
গুলশান-বারিধারার মতো একটি বিশেষায়িত এলাকার লেক ও এর পাড় যদি আমরা ঠিক করতে না পারি, তাহলে সারা দেশ কীভাবে ঠিক করব, এমন প্রশ্ন তুলেছেন গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রী জাকারিয়া তাহের। গুলশান, বনানী ও বারিধারার জলাধার রক্ষার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এসব এলাকার পরিবেশ ও লেকের অবস্থা নিয়ে সরকার কাজ করছে। গুলশান-বনানীর আবাসিক এলাকায় বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও পয়োনিষ্কাশন নিয়েও সমস্যা রয়েছে। হাতিরঝিল ও গুলশান-বারিধারার পরিবেশ উন্নয়ন নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে একাধিক বৈঠক হয়েছে। গতকাল বুধবার রাজধানীর বনানীর হোটেল শেরাটনে আয়োজিত 'স্মার্ট সিটি কনক্লেভ ২০২৬'-এ প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। মন্ত্রী বলেন, গুলশান, বনানী ও বারিধারায় প্রায় ৪ হাজার ৩০০টি বাড়িঘর রয়েছে। এর বড় একটি অংশে ভবন নির্মাণের সময় সেফটি ট্যাংক ও সোকওয়েলের মতো প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা রাখা হয়নি। এমনকি অনেক নামী-দামি ডেভেলপারও ভবনের পয়োনিষ্কাশনের ব্যবস্থা যথাযথভাবে করেনি।
সমস্যা সমাধানে সংশ্লিষ্ট আবাসিক সোসাইটিগুলোর সঙ্গে একাধিক বৈঠক করা হয়েছে জানিয়ে জাকারিয়া তাহের বলেন, গুলশান, বনানী ও বারিধারা সোসাইটির সঙ্গে তিন থেকে চার দফা আলোচনা হয়েছে। এসব এলাকার পরিবেশ ও জলাধার রক্ষায় সমন্বিতভাবে কাজ করার চেষ্টা চলছে। তিনি বলেন, উন্নত ও পরিকল্পিত নগর গড়ার লক্ষ্য শুধু নির্দিষ্ট কয়েকটি এলাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে হবে না। একটি গুরুত্বপূর্ণ এলাকার মৌলিক সমস্যা সমাধান করতে না পারলে বৃহত্তর পরিসরে পরিকল্পিত নগরায়ণ নিশ্চিত করাও কঠিন।
গণপূর্ত মন্ত্রী বলেন, দেশের নগর পরিকল্পনাকে আরও কার্যকর করতে আরবান ডেভেলপমেন্ট ডিরেক্টরেটকে (ইউডিডি) শক্তিশালী করা হচ্ছে। প্রথমবারের মতো দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার আওতায় ধাপে ধাপে মেট্রোপলিটন, বড় শহর এবং উপজেলাপর্যায় পর্যন্ত পুরো দেশের জন্য মাস্টার প্ল্যান করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
পরিকল্পনায় কোথায় কী ধরনের উন্নয়ন হবে, কোন এলাকা কী কাজে ব্যবহৃত হবে- এসব নির্ধারণ করে জোনিং করা হবে জানিয়ে তিনি বলেন, মাস্টারপ্ল্যান ছাড়া উন্নয়ন অনেকটা লক্ষ্য ঠিক না করে তীর ছোড়ার মতো। সরকার নির্দিষ্ট লক্ষ্য ও তথ্যের ভিত্তিতে পরিকল্পনা করতে চায়।
পরিকল্পনার জন্য নির্ভরযোগ্য তথ্যের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরে জাকারিয়া তাহের বলেন, সবশেষ শুমারি অনেক আগের। সঠিক পরিকল্পনার স্বার্থে নতুন করে একটি পূর্ণাঙ্গ শুমারি করা প্রয়োজন। পর্যাপ্ত তথ্য হাতে থাকলে নগর পরিকল্পনা আরও বাস্তবভিত্তিক করা সম্ভব হবে।
ভবন নির্মাণে অনুমোদন ব্যবস্থার পরিবর্তনের কথাও তুলে ধরেন মন্ত্রী। তিনি বলেন, আগে শুধু স্থাপত্য নকশার ভিত্তিতে ভবনের পরিকল্পনা অনুমোদনের সুযোগ ছিল। এখন স্থাপত্যের পাশাপাশি কাঠামোগত ও বৈদ্যুতিক নকশাসহ প্রয়োজনীয় বিষয়গুলো সমন্বিতভাবে অনুমোদনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। অনুমোদনের পর ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলী ও নকশা প্রণয়নকারীদের দায়িত্বও নিশ্চিত করা হবে জানিয়ে তিনি বলেন, ভবনটি অনুমোদিত নকশা অনুযায়ী যথাযথভাবে নির্মিত হয়েছে কি না, তা প্রত্যয়ন করতে হবে। এরপরই অকুপেন্সি সার্টিফিকেট দেওয়ার ব্যবস্থা করা হবে।
ঢাকার পরিকল্পনাহীন নির্মাণের চিত্র তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, রাজউকের আওতাধীন এলাকার বাইরে এখনও অনেক ভবন পর্যাপ্ত পরিকল্পনা ও অনুমোদন ছাড়াই নির্মিত হয়েছে। এসব ভবন ও এলাকার তথ্য শনাক্ত করার কাজ চলছে।
কনক্লেভে সম্মানিত অতিথি ছিলেন রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার মো. রিয়াজুল ইসলাম। এ কনক্লেভটি তিনটি সেশনে অনুষ্ঠিত হয়। 'জ্বালানি রূপান্তর: এলপিজি ও সোলার' বিষয়ে আলোচনায় অংশ নেন ইস্ট কোস্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান আজম জে চৌধুরী।
'নির্মাণে দেশীয় সক্ষমতা' বিষয়ক সেশনে আলোচনায় অংশ নেন বাংলাদেশ স্টিল ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএসএমএ) সভাপতি এবং ক্রাউন সিমেন্ট ও জিপিএইচ গ্রুপের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম এবং গ্লাস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (জিএমইএবি) সভাপতি ও নাসির সিনট্যাক্স গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নাসিম বিশ্বাস।
'স্মার্ট-সবুজ আবাসন ও অর্থায়ন' বিষয়ে আলোচনায় অংশ নেন স্পেসজিরো লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ ফয়েজ উল্লাহ, ডিবিএইচ ফাইন্যান্স পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা নাসিমুল বাতেন এবং এবিসি রিয়েল এস্টেট লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শ্রাবণী দত্ত।
এছাড়া 'প্রাথমিক আলোচনা ও বৃহত্তর দৃষ্টিভঙ্গি: আবাসন, নির্মাণ ও টেকসই নগরায়ণ' বিষয়ে আলোচনা করেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ড. ইশতিয়াক আহমেদ ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান।