ঢাকা সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৩ আশ্বিন ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

সুসংবাদ প্রতিদিন

চন্দনাইশে কাঞ্চন পেয়ারা ফলন ভালো হওয়ায় চাষিরা সন্তুষ্ট

চন্দনাইশে কাঞ্চন পেয়ারা ফলন ভালো হওয়ায় চাষিরা সন্তুষ্ট

চমৎকার ঘ্রাণ, মিষ্টি স্বাদ, আকর্ষণীয় সবুজ-হলুদ রং এবং দীর্ঘ সময় সতেজ থাকার ক্ষমতার জন্য কাঞ্চন পেয়ারা দেশজুড়ে সমাদৃত। চলতি মৌসুমে আবাহওয়া অনুকূলে থাকায় পেয়ারার ফলন ভালো হয়েছে। দাম ভালো থাকায় কৃষকরা ভেজায় খুশি। ব্রিটিশ আমল থেকে দক্ষিণ চট্টগ্রামের চন্দনাইশ ও পটিয়াতে প্রাথমিকভাবে কাঞ্চন পেয়ারার উৎপাদন শুরু হয়। পাহাড়ি জনপদজুড়ে এখন সবুজের রাজত্ব। যতদূর চোখ যায়, পাহাড়ের ঢালে সারি সারি পেয়ারা গাছ। গাছে গাছে ঝুলছে থোকায় থোকায় পেয়ারা। এখন চলছে কাঞ্চন পেয়ারার ভরা মৌসুম। পটিয়া-চন্দনাইশে প্রায় ৯০০ হেক্টর জমিতে ৫ হাজারের বেশি ছোট-বড় বাগান রয়েছে বলে কৃষি অফিস সূত্রে জানা যায়। এইসব বাগান থেকে বছরে প্রায় ১০ হাজার মেট্রিক টন পেয়ারা উৎপাদন হচ্ছে। চন্দনাইশ ও পটিয়াসহ আশপাশের বেশ কয়েকটি উপজেলা ও চট্টগ্রাম নগরীসহ সবখানে পাওয়া যাচ্ছে চন্দনাইশের কাঞ্চন পেয়ারা। কাঞ্চননগরের পেয়ারা আকারে ছোট হলেও এর স্বাদ, ঘ্রাণ ও মচমচে গঠন ক্রেতাদের কাছে বিশেষ জনপ্রিয়।

স্থানীয়ভাবে এই পেয়ারা কাঞ্চনপেয়ারা বা গোয়াছি বা গয়াম নামে পরিচিত। চন্দনাইশের ঐতিহ্যবাহী কাঞ্চনপেয়ারা মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশের বাজারে রপ্তানি হচ্ছে। সম্ভাবনার এই গল্পের আড়ালে রয়েছে চাষীদের দীর্ঘদিনের কয়েকটি সংকট। বন্যায় বাগানের ক্ষতি, সংরক্ষণের জন্য হিমাগারের অভাব, দ্রুত পচনশীল ফল হওয়ায় বাধ্য হয়ে কম দামে বিক্রি, মধ্যস্বত্বভোগীর দৌরাত্ম্য এবং আধুনিক বিপণন ব্যবস্থার ঘাটতি। ফলে বাম্পার ফলন হলেও কাঙ্ক্ষিত লাভের মুখ দেখার নিশ্চয়তা নেই চাষীদের। সম্প্রতি চন্দনাইশ সফরে এসে কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ দক্ষিণ চট্টগ্রামের উৎপাদিত কৃষিপণ্য সংরক্ষণ করার জন্য মিনি হিমাগার স্থাপন করার কথা বলেছেন। পেয়ারা চাষিরা বলছেন, পেয়ারা ফল সংরক্ষণাগার, আধুনিক প্যাকেজিং সেন্টার ও কোল্ড-চেইন ব্যবস্থা গড়ে তোলা গেলে মৌসুমের চাপ অনেকটাই কমে আসবে।

একই সঙ্গে স্থানীয় পর্যায়ে পাল্প, জুস, জেলি, আচার ও পেয়ারার বাম্পার ফলনেও হাসি নেই শুকনো পেয়ারা তৈরির ক্ষুদ্র শিল্প গড়ে উঠলে নষ্ট হওয়ার ঝুঁকিও কমবে। প্রতিদিন চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের বিজিসি ট্রাস্ট ইউনিভার্সিটি সংলগ্ন রওশনহাটে বসে কাঞ্চন পেয়ারার বিশাল বাজার। এছাড়া মহাসড়কের বাদামতল, বাগিচাহাট ও দোহাজারী সদরে বসে পেয়ারার বাজার। পেয়ারা উৎপাদনের সঙ্গে জড়িত চাষিরা প্রতিদিন গভীর রাতে ডর-ভয় উপেক্ষা করে পেয়ারা সংগ্রহ করতে চলে যান গহীন অরণ্যের পেয়ারা বাগানে। ভোরের আলো ফুটতেই পেয়ারা নিয়ে কাঁধে বহন করে কয়েক কিলোমিটার পায়ে হেঁটে চলে আসেন চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের পাশে। পাইকাররা সেখান থেকে পরিমাণ মতো পেয়ারা কিনে সরবরাহ করেন প্রত্যন্ত অঞ্চলে। কোনো ধরনের ক্ষতিকারক কীটনাশক প্রয়োগ ছাড়াই এখানকার পেয়ারা উৎপাদন হওয়ায় অর্গানিক পেয়ারা হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে এই পেয়ারা। উপজেলার পাহাড়ি অঞ্চল কাঞ্চননগর, হাশিমপুর, দোহাজারী, ধোপাছড়ি এখন পেয়ারা গ্রাম হিসেবে পরিচিত হয়ে উঠেছে। কাঞ্চননগরে সর্বাধিক পেয়ারা উৎপাদন হওয়ার কারণে এলাকার নামের সাথে মিল রেখে কাঞ্চন পেয়ারা নামকরণ হয়েছে। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ও কৃষিবিদ আজাদ হোসেন বলেছেন, চলতি মৌসুমে ৭৫৫ হেক্টর জমিতে ২ হাজার বাগানে পেয়ারা বাগান করেছেন বাগানিরা। প্রতি হেক্টর জমিতে ১৫ মেট্রিক টন হিসেবে ১১ হাজার ৩২৫ টন পেয়ারা উৎপাদনের লক্ষমাত্রা ধরা হয়েছে। প্রতি টন পেয়ারা ৮৫ হাজার টাকা হিসেবে ৯৬ কোটি টাকার অধিক মূল্যে পেয়ারা বিক্রি করতে পারবেন বাগানীরা। কাঞ্চন পেয়ারা জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি পেতে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে ২০২৪ সালের প্রথম দিকে ইউএনও অফিসের মাধ্যমে কাঞ্চন পেয়ারার বৈশিষ্ট তুলে ধরে জেলা অফিসে সকল প্রকার তথ্য প্রেরণ করেন। চন্দনাইশে পেয়ারা মজুত রাখার মত কোন ধরনের হিমাগার না থাকায় প্রতি মৌসুমে নষ্ট হয়ে যায় শত শত টন পেয়ারা। বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি এ এলাকায় গোয়াবা জেলির কারখানা করা যায়, তাহলে এ মূল্যবান কাঞ্চন পেয়ারা নষ্ট না হয়ে জেলি হিসেবে খেতে পারতেন সাধারণ মানুষ।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পেয়ারা বাগান করে কয়েক হাজার মানুষ তাদের ভাগ্যের চাকা ঘুরিয়ে নিয়েছেন। শত শত বেকার যুবক স্বাবলম্বী হয়ে পরিবারের হাল ধরেছেন। পাশাপাশি সংগ্রহ, পরিবহনে কয়েক হাজার শ্রমিকের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে। আবার অনেকেই পেয়ারা চাষে শূন্য থেকে পরিণত হয়েছে লাখপতিতে। এ অঞ্চলে উৎপাদিত পেয়ারা সংরক্ষণের জন্য কৃষি মন্ত্রণালয়ের আওতায় কৃষি বিপণন বিভাগ থেকে হিমাগার নির্মাণের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। তিনি আরো বলেন, চলতি মৌসুমে পেয়ারার ফলন ভালো হয়েছে। পেয়ারা চাষে প্রয়োজনীয় পরামর্শ প্রদান করা হচ্ছে চাষিদের। এখানকার উৎপাদিত পেয়ারা সাইজে বড়, দেখতে সুন্দর, খেতে সুস্বাদু এবং পুষ্টিগুণ সমৃদ্ধ হওয়ায় দেশব্যাপী কাঞ্চন পেয়ারার প্রচুর চাহিদা রয়েছে। সাইজ অনুযায়ী বর্তমানে খুচরা বাজারে প্রতি ডজন ছোট আকারের পেয়ারা ৫০-৭৫ টাকা আর বড় সাইজের প্রতি ডজন ১৫০-২০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। বিক্রির নির্দিষ্ট কোনো স্থান না থাকায় বাধ্য হয়ে পেয়ারা বিক্রেতারা চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের পাশে বসেই বিক্রি করেন। প্রতিদিন ভোর থেকে দুপুর পর্যন্ত চলে বেচাকেনা। আবার কাঞ্চননগর থেকে দোহাজারী পর্যন্ত শত শত কিশোর ও যুবক পেয়ারা নিয়ে মহাসড়কের পাশে দাঁড়িয়ে থেকে মহাসড়কে চলাচলরত বিলাসবহুল গাড়ির যাত্রীদের কাছে ডজন হিসেবেও খুচরা বিক্রি করে।

ধোপাছড়ি ইউনিয়নের চাপাছড়ি এলাকার পেয়ারা বাগান মালিক ইকবাল হোসেন জানান, এ অঞ্চলটি পাহাড়ি এলাকা হওয়ায় কোনো ধরনের যত্নআত্তি ছাড়াই এখানে পেয়ারার প্রচুর উৎপাদন হয়। এখানকার পেয়ারা সুস্বাদু ও পুষ্টিগুণ সমৃদ্ধ হওয়ায় সারা দেশে এর চাহিদা প্রচুর। আধুনিক প্রশিক্ষণ দিয়ে সুদমুক্ত ঋণদানের ব্যবস্থা করা হলে এ অঞ্চলে শুধুমাত্র পেয়ারা চাষ করেই দেশের অর্থনীতিতে বড় ভূমিকা রাখতে পারবেন। প্রতি মৌসুমে কোটি কোটি টাকার পেয়ারা উৎপাদন হওয়া সরকারি এসব পাহাড় চাষিরা যাতে স্থায়ী বন্দোবস্ত পায় সে দাবি জানিয়েছেন অনেকেই। পাশাপাশি মাঝেমধ্যে পাহাড়ি সন্ত্রাসী কর্তৃক এখানকার বাগান মালিক ও পেয়ারা শ্রমিকদের অপহরণের ঘটনা ঘটে। শারীরিক নির্যাতন ও বিপুল অংকের টাকা মুক্তিপণ দিতে হয় তাদের। চন্দনাইশের পাহাড়ি অঞ্চলে সন্ত্রাসীদের তৎপরতা কমাতে প্রশাসনের প্রতি জোর দাবি জানিয়েছেন পেয়ারা বাগান মালিক ও শ্রমিকরা।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত