
৭ নভেম্বরের চেতনা ধারণ করে দেশে গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার ও জনগণের প্রকৃত অধিকার প্রতিষ্ঠায় সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, জনগণের মনের ভাষা বুঝে দেশ পরিচালনা করতে হবে। যারা জনগণের প্রত্যাশা ও অধিকার উপেক্ষা করবেন, ইতিহাস তাদের কাউকে ক্ষমা করবে না। গতকাল শুক্রবার জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস উপলক্ষে জামায়াতে ইসলামী ঢাকা মহানগরী উত্তর আয়োজিত আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। জামায়াতের প্রচার বিভাগের সিনিয়র প্রচার-সহকারী মুজিবুল আলম এ তথ্য জানান।
শফিকুর রহমান বলেন, ৭ নভেম্বরের চেতনা হচ্ছে অন্যায়-অবিচার, একনায়কতন্ত্র ও স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার চেতনা। অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে দেশে গণতন্ত্র ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে হবে। ১৯৭২ সালের পর দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি তুলে ধরে তিনি বলেন, তৎকালীন সরকার ইসলামী সংগঠন নিষিদ্ধ, বিরোধী মত দমন এবং সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা সংকুচিত করেছিল। রক্ষীবাহিনী গঠন করে তাদের ব্যাপক ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল। এ বাহিনীর হাতে ৩৪ হাজার মানুষ নিহত হন বলে তিনি অভিযোগ করেন। নিহতদের মধ্যে অন্তত ১০ হাজার মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন বলেও দাবি করেন জামায়াতের আমির। তিনি বলেন, দেশে হত্যা, নির্যাতন, লুটপাট ও মানুষের সম্মানহানির বিচার ছিল না। দুর্নীতি ও লুটপাটের পাশাপাশি মানুষের মৌলিক অধিকার হরণ করা হয়েছিল। বহুদলীয় নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় এসে একপর্যায়ে একদলীয় বাকশাল ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা হয়। ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি একদলীয় শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে গণতন্ত্রের কবর রচনা করা হয়েছিল। ৭ নভেম্বরের ঘটনাপ্রবাহের বর্ণনা দিয়ে শফিকুর রহমান বলেন, ১৫ আগস্টের পর থেকে ৩ নভেম্বর পর্যন্ত দেশে একের পর এক ক্ষমতার পালাবদল ও অস্থিরতা চলতে থাকে। ৩ নভেম্বরের পাল্টা অভ্যুত্থানের পর জিয়াউর রহমান বন্দি হন। ৭ নভেম্বর ভোরে সিপাহিরা সংগঠিত হয়ে তাকে মুক্ত করেন। সিপাহিরা ট্যাংক নিয়ে রাস্তায় নামলে সাধারণ মানুষ তাদের স্বাগত জানায়। সিপাহিরা বিপ্লব সংঘটিত করেছিলেন, আর জনগণ তাতে সংহতি প্রকাশ করেছিল। এ কারণেই দিনটি জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে।
তিনি বলেন, স্বাধীনতার ইতিহাস নিয়ে কৃতিত্বের লড়াই না করে যার যেখানে অবদান, তাকে সেখানে স্বীকৃতি দিতে হবে। মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব ও অবদান কোনো ব্যক্তি বা দলের একক সম্পত্তি হতে পারে না। ১৯৯০ সালের গণ-আন্দোলনের প্রসঙ্গ টেনে জামায়াতের আমির বলেন, জনগণ দুঃশাসন, দুর্নীতি ও অদক্ষতার বিরুদ্ধে বারবার রুখে দাঁড়িয়েছে। এরশাদও মানুষের বাকস্বাধীনতা ও ভোটের অধিকার হরণ করে দীর্ঘদিন শাসন করেছেন। শেষ পর্যন্ত জনগণের আন্দোলনের মুখে তাকে ক্ষমতা ছাড়তে হয়েছে।
১৯৯১ সালের রাজনৈতিক পরিস্থিতি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, দেশের স্বার্থে জামায়াতে ইসলামী দলীয় স্বার্থকে প্রাধান্য না দিয়ে সরকার গঠনে সহযোগিতা করেছিল। তবে সরকারে অংশীদার হয়নি কিংবা ক্ষমতাসীন দলের সঙ্গে রাজনৈতিক জোটেও যায়নি। সে সময় নির্বাচনে জনগণের ভোটের মূল্যায়ন নিশ্চিত করতে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। পরে এ দাবিতে আন্দোলন করতে হয়েছে। রাজনীতিতে সমঝোতা ও নমনীয়তা থাকা জরুরি, তা না হলে রাজনীতি জনগণের কল্যাণের পরিবর্তে সংঘাতের দিকে চলে যায়। বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে শফিকুর রহমান বলেন, নির্বাচনের আগে জনগণকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী গণভোটের রায় মেনে নেওয়া উচিত। কিন্তু এখন সেই রায় মানা হচ্ছে না। অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে ২০টি বাতিল করা হয়েছে। তার অভিযোগ এসব অধ্যাদেশ বহাল থাকলে ফ্যাসিবাদ ফিরে আসার পথ রুদ্ধ করা সম্ভব হতো।
তিনি আরও বলেন, বর্তমান সরকার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে দলীয় লোকজনকে বসিয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়, জেলা পরিষদ, সিটি করপোরেশনসহ গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে দলীয় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চলছে। দুর্নীতি দমন কমিশনের মতো প্রতিষ্ঠানে নিরপেক্ষ ও যোগ্য ব্যক্তিদের পরিবর্তে বিতর্কিত ব্যক্তিদের দায়িত্ব দিয়ে দুর্নীতি দমন সম্ভব নয়। সরকারি নিয়োগের ক্ষেত্রে দলীয়করণের অভিযোগ তুলে জামায়াতের আমির বলেন, শিক্ষার্থীরা মেধার ভিত্তিতে চাকরি ও ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবিতে আন্দোলন করেছিল। কিন্তু এখন সরকারি কর্ম কমিশনের চেয়ারম্যানকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে এবং আরও সদস্যকে চাপের মুখে বিদায় করার অভিযোগ উঠেছে। দলীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে নিয়োগ ও সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার মনোভাব জাতির যুবসমাজের প্রতি অবিচার। বিরোধীদলের ভূমিকা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সংসদকে কার্যকর ও অর্থবহ করতে চায় জামায়াতে ইসলামী। ন্যায়সংগত বিষয়ে সহযোগিতা করা হবে, অন্যায় হলে প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ করা হবে। কিন্তু সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে ন্যায়-অন্যায় বিবেচনা না করে একের পর এক সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে।
র্যাব বিলুপ্তির দাবি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, নির্বাচনের আগে ক্ষমতাসীনরা এ বাহিনী বিলুপ্ত করার প্রতিশ্রুতি দিলেও পরে নাম পরিবর্তন করে নতুন কাঠামো গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আগের বাহিনীর লোকবল ও কাঠামো বহাল রেখে শুধু নাম পরিবর্তন করলে সমস্যার সমাধান হবে না। প্রয়োজনে আলোচনা করে নতুন বাহিনী গঠন এবং বর্তমান সদস্যদের নিজ নিজ বাহিনীতে ফিরিয়ে দেওয়ার প্রস্তাব দেন তিনি। শফিকুর রহমান বলেন, জনগণ গণভোটে সংবিধান সংস্কারের পক্ষে রায় দিয়েছে। সেই সংস্কারের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন না করে সংবিধান সংশোধনের নামে ভিন্ন পথে যাওয়ার চেষ্টা গ্রহণযোগ্য নয়। জনগণের সঙ্গে দেওয়া অঙ্গীকার রক্ষা করতে হবে। জুলাই সনদ ও গণভোটের রায় বাস্তবায়ন করতে হবে।
তিনি বলেন, বিরোধীদল হিসেবে জনগণের প্রতি দায়িত্ব পালনের অংশ হিসেবেই তারা সাত দফা দাবি নিয়ে মাঠে নেমেছেন। এসব দাবি কোনো দলের একক দাবি নয়, জনগণের দাবি। ফ্যাসিবাদ কোনো নির্দিষ্ট দলের নাম নয় এটি একটি মানসিকতা। যে কেউ ক্ষমতায় গিয়ে এ মানসিকতায় আক্রান্ত হতে পারে। সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে ফ্যাসিবাদের লক্ষণ দেখা গেলে তার বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হবে।
২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান প্রসঙ্গে জামায়াতের আমির বলেন, এ আন্দোলনকে অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কেউ বলছেন, আন্দোলনের সঙ্গে তাদের কোনো সম্পর্ক ছিল না; আবার কেউ দাবি করছেন তাদের নেতা আন্দোলনের মাস্টারমাইন্ড। এ ধরনের পরস্পরবিরোধী বক্তব্য দিয়ে জাতির সঙ্গে উপহাস করা হচ্ছে। জামায়াতে ইসলামী ওই আন্দোলনের কৃতিত্ব দাবি করেনি। বরং আন্দোলনে শহীদদের পরিবার এবং আহত ও পঙ্গুদের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেছে। এ ক্ষেত্রে কোনো দলীয় পরিচয় বিবেচনা করা হয়নি।
সরকারকে ভুল পথ থেকে ফিরে আসার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে কথা বললে মাতারবাড়ীসহ জাতীয় স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে সরকারের ভূমিকা ও দৃষ্টিভঙ্গি পরিষ্কার করতে হবে। দেশের স্বার্থবিরোধী কোনো চুক্তি বা সিদ্ধান্ত জনগণ মেনে নেবে না। আধিপত্যবাদের কালো ছায়ামুক্ত স্বাধীন জাতি গঠন, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং চাঁদাবাজি ও দুর্নীতি নির্মূলে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। ঢাকা মহানগরী উত্তরের আমির মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিনের সভাপতিত্বে কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরা সদস্য ও মহানগরীর সহকারী সেক্রেটারি নাজিম উদ্দীন মোল্লার সঞ্চালনায় সভায় আরও বক্তব্য দেন জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব জুবায়ের, মহানগরী উত্তরের নায়েবে আমির আব্দুর রহমান মূসা, গোলাম মোস্তফা, সহকারী সেক্রেটারি মাহফুজুর রহমান, ফখরুদ্দিন মানিক ও ইয়াসিন আরাফাত।