ঢাকা শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৬, ১৬ কার্তিক ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

রাজশাহীর কবুতরের হাটগুলোতে 'মিলিয়ন' লেনদেন

রাজশাহীর কবুতরের হাটগুলোতে 'মিলিয়ন' লেনদেন

গিরিবাজ কবুতর। এর ওড়ার গতি অনন্য। দূর আকাশে উড়তে উড়তে ডিগবাজি দেওয়ার দক্ষতা এদের প্রখর। তাই এ জাতের প্রতি কবুতরপ্রেমীদের আগ্রহও বেশ। দেখতে চমৎকার ও দামেও বেশি হওয়ায় 'রাজশাহীর গিরিবাজ'র চাহিদা ব্যাপক। জেলার ৯টি উপজেলায় সপ্তাহে প্রতিদিনই হাট থাকে। হাটগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় হাট কাটাখালী ও কাকনহাট। শুধু কাটাখালী ও কাকনে হাটবারে সাড়ে ৯ থেকে ১০ লাখ টাকার কবুতর কেনাবেচা হয়। অন্যসব হাটের হিসেবে আরও বেশি।

হাট সংশ্লিষ্টরা বলছেন, হাটে কবুতর কেনা-বেচায় খাজনা হিসেবে ১০ টাকা করে দিতে হয়। সেটা যেই ধরনের কবুতর হোক। হাটে জেলার বিভিন্ন উপজেলা থেকে ব্যবসায়ীরা আসে। আসে কবুতরপ্রেমী ক্রেতা-বিক্রেতারাও। কাটাখালীতে সপ্তায় শুক্রবার ও সোমবার হাট বসে। আর কাকনহাট বসে সপ্তাহে বৃহস্পতিবার। এইসব হাটে দেশি জাতের কবুতর, লাহোরি সিরাজি, লাক্ষ্ণা, সাটিং, জালালি, লোটন ও বোম্বাই গোবিদ কবুতর কেনা-বেচা হয়।

রাজশাহীর পবা উপজেলার কাটাখালীতে প্রতি সপ্তাহে বসে কবুতরের বড় হাট। শুধু রাজশাহী নয়, আশপাশের বিভিন্ন জেলা থেকেও ক্রেতা-বিক্রেতারা আসেন এ হাটে। খাঁচায় খাঁচায় নানা জাতের কবুতর নিয়ে হাজির হন বিক্রেতারা। পছন্দের কবুতর কিনতে দরদাম করেন ক্রেতারা। সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত বেচাকেনার হাঁকডাকে জমজমাট থাকে পুরোহাট। হাট সংশ্লিষ্টদের হিসাবে, প্রতি শুক্রবার এখানে আনুমানিক সাড়ে ছয় থেকে সাত লাখ টাকার কবুতর কেনাবেচা হয়। সপ্তাহে শুক্র ও সোমবার-দুই দিন বসে এ হাট। তবে সবচেয়ে বেশি জমে শুক্রবারের হাট।

এদিন সকাল ৯টা থেকে শুরু হয়ে দুপুর পর্যন্ত চলে কেনাবেচা। হাটে ৩৫ থেকে ৪০ জন স্থায়ী বিক্রেতা রয়েছেন। তাদের পাশাপাশি আশপাশের এলাকার কবুতর পালনকারীরাও নিজেদের পালন করা কবুতর নিয়ে আসেন বিক্রির জন্য। ফলে স্থায়ী ব্যবসায়ীদের বাইরেও অনেকের জন্য কবুতর বিক্রির সুযোগ তৈরি হয়েছে।

কাটাখালী ছাড়াও সপ্তাহে বুধবার ছাড়া প্রতিদিন হাটে কবুতর কেনাবেচা করেন- আকতাররুল ইসলাম। জেলার চারঘাট উপজেলার হলিদাগাছির তালতলার বাসিন্দা তিনি। দীর্ঘ ৯ বছর ধরে হাটে হাটে কবুতর কেনাচেবা করা তার কাজ। আকতাররুল ইসলাম বলেন, 'শুক্রবার হাটে ১০ হাজার টাকার কেনাবেচা হয়। তবে সোমবার সেই তুলনায় কম। আমরা হাটে কবুতর কিনে, হাটেই বিক্রি করি। তার কাছে দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ আসে কবুরত কিনতে। কাটাখালীহাটে কমপক্ষে ৪০ জন কবুতর ব্যবসায়ী রয়েছেন। যারা প্রতিহাটে কবুতর বিক্রি করেন। এছাড়া অনেকেই বাড়ির কবুতর নিয়ে এসে বিক্রি করেন। সবারই মোটামোটি কেনা-বেচা হয়।'

আকাশজুড়ে ওড়ার দক্ষতা রাজশাহী গিরিবাজের : রাজশাহী অঞ্চলের গিরিবাজ কবুতরের বেশ চাহিদা রয়েছে। কাটাখালীর হাটে নানা জাতের কবুতরের মধ্যে বিশেষ আকর্ষণ রাজশাহীর গিরিবাজ। অনেক উঁচুতে ওড়ার জন্য পরিচিত গিরিবাজ কবুতরের মধ্যে স্থানীয়ভাবে রাজশাহী গিরিবাজের বেশ নামডাক রয়েছে। বিশেষ বৈশিষ্ট্যের কারণে এ জাতের প্রতি কবুতরপ্রেমীদের আগ্রহও বেশি।

স্থানীয় কবুতর পালনকারী সঞ্জয়, হৃদয় ও অবিনাশ জানান, রাজশাহীর গিরিবাজের ওড়ার গতি অনন্য। অনেক উঁচুতে উঠে দূর আকাশে ডিগবাজি দেওয়ার দক্ষতা রয়েছে এদের। আকাশে দীর্ঘ সময় উড়ে নানা কৌশল দেখাতে পারে বলে শৌখিন কবুতর পালনকারীদের কাছে এ জাতের আলাদা কদর রয়েছে। তবে ডিম বাচ্চার জন্য গোলা কবুতর সেরা। তারা বলেন, গিরিবাজের শুধু সৌন্দর্য নয়, উড়ার দক্ষতাও কবুতরের প্রতি ক্রেতাদের আকর্ষণের অন্যতম কারণ। তাই হাটে আসা অনেক কবুতরপ্রেমী রাজশাহী গিরিবাজ খোঁজেন। স্থানীয় এই জাতের পরিচিতি কাটাখালীর হাটের আকর্ষণও বাড়িয়েছে।

এক হাটে নানা জাতের কবুতর : রাজশাহীর গিরিবাজ ছাড়াও কাটাখালীর হাটে বিভিন্ন জাতের কবুতর কেনাবেচা হয়। এরমধ্যে রয়েছে দেশি জাতের কবুতর, লাহোরি সিরাজি, লাক্ষ্ণা, সাটিং, জালালি, লোটন ও রেসার, বোম্বাই গোবিদ। কিছু কিছু সময় পাকিস্তানি বিভিন্ন জাতের কবুতরও হাটে পাওয়া যায়। তবে জাত ও বৈশিষ্ট্যভেদে কবুতরের প্রতি ক্রেতাদের আগ্রহ আলাদা। কেউ শখের বশে কবুতর পালন করেন, কেউ আবার বিভিন্ন জাতের কবুতর সংগ্রহ করেন। আবার অনেকেই কবুতর পালনকে ছোটখাটো ব্যবসা হিসেবে নিয়েছেন। ফলে হাটে ক্রেতাদের চাহিদা অনুযায়ী বিভিন্ন জাতের কবুতর নিয়ে আসেন বিক্রেতারা।

এই হাটগুলোতে অল্প সময়ের জন্য হলেও কেনাবেচায় থাকে মুখোর। ব্যবসায়ীরা এক হাট থেকে অন্য হাটে নিয়ে গিয়ে কবুতর বিক্রি করেন। যেমন কাকনহাটে সবচেয়ে বেশি দেশি ও গোবিন গোলা পাওয়া যায়। সে জাতের কবুতরগুলোকে বেশি খাবার দিতে হয় না। তারা মাঠ-ঘাট চরেই খায়। এছাড়া এই জাতের কবুতর ডিমও বেশি বাচ্চা দেয়। তাই এর করদ রয়েছে। অন্যদিকে, সৌখিনদের অন্যতম পছন্দ গিরিবাজ। তিন ঘণ্টা আকাশে উড়বে এবং নামা ও উঠার সময় ডিগবাজি দেবে এমন কবুতর কিনতে কাটাখালী হাটে এসেছেন অবিনাশ। তার বাড়িতে ৬০টির বেশি বিভিন্ন জাতের কবুতর রয়েছে। তার মধ্যে সবচেয়ে বেশি গিরিবাজ। তিনি বলেন, যে কবুতর যেত বেশি আকাশে উড়বে, তার দাম ততো বেশি। কারণ হিসেবে তিনি বলেন, কবুতর রেস হয়। সেখানে প্রাইসমানিও থাকে। অনেকেই আবার খেল বা ডিগবাজি দেওয়া কবুতর পছন্দ করে। আকাশে নামা ও উঠার সময় ডিগবাজি দেওয়া কবুতরের দাম বেশি।

তিনি বলেন, এসব কবুতর ৪০০ থেকে ৮০০ টাকা, কোনো কোনো ক্ষেত্রে হাজার টাকাও ছাড়িয়ে যায়। এছাড়া রেসার কবুতরের দাম তুলনামূলক বেশি। মূলত কবুতরের দাম নির্ধারণ হয় বেশি সময় আকাশে উড়া, আবার বেশি ডিগবাজি দেওয়া নিয়ে। হাটে অনেক বিক্রেতা ক্রেতাকে কবুতরের পা বেঁধে উড়িয়ে ডিগবাজি চেক করে দেয়। তবে যারা কবুতরবাজ (কবুতরপ্রেমী) তারা কবুতর দেখলে বুঝতে পারে কয় ঘণ্টা আকাশে উড়বে।

জেলার বাইরেও ছড়িয়েছে হাটের পরিচিতি : কাটাখালীর কবুতরের হাটে শুধু স্থানীয় ক্রেতা-বিক্রেতাদের মধ্যে কেনাবেচা সীমাবদ্ধ নেই। রাজশাহীর বাইরের বিভিন্ন জেলা থেকেও মানুষ আসেন এখানে। স্থায়ী বিক্রেতাদের পাশাপাশি আশপাশের এলাকার কবুতর পালনকারীদের অংশগ্রহণে হাটের পরিধি আরও বিস্তৃত হয়েছে। শুক্রবার সকাল ৯টার পর থেকেই বাড়তে থাকে ক্রেতা-বিক্রেতাদের উপস্থিতি। খাঁচায় রাখা কবুতর দেখে পছন্দ করেন ক্রেতারা। এরপর শুরু হয় দরদাম। পছন্দ ও দামের মিল হলে সম্পন্ন হয় কেনাবেচা। এভাবে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই লাখ লাখ টাকার কবুতর হাতবদল হয়।

হাট সংশ্লিষ্টদের হিসাবে, শুক্রবারে আনুমানিক সাড়ে ছয় থেকে সাত লাখ টাকার কবুতর বিক্রি হয়। প্রতিটি কবুতর কেনাবেচার ক্ষেত্রে খাজনা হিসেবে দিতে হয় ১০ টাকা। এ নিয়মে প্রতিটি বিক্রিত কবুতরের বিপরীতে নির্ধারিত খাজনা আদায় করা হয়। নাটোরের আহমেদপুর থেকে কবুতর কিনতে এসেছেন রুবেল ইসলাম। তিনি বলেন, 'নতুন কবুতর পালন করছি। তাই বরেন্দ্র অঞ্চলের (কাকনহাট এলাকার) গোবিন গোলা কিনব।' তার সঙ্গে আসা সাবিক কিনবেন রাজশাহীর গিরিবাজ। তিনি বাড়িতে লালন পালন করবেন। তাই যে গিরিবাজের ডিগবাজি বা খেল রয়েছে। তেমন দুই জোড়া কবুতর কেনেন তিনি।

কাটাখালী হাটের পুরোনো কবুতর বিক্রেতা জনি ইসলাম। তিনি বলেন, রাজশাহীর বাইরের অন্য জেলার লোকজন আসে কবুতর কিনতে। রাজশাহী জেলায় সবচেয়ে বড় হাট বসে কাটাখালীতে। আরে বানেশ্বরে বসত। কিন্তু সেই হাট তেমন চলে না। সবচেয়ে ভালো চলে কাটাখালী ও কাকনহাট। এই দুই হাটে মোটমুটি যোগাযোগ ভালো। তাই ক্রেতা-বিক্রেতারা ভালো আসে। কেনা-বেচাও ভালো হয়।

কবুতরের খাবারেও জমজমাট বেচাকেনা : কবুতরের হাটকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে খাবারের অস্থায়ী বাজারও। হাটের পাশে কবুতরের খাবারের দোকান দিয়েছেন জহুরুল ইসলাম। শুক্রবারের হাটের দিন তিনি গম, ভুট্টার গুঁড়া, সরিষা, হ্যাটকা ও ধানসহ বিভিন্ন ধরনের খাবার বিক্রি করেন।

জহুরুল ইসলাম বলেন, কবুতর কিনতে আসা অনেকেই নিজেদের কবুতরের জন্য খাবারও কিনে নেন। আবার নিয়মিত কবুতর পালনকারীরা প্রয়োজন অনুযায়ী বিভিন্ন ধরনের খাবার সংগ্রহ করেন। ফলে কবুতর কেনাবেচার পাশাপাশি খাবারের দোকানেও ভালো বেচাকেনা হয়। একদিকে কবুতরের হাট, অন্যদিকে কবুতরের খাবারের বাজার—সব মিলিয়ে শুক্রবারে কাটাখালীতে তৈরি হয় আলাদা এক বাণিজ্যিক পরিবেশ।

কয়েক ঘণ্টার হাটে লাখ টাকার লেনদেন : সপ্তাহে দুই দিন হাট বসলেও শুক্রবারের বেচাকেনাই কাটাখালীর কবুতরের হাটের মূল আকর্ষণ। স্থায়ী ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি স্থানীয় পালনকারীদের অংশগ্রহণ, জেলার বাইরের ক্রেতা-বিক্রেতাদের উপস্থিতি এবং নানা জাতের কবুতরের সমাহারে এ হাটের পরিচিতি ছড়িয়েছে। বিশেষ করে রাজশাহী গিরিবাজের প্রতি কবুতরপ্রেমীদের আগ্রহ এ হাটকে দিয়েছে স্থানীয় বৈশিষ্ট্য। কবুতর কেনাবেচার পাশাপাশি খাবারের দোকানেও হাজার হাজার টাকার লেনদেন হচ্ছে। কয়েক ঘণ্টার এই হাট ঘিরে প্রতি সপ্তাহেই তৈরি হচ্ছে উল্লেখযোগ্য বেচাকেনার সুযোগ।

জেলার গোদাগাড়ী উপজেলার কাকনহাটে কথা হয় ব্যবসায়ী বাপ্পির সঙ্গে। তার বাড়ি পবা উপজেলায়। তিনি দীর্ঘ সাত থেকে আট বছর ধরে কবুতর কেনাবেচা করেন। তিনি বলেন, আমাদের এক হাট থেকে কিনে আরেক হাটে বিক্রি করাই কাজ। অনেক সময় মানুষ কবুতরের অর্ডার দেয়। তখন আমরা ভালো জাতের কবুতর কিনে এনে দেই। রাজশাহীতে চলে— যে কবুতর বেশি সময় উড়ে আর বেশি ডিগবাজি দেয় এমন। এ বিষয়ে কাটাখালী কবুতরহাটের ইজারাদার ওমর ফারুক বলেন, শুক্রবার সবচেয়ে বড় কবুতরের হাট বসে। জেলার বাইরের ক্রেতা-বিক্রেতা আসে হাটে। সবমিলে ভালোই চলে।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত