ঢাকা বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৬, ১৪ কার্তিক ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

ইনানীতে নিয়ন্ত্রণহীন গ্যাসের আগুন ঘিরে আতঙ্ক

বিদ্যুৎহীন ৩ হাজার ৮০০ পরিবার
ইনানীতে নিয়ন্ত্রণহীন গ্যাসের আগুন ঘিরে আতঙ্ক

কক্সবাজারের উখিয়ার ইনানীতে গভীর নলকূপ খননের স্থান থেকে বের হওয়া গ্যাসে আগুন লাগার ৪০ ঘণ্টার বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও তা নেভেনি। বরং আগুনের তীব্রতা আরও বেড়েছে। দুর্ঘটনার ঝুঁকি এড়াতে ইনানী থেকে মনখালী হয়ে পাটুয়ারটেক পর্যন্ত প্রায় ১৫ কিলোমিটার এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রাখা হয়েছে। এতে ভোগান্তিতে পড়েছেন প্রায় ৩ হাজার ৮০০ পরিবারের সদস্যরা। গত মঙ্গলবার সকাল ৭টা ২০ মিনিটে আগুনের সূত্রপাত হয়। বুধবার পর্যন্ত আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়নি। গ্যাসের উৎস ও প্রকৃতি শনাক্ত করতে কাজ করছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানি লিমিটেড (বাপেক্স)। নিরাপত্তার স্বার্থে ঘটনাস্থলের ২০০ মিটারের মধ্যে জনসমাগম সীমিত করার উদ্যোগ নিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন।

বাপেক্সের বিশেষজ্ঞদের প্রাথমিক ধারণা, ভূগর্ভের উচ্চচাপের গ্যাস কোনো ফাটল বা দুর্বল স্তর দিয়ে ভূপৃষ্ঠে উঠে আসছে। গ্যাসে উচ্চতর হাইড্রোকার্বন থাকতে পারে। তবে পরীক্ষাগারে নমুনা বিশ্লেষণের পর গ্যাসের প্রকৃত উপাদান সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যাবে। গ্যাসের প্রবাহ জোর করে বন্ধ করার চেষ্টা করলে অন্য স্থান দিয়ে গ্যাস বেরিয়ে পরিস্থিতি আরও বিপজ্জনক হতে পারে। বিশেষজ্ঞদের প্রাথমিক ধারণা, আগুন আরও সাত দিন জ্বলতে পারে।

যেভাবে আগুনের সূত্রপাত : উখিয়ার জালিয়াপালং ইউনিয়নের ছোট ইনানীতে ছোট ব্রিজসংলগ্ন মো. আবদুল্লাহর বাড়ির আঙিনায় গভীর নলকূপ স্থাপনের জন্য খননকাজ শুরু হয়। জমির মালিক মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ জানান, প্রায় ১৫ দিন আগে খননকাজ শুরু হয়। এক সপ্তাহ খনন করেও পানি না পাওয়ায় শ্রমিকেরা কাজ বন্ধ করে চলে যান। পরে খনন করা স্থান থেকে গ্যাস বের হতে শুরু করে। একপর্যায়ে পাশের বৈদ্যুতিক তার থেকে আগুনের সূত্রপাত হয় বলে তিনি জানান। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের চারটি ইউনিট ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে। পানি ও বালি ছিটিয়েও আগুন নেভানো সম্ভব হয়নি। ভূগর্ভ থেকে অব্যাহতভাবে গ্যাস বের হওয়ায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা কঠিন হয়ে পড়েছে।

উখিয়া ফায়ার সার্ভিস স্টেশনের স্টেশন কর্মকর্তা সাইদুল ইসলাম বলেন, পাইপলাইনের গ্যাস হলে ভালভ বন্ধ করে নির্গমন নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হতো। কিন্তু এখানে ভূগর্ভ থেকে উচ্চচাপে গ্যাস বের হওয়ায় স্বাভাবিক পদ্ধতিতে আগুন নেভানো যাচ্ছে না। গ্যাসের নমুনা সংগ্রহ করছে বাপেক্স : আগুনের উৎস ও গ্যাসের প্রকৃতি শনাক্ত করতে বাপেক্সের বিশেষজ্ঞ দল মঙ্গলবার ও বুধবার ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে। তারা গ্যাসের নমুনা সংগ্রহ করেছে, এখন পরীক্ষাগারে বিশ্লেষণের প্রস্তুতি নিচ্ছে।

বাপেক্সের ব্যবস্থাপক ও ভূতাত্ত্বিক জরিপ দলের প্রধান এস এম নাফিকুন আরহাম বলেন, আগুনের শিখা ও ধোঁয়ার ধরন দেখে গ্যাসে উচ্চতর হাইড্রোকার্বনের উপস্থিতি থাকতে পারে বলে প্রাথমিকভাবে মনে হচ্ছে। তবে গ্যাসের প্রকৃত উপাদান জানতে পরীক্ষাগারে বিশ্লেষণ প্রয়োজন। তিনি বলেন, নলকূপ খননের সময় গ্যাসের স্তরের কাছাকাছি পৌঁছানোর পর উচ্চচাপের গ্যাস বিভিন্ন ফাটল বা দুর্বল স্তর দিয়ে ভূপৃষ্ঠে উঠে আসতে পারে। পরে অগ্নিস্ফুলিঙ্গের সংস্পর্শে এসে আগুন ধরে যায় বলে ধারণা করা হচ্ছে। এস এম নাফিকুন আরহাম আরও বলেন, গ্যাসের চাপ বেশি থাকায় জোর করে প্রবাহ বন্ধ করতে গেলে অন্য ফাটল দিয়ে গ্যাস বেরিয়ে নতুন ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। গ্যাসের চাপ ও নির্গমনের মাত্রা বিশ্লেষণ না করে আগুন কত দিন জ্বলবে, তা নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়। মাটি বা বালু দিয়ে গ্যাস নির্গমনের মুখ বন্ধ করলেও অন্য স্থান দিয়ে গ্যাস বের হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

বাপেক্সের অনুসন্ধান বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জেবুন নাহার বলেন, প্রতিনিধিদল গত মঙ্গলবার থেকে ঘটনাস্থলে কাজ করছে। নমুনা ঢাকায় নিয়ে বাপেক্সের পরীক্ষাগারে বিশ্লেষণ করা হবে। এক-দুই দিনের মধ্যে পরীক্ষার কাজ শেষ করার পরিকল্পনা রয়েছে। তিনি বলেন, সাধারণত মাটির অগভীর স্তরে বায়োজেনিক গ্যাসের ছোট ছোট পকেট থাকে। বাপেক্স সাধারণত ২ হাজার ৫০০ থেকে ৩ হাজার ৫০০ মিটার গভীরতার স্তর থেকে গ্যাস উত্তোলন করে। কিন্তু ইনানীতে প্রায় ৮০০ ফুট গভীরতার স্তর থেকে গ্যাস বের হচ্ছে। সেখানে জোনভিত্তিক ভূতাত্ত্বিক জরিপ হলেও গভীর অনুসন্ধান হয়নি। ২০০ মিটার এলাকা খালি করার উদ্যোগ : উখিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) পান্না আক্তার বলেন, আগুন নিয়ন্ত্রণ ও স্থানীয় বাসিন্দাদের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই প্রশাসনের প্রধান অগ্রাধিকার। ৩৩ কেভি বিদ্যুৎ লাইনের নিচে আগুন জ্বলতে থাকায় নিরাপত্তার স্বার্থে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রাখা হয়েছে। ঘটনাস্থলের ২০০ মিটারের মধ্যে জনসমাগম না করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, এলাকায় প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুত আছে কি না, তা যাচাই করতে বাপেক্সের বিশেষজ্ঞ দলকে ডাকা হয়েছে। বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা ছাড়া এ বিষয়ে নিশ্চিত করে কিছু বলা সম্ভব নয়। বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী ২০০ মিটার এলাকা খালি করা জরুরি হয়ে পড়েছে। বিষয়টি জেলা প্রশাসককে জানানো হয়েছে। ঘটনাস্থলে ফায়ার সার্ভিসের একাধিক ইউনিটের পাশাপাশি বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, পুলিশ ও উপজেলা প্রশাসনের প্রতিনিধিরা কাজ করছেন। আগুনের তীব্রতা বাড়ায় আশপাশের বসতবাড়ির বাসিন্দাদের নিরাপদ দূরত্বে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। বিকল্প লাইনে বিদ্যুৎ সরবরাহের উদ্যোগ : কক্সবাজার পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির উখিয়া জোনাল অফিসের উপমহাব্যবস্থাপক প্রকৌশলী কাইজার নূর বলেন, আগুনের কারণে ৩৩ কেভি মূল বিদ্যুৎ লাইনে সমস্যা দেখা দিয়েছে। নিরাপত্তার স্বার্থে মনখালী থেকে পাটুয়ারটেক পর্যন্ত প্রায় ১৫ কিলোমিটার এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রাখা হয়েছে।

তিনি জানান, বাপেক্সের পরামর্শ অনুযায়ী বিকল্প পথে প্রায় ৩০০ মিটার নতুন বিদ্যুৎ লাইন নির্মাণের কাজ চলছে। বুধবার সকাল থেকে শুরু হওয়া এ কাজ দ্রুত শেষ করে বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক করার আশা করা হচ্ছে। এতে প্রায় চার হাজার গ্রাহক বিদ্যুৎ সুবিধা পাবেন।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত