ঢাকা বুধবার, ০৭ অক্টোবর ২০২৬, ২৩ আশ্বিন ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

কক্সবাজার-কুনমিং বিমান যোগাযোগ, পর্যটন ও অর্থনীতির নতুন সম্ভাবনা

বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকতের সঙ্গে চির বসন্তের দেশের সংযোগ

বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকতের সঙ্গে চির বসন্তের দেশের সংযোগ

একদিকে বঙ্গোপসাগরের নীল জলরাশি আর বিশ্বের দীর্ঘতম প্রাকৃতিক সমুদ্রসৈকত কক্সবাজার। অন্যদিকে পাহাড়ঘেরা মনোরম নগরী, ফুলের সৌন্দর্য আর সারা বছরের বসন্তময় আবহাওয়ার জন্য পরিচিত চীনের কুনমিং। প্রকৃতি ও পর্যটনের দুই অনন্য গন্তব্য এবার সরাসরি আকাশপথে যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। কক্সবাজার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে চীনের ইউনান প্রদেশের রাজধানী কুনমিংয়ে সরাসরি ফ্লাইট চালুর উদ্যোগ দুই দেশের পর্যটন, বাণিজ্য, অর্থনীতি ও সাংস্কৃতিক বিনিময়ে নতুন দ্বার খুলে দিতে পারে।

বাংলাদেশের প্রধান পর্যটনকেন্দ্র কক্সবাজারকে আন্তর্জাতিক পর্যটন গন্তব্য হিসেবে গড়ে তুলতে সরকার যে উদ্যোগ নিয়েছে, কুনমিং রুট তারই একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। একই সঙ্গে চীনের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল ও অভ্যন্তরীণ এলাকার বিপুলসংখ্যক পর্যটককে কক্সবাজারে আকৃষ্ট করার সুযোগ তৈরি হবে। অন্যদিকে বাংলাদেশের পর্যটকদের জন্যও কুনমিং হয়ে উঠতে পারে চীনের প্রকৃতি, সংস্কৃতি ও বৈচিত্র্য আবিষ্কারের সহজ প্রবেশদ্বার।

সমুদ্রসৈকত থেকে চির বসন্তের শহর : কক্সবাজারের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ তার দীর্ঘ সমুদ্রসৈকত। প্রায় ১২০ কিলোমিটার দীর্ঘ এ সৈকতকে ঘিরে গড়ে উঠেছে হোটেল, রিসোর্ট, রেস্তোরাঁ, পর্যটনসেবা ও বিনোদনের বিশাল পরিসর। পাহাড়, সমুদ্র, বন ও নদীর বৈচিত্র্য কক্সবাজারকে বাংলাদেশের অন্যতম আকর্ষণীয় পর্যটন গন্তব্যে পরিণত করেছে। অন্যদিকে কুনমিংকে বলা হয় 'চির বসন্তের শহর'। চীনের ইউনান প্রদেশের এ নগরীর আবহাওয়া বছরের অধিকাংশ সময়ই মনোরম। না খুব বেশি শীত, না তীব্র গরম— মৃদু আবহাওয়া, পাহাড়, হ্রদ ও ফুলের সমারোহ কুনমিংকে আলাদা বৈশিষ্ট্য দিয়েছে।

সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৬ হাজার ২০০ ফুট উচ্চতায় অবস্থিত কুনমিং প্রায় ২ হাজার ৪০০ বছরের পুরোনো একটি শহর। আধুনিক স্থাপত্যের সঙ্গে ঐতিহ্য, প্রকৃতি ও সংস্কৃতির মেলবন্ধন এখানে চোখে পড়ে। শহরের বিভিন্ন স্থানে সারা বছর নানা রঙের ফুল ফুটে থাকে। এ কারণে কুনমিংকে অনেকটা বিশাল ফুলের বাগানের মতো মনে হয়।

কুনমিংয়ের পাথুরে বন : কুনমিংয়ের অন্যতম আকর্ষণ 'স্টোন ফরেস্ট' বা পাথরের বন। শহর থেকে প্রায় ১২০ কিলোমিটার দক্ষিণে বিস্তৃত এ ভূদৃশ্য প্রকৃতির এক বিস্ময়কর সৃষ্টি। প্রায় ৩৫০ বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে অসংখ্য ছোট-বড় পাথর বিভিন্ন আকৃতিতে দাঁড়িয়ে আছে। দূর থেকে দেখলে কোনোটি বিশাল গাছ, কোনোটি জীবজন্তু, আবার কোনোটি মানুষের অবয়ব বলে মনে হয়। স্টোন ফরেস্টের সবচেয়ে পরিচিত আকর্ষণগুলোর একটি 'আশিমা'। নির্দিষ্ট একটি কোণ থেকে দেখলে পাথরটিকে মনে হয় মাথায় রুমাল বাঁধা ও পিঠে বাঁশের ঝুড়ি নেওয়া এক তরুণী দাঁড়িয়ে আছেন। স্থানীয় 'ই' জনগোষ্ঠীর লোককাহিনিতে আশিমাকে ঘিরে রয়েছে নানা গল্প ও কিংবদন্তি।

ডায়ানচি লেকে পাহাড়-জলের মেলবন্ধন : কুনমিংয়ের আরেক বড় আকর্ষণ ডায়ানচি লেক। শহরের দক্ষিণ-পশ্চিমে ওয়েস্টার্ন হিলের পাদদেশে অবস্থিত এ হ্রদ পাহাড় ও জলের অপূর্ব সমন্বয় তৈরি করেছে। প্রায় ৩০০ বর্গকিলোমিটার আয়তনের ডায়ানচি চীনের উল্লেখযোগ্য মিঠাপানির হ্রদগুলোর একটি। হ্রদটিকে ঘিরে রয়েছে ওয়েস্টার্ন হিল, ডাগুয়ান পার্ক, ইউনান জাতীয় জাদুঘর, গ্র্যান্ড ভিউ পার্ক, হুয়াটিং টেম্পল ও ড্রাগন গেটসহ বিভিন্ন দর্শনীয় স্থান। ক্যাবল কার কিংবা নৌকায় চড়ে পাহাড়, হ্রদ ও আশপাশের প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করা যায়।

কুনমিং শহরের কেন্দ্রস্থলের বার্ডস অ্যান্ড ফ্লাওয়ার মার্কেটও পর্যটকদের কাছে বেশ জনপ্রিয়। ক্যামেলিয়া, অর্কিড, লিলি, গোলাপ, টিউলিপসহ নানা ধরনের ফুলের পাশাপাশি মার্বেল ও পাথরের তৈরি নানা সামগ্রী পাওয়া যায় সেখানে।

কক্সবাজার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নতুন সম্ভাবনা : কক্সবাজারকে আন্তর্জাতিক পর্যটনের প্রবেশদ্বার হিসেবে গড়ে তুলতে বিমানবন্দরের অবকাঠামো উন্নয়নে বড় ধরনের বিনিয়োগ করেছে সরকার। নবনির্মিত আন্তর্জাতিক টার্মিনালে চেক-ইন কাউন্টার, ইমিগ্রেশন, লাগেজ বেল্ট, নিরাপত্তা তল্লাশি, লিফট, এসকেলেটর ও বোর্ডিং ব্রিজসহ আধুনিক সুবিধা রয়েছে। প্রায় ১৭ হাজার ৯৫৬ বর্গমিটার আয়তনের নতুন টার্মিনালটি প্রায় ৩৬২ কোটি ৬৩ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত হয়েছে। টার্মিনাল সম্প্রসারণের ফলে বিমানবন্দরের বার্ষিক যাত্রী পরিচালন সক্ষমতা প্রায় ৭ লাখ ৩০ হাজার থেকে বেড়ে ১৮ লাখে উন্নীত হওয়ার আশা করা হচ্ছে। এ ছাড়া বঙ্গোপসাগর থেকে প্রায় ৪৩ হেক্টর জমি পুনরুদ্ধার করে রানওয়ের দৈর্ঘ্য ৯ হাজার ফুট থেকে বাড়িয়ে ১০ হাজার ৭০০ ফুট করা হয়েছে। বর্ধিত রানওয়ে আন্তর্জাতিক ফ্লাইট ও বড় আকারের উড়োজাহাজ পরিচালনার উপযোগী করে তৈরি করা হয়েছে।

শুধু ফ্লাইট নয়, খুলবে নতুন অর্থনৈতিক দরজা : কক্সবাজার-কুনমিং সরাসরি বিমান যোগাযোগ চালু হলে এর প্রভাব শুধু পর্যটনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। দুই দেশের মানুষের সরাসরি যোগাযোগ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্কও আরও গতিশীল হতে পারে। চীনের ইউনান প্রদেশ বাংলাদেশের তুলনামূলকভাবে কাছের একটি অঞ্চল। সরাসরি আকাশপথ চালু হলে পর্যটনের পাশাপাশি ব্যবসায়ী, বিনিয়োগকারী, শিক্ষার্থী, গবেষক ও বিভিন্ন পেশার মানুষের যাতায়াত সহজ হবে। ফলে নতুন ব্যবসায়িক যোগাযোগ তৈরি, বিনিয়োগের সুযোগ বৃদ্ধি এবং পণ্য ও সেবাভিত্তিক বাণিজ্যের নতুন ক্ষেত্র তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে কক্সবাজারে পর্যটন অবকাঠামো, হোটেল-রিসোর্ট, পরিবহন, রেস্তোরাঁ, বিনোদন ও স্থানীয় পণ্যের বাজারে এর ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। বিদেশি পর্যটকের সংখ্যা বাড়লে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর আয় ও কর্মসংস্থানের সুযোগও বাড়বে।

সাংস্কৃতিক বিনিময়ের নতুন সেতু : আকাশপথের সরাসরি যোগাযোগ মূলত দুই শহরের মধ্যে দূরত্ব কমাবে না, কমাবে মানুষের দূরত্বও। বাংলাদেশের সমুদ্র, লোকজ সংস্কৃতি, খাবার, হস্তশিল্প ও ঐতিহ্য চীনা পর্যটকদের সামনে তুলে ধরার সুযোগ বাড়বে। একইভাবে কুনমিং ও ইউনানের বহুজাতিক সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, উৎসব, খাবার ও শিল্প বাংলাদেশের মানুষের কাছে আরও পরিচিত হয়ে উঠবে। শিক্ষা, গবেষণা, গণমাধ্যম, সাংস্কৃতিক সংগঠন এবং পর্যটন প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে যোগাযোগ বাড়লে দুই দেশের জনগণের পারস্পরিক বোঝাপড়া আরও গভীর হতে পারে।

কক্সবাজার থেকে আরও আন্তর্জাতিক রুট : কুনমিংয়ের পাশাপাশি কক্সবাজারকে আন্তর্জাতিক বিমান যোগাযোগের একটি আঞ্চলিক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। কক্সবাজার-পেনাং সরাসরি ফ্লাইট চালুর বিষয়ে মালয়েশিয়ার এয়ার এশিয়া আগ্রহের কথা জানিয়েছে। পাশাপাশি কক্সবাজার-কাঠমান্ডু-কক্সবাজার রুট চালুর পরিকল্পনাও রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন গন্তব্যের সঙ্গেও সরাসরি যোগাযোগের সম্ভাবনা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ফলে কক্সবাজার শুধু দেশের অভ্যন্তরীণ পর্যটকদের গন্তব্য না থেকে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যটনকেন্দ্রে পরিণত হওয়ার সুযোগ পাবে।

ট্যুর অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (টোয়াব) সাবেক সভাপতি মো. রাফেউজ্জামানের মতে, কক্সবাজারকে আন্তর্জাতিক বিমান চলাচলের প্রবেশদ্বার হিসেবে বাণিজ্যিকভাবে টেকসই করতে আন্তর্জাতিক এয়ারলাইন্সের কার্যক্রম, যৌক্তিক বিমানবন্দর ফি এবং পর্যটন গন্তব্যের উন্নয়ন গুরুত্বপূর্ণ।

দুই গন্তব্য, এক নতুন সম্ভাবনা : কক্সবাজারের আছে সমুদ্র; কুনমিংয়ের আছে পাহাড়, হ্রদ ও চির বসন্তের আবহাওয়া। একটি বঙ্গোপসাগরের তীরে দাঁড়িয়ে থাকা বাংলাদেশের পর্যটন-প্রতীক, অন্যটি চীনের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের প্রকৃতি ও সংস্কৃতির এক অনন্য জানালা। সরাসরি আকাশপথ এ দুই গন্তব্যকে যুক্ত করতে পারলে তা নিছক একটি বিমান রুটের সূচনা হবে না— বরং দুই দেশের পর্যটন ও অর্থনৈতিক সম্পর্কের নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে পারে।

বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত থেকে 'চির বসন্তের শহর'— কক্সবাজার-কুনমিং সরাসরি বিমান যোগাযোগ তাই পর্যটকদের জন্য নতুন ভ্রমণপথের পাশাপাশি বাংলাদেশ ও চীনের মানুষের মধ্যে যোগাযোগ, বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও সংস্কৃতিরও নতুন সেতু হয়ে উঠতে পারে। প্রয়োজন এখন পরিকল্পনাকে দ্রুত বাস্তবে রূপ দেওয়া এবং সম্ভাবনাকে টেকসই আন্তর্জাতিক পর্যটন-অর্থনীতিতে পরিণত করা।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত