে এসেছেন। গাড়ি পার্ক করে ঘুম দিয়েছেন। কিছুক্ষণ পর দুপুরের খাবার খাবেন।

আলাপচারিতায় শুভ বলছিলেন, 'আমার বাড়ি টাঙ্গাইল। টানা তিন-চারদিন ডিউটির পর বাড়ি যাইতে পারি। 'ঢাকায় তো আমার কোনো থাকার জায়গা নাই। খুব সুবিধা হইছে আমাদের। এখানে থাকতে টাকা লাগে না কোনো। বাথরুম, হোটেল- সব ব্যবস্থা আছে।' এর পরও কেন এখানে বাস আসতে চাইছে না, এমন প্রশ্নে শুভ বললেন, 'এইখানে আসতে-যাইতে প্রায় হাজার টাকার তেল পুড়ায়, আবার সময়ও নষ্ট হয়। 'এই কারণে শুধু নাইট টু নাইট যারা চলে, তারাই এখানে আসতেছে। বাকিরা আসতে চায় না।'

বিলাস পরিবহনের চালকের সহকারী সুজন এতক্ষণ বাসের ভেতর সজোরে গান চালিয়ে দিয়ে বাহনটির ভেতর-বাইরে পরিষ্কার করছিলেন। বাস ধোয়া শেষে ঘেমে একাকার সুজন গামছা-লুঙ্গি হাতে চললেন গোসল করতে। এরপর খেয়ে একটা ঘুম দেবেন।

সুজন বললেন, 'গাবতলী-মহাখালী হইলে আমাগো তো গাড়ি রাইখা নড়ার উপায় থাহে না। এটা-ওটা চুরি হইয়া যায়, আস্তা গাড়িই নিয়া যায়। এইহানে সিস্টেম ভালা, পুলিশ মামারা রইছে। গোসল দিয়া বিছানায় হুইতা দিমু ঘুম।'

সুজনের ভাষ্য, তার জন্য ফ্যানের বাতাসের নিচে নরম বিছানায় শুতে পারাই 'বিরাট ব্যাপার'। না হলে এই ভ্যাপসা গরমের মধ্যে গাড়ির ভেতরে কোথাও অথবা মালামাল রাখার বক্সের ডালা খুলে রেখে সেখানে ঘুমাতে হতো। 'হেলপারের জন্য তো আর বাসের এসি চালিয়ে ঘুমানোর সুযোগ কোনো মালিক দেবেন না।'

আরেক বাস চালক ইব্রাহিম বললেন, 'এইখানে অনেকে আসতে চায় না, কারণ এখানে কোনো মিস্ত্রি নাই। ট্রিপ মাইরা আসার পর সবাই চায় গাড়িটা চেক দিতে, টুকটুাক কাম (মেরামতি) থাকেই। 'সেইটা এইখানে করানো যায় না। মহাখালী বা গাবতলীতে গাড়ি রাইখা খালি মিস্ত্রি কল দিলেই আইসা পরে, মালও (স্পেয়ার পার্টস) এবেইলেবেল।' তাঁবুর কাছেই রুবেল মিয়ার চায়ের দোকান। সকাল ১০টার দিকে রুবেল মিয়া সিঙ্গারা ভাজার আয়োজনে ব্যস্ত। ওদিকে চলছে দুপুরের খাবারের যোগাড়যন্তর। রুবেল মিয়া এক সপ্তাহ হয়েছে এখানে বসছে। বেচাবিক্রি সেভাবে জমেনি এখনো। রুবেল মিয়ার দোকানের পাশেই আরেকটা রেস্তোরাঁ। সকালের নাস্তা ভাতের আয়োজন তখনো শেষ হয়নি। থরে থরে ভাত, ভর্তা আর সবজি সাজানো। তবে রেস্তোরাঁর ব্যবস্থাপক রিফাত খুবই আশাবাদী। তিনি বলছেন, 'দুপুরে আইলে দেখবেন। যে গরু পাকাইতাছি ঢাকা থিকা লোক আইব খাইতে।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত