প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ১৩ জানুয়ারি, ২০২১
আল্লাহ তায়ালা মানুষকে পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ জাতি হিসেবে মনোনীত করেছেন। পৃথিবীর সব সৃষ্টিকেই তিনি মানবজাতির অধীন করে দিয়েছেন। তন্মধ্যে কিছু সৃষ্টিকে আমরা বাহন হিসেবে ব্যবহার করি, আবার কিছু সৃষ্টি আমরা খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করে থাকি। খাদ্য তালিকায় আমাদের যে ফলফলাদি রয়েছে, তন্মধ্যে পবিত্র কোরআনেও মানুষের জন্য উপকারী কিছু ফলের বিবরণ তুলে ধরা হয়েছে। আমরা আজ কোরআনে উল্লিখিত ফলের তালিকা ও মানবদেহে এর উপকারিতা নিয়ে সংক্ষিপ্ত আলোচনা উপস্থাপন করব ইনশাআল্লাহ।
কলা : আরবিতে কলাকে ‘মাউঝুন’ বলা হয়। কিন্তু পবিত্র কোরআনে একে ‘ত্বলহুন’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এর ইংরেজি নাম ইধহধহধ। এ ফল মানবদেহে বর্ণনাতীত উপকার দেয় : ১. পটাশিয়াম বেশি থাকায় হৃদযন্ত্র ভালো থাকে ও উচ্চ রক্তচাপজনিত সমস্যা দূর হয়। ২. বৃক্ক (কিডনি) সুস্থ রাখে ও পাথর হওয়ার ঝুঁকি কমায়। ৩. কলায় প্রচুর প্রাকৃতিক শর্করা ও ফাইবার থাকায় শরীরে শক্তি জোগায় ও পেট পরিষ্কার রাখে। ৪. শরীরে অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট বৃদ্ধি করে এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়। ৫. এছাড়া ওজন নিয়ন্ত্রণে, সুনিদ্রায় সহায়তা ও মানসিক চাপ কমায়। পবিত্র কোরআনে জান্নাতি লোকদের বিচরণক্ষেত্রের বর্ণনায় বলা হয়েছে : ‘যারা ডান দিকে থাকবে তারা কত ভাগ্যবান! তারা থাকবে কাঁটাবিহীন বাদরিকা বৃক্ষে এবং কাঁদি কাঁদি কলায়।’ (আল-ওয়াক্বিয়াহ : ২৭-২৯)।
বরই বা বদরিকা : পবিত্র কালামুল্লাহ শরিফের দুই স্থানে বরইকে ‘ছিদরুন’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এর ইংরেজি নাম : ঔঁলঁনব; চষঁস। এটি কণ্টকপূর্ণ গাছের সুস্বাদু ফল। শুধু স্বাদে নয়, ফলটি পুষ্টিগুণেও সেরা। ১. ফলটি খেলে শরীরে শক্তি জোগায়, তাই দ্রুত অবসাদ কেটে যায়। ২. এটি অত্যন্ত চমৎকার রক্ত বিশুদ্ধকারক। ৩. প্রচুর ভিটামিন-সি থাকায় এটি সংক্রামক রোগ দূর করতে সাহায্য করে। ৪. অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট থাকায় যকৃতের কার্যক্ষমতা বৃদ্ধি করে এবং বিভিন্ন ক্যান্সার কোষ ও টিউমারের বিরুদ্ধে কাজ করে। ৫. এছাড়া রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি, ওজন নিয়ন্ত্রণ ও হাড় মজবুতে ভূমিকা রাখে। আমরা যে বরই বা কুল নিয়ে কথা বলছি তা কাঁটাযুক্ত গাছের ফল; কিন্তু আল্লাহ তাঁর কিতাবে যে বরই গাছের উল্লেখ করেছেন তা হবে কাঁটামুক্ত জান্নাতিদের জন্য বিশেষ এক বৃক্ষ। আল্লাহ বলেন : ‘যারা ডান দিকে থাকবে তারা কত ভাগ্যবান! তারা থাকবে কাঁটাবিহীন বাদরিকা বৃক্ষে।’ (আল-ওয়াক্বিয়াহ : ২৭-২৮)।
খেজুর : আল কোরআনে খেজুরের আরবি নাম ‘আন-নাখলু’ ছয়বার ‘ত্বলউন’ এবং ‘রুত্বাবুন’ একবার করে ব্যবহৃত হয়েছে। ইংরেজিতে বলা হয় : উধঃব; চবৎংরসড়হ। পুষ্টিগুণ ও উপকারিতায় খেজুর তুলনাহীন একটি ফল। ১. প্রচুর আয়রন থাকায় রক্তস্বল্পতা রোগের হাত থেকে রক্ষা করে। ২. খেজুরে হৃদস্পন্দনের হার ঠিক রাখে এবং রক্তচাপ কমাতে সাহায্য করে। ৩. প্রচুর ফাইবার থাকায় পরিপাকতন্ত্রকে পরিষ্কার রাখা ও কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যা দূর করে। ৪. খেজুরকে মরুভূমির গ্লুকোজ বলা হয়, তাই চিনির পরিবর্তে খেতে পারেন। ৫. ক্যালসিয়াম থাকায় হাড় মজবুত রাখে এবং হাড় ক্ষয়জনিত রোগ দূর করে। এরশাদ হচ্ছে : ‘আমি আকাশ থেকে কল্যাণময় বৃষ্টি বর্ষণ করি এবং তা দ্বারা বাগান ও শস্য উৎপাদন করি, যেগুলোর ফসল আহরণ করা হয়। এবং লম্বমান খেজুর বৃক্ষ, যাতে আছে গুচ্ছ গুচ্ছ খেজুর।’ (সুরা ক্বফ : ৯-১০)।
আনার : পবিত্র কোরআনে তিন জায়গায় একে ‘রুম্মান’ নামে অভিহিত করা হয়েছে। এর ইংরেজি নাম চড়সবমৎধহধঃব। এ ফল মানবদেহের জন্য বর্ণনাতীত উপকারী। এ ফলটি ১. কোলেস্টেরল কমিয়ে হৃদরোগের ঝুঁকি কমায় এবং রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখে। ২. আনারের অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট ক্যান্সার সেল তৈরি ও বেড়ে ওঠাকে বাধাগ্রস্ত করে। ৩. আনারে ত্বকে সৌন্দর্য বহুগুণ বৃদ্ধি করে। ৪. মানসিক চাপ কমাতে সাহায্য করে ও স্মৃতিশক্তি বৃদ্ধি করে। ৫. ভিটামিন-এ এবং সি থাকায় রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে। এটি জান্নাতের ফলগুলোর মধ্যেও একটি থাকবে। কোরআনে এসেছে : ‘তথায় আছে ফলমূল, খেজুর ও আনার।’ (সূরা আর-রহমান : ৬৮)।
আঙুর : পবিত্র কালামে পাকে পাঁচ স্থানে আঙুরকে ‘ইনাব’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলটির ইংরেজি নাম এৎধঢ়ব। যেসব উপকারিতায় ভরপুর এ ফল : ১. আঙুর নিয়মিত রক্ত সঞ্চালনে সহায়ক ও ইন্সুলিন বৃদ্ধি করে। ২. কোলেস্টেরল কমাতে সাহায্য করে। ৩. ভিটামিন-সি থাকায় ত্বক সুরক্ষিত থাকে, উজ্জ্বলতা বৃদ্ধি করে এবং বয়সের ছাপে বাধা দেয়। ৪. বৃক্কে ক্ষতিকারক ইউরিক এসিডের মাত্রা সহনশীল অবস্থায় রাখে। ৫. স্নায়ুশক্তি বৃদ্ধি করে এবং মস্তিষ্ক সচল রাখে। বর্ণিত হয়েছে : ‘আমি (আল্লাহ) খেজুরের কাঁদি থেকে গুচ্ছ বের করি, যা নুয়ে থাকে এবং (উৎপন্ন করি) আঙুরের বাগান।’ (সূরা আল-আনআম : ৯৯)।
ডুমুর বা আঞ্জির : পবিত্র কোরআনে ফলটির নাম ‘ত্বিন’ বলে উল্লেখ আছে। ইংরেজিতে যাকে বলা হয় : ঋরপঁং; ঋরম। এটি এক ধরনের নরম ও মিষ্টি জাতীয় ফল। যে ডুমুর (ঋরপঁং পধৎরপধ) ফল হিসেবে খাওয়া হয় সেটি মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে বেশি পাওয়া যায়। আমাদের দেশের ফলগুলো (কাকডুমুর) তরকারি হিসেবেই বেশি পরিচিত। এতে রয়েছে প্রচুর পরিমাণ ভিটামিন, শর্করা, পটাশিয়াম, ক্যালসিয়াম ও আয়রন। স্বাস্থ্য উপকারিতায়ও এটি অনন্য। ১. প্রচুর পটাশিয়াম থাকায় উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ করে। ফলে হৃদরোগের ঝুঁকি কমে। ২. রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে। ৩. পুষ্টিগুণ বেশি থাকায় গর্ভবতী মায়েদের জন্য উচ্চমাত্রায় সুপারিশ করে। ৪. রক্তস্বল্পতা দূর করে। ৫. এছাড়া চর্মরোগ নিরাময়েও ডুমুর বেশ কার্যকরী। কোরআনে এ ফলের নামে শপথ করা হয়েছে : ‘শপথ, ত্বিন ও জয়তুনের।’ (আত-ত্বিন: ১)।
জয়তুন : ঐশী গ্রন্থে জয়তুন ফলটির নাম পাঁচ স্থানে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলটির বৈজ্ঞানিক নাম ঙষবধ বঁৎড়ঢ়ধবধ। এটি ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের এলাকা বিশেষ করে লেবানন, সিরিয়া, তুরস্কের সামুদ্রিক এলাকা ও ইরানের উত্তরাঞ্চল তথা কাস্পিয়ান সাগরের দক্ষিণে ভারেলা জন্মে। ছোট এ ফলটিতে অভাবনীয় উপকার। জয়তুনের তেলকে খরয়ঁরফ এড়ষফ তথা তরল সোনা নামেও ডাকা হয়। এ তেল খাবারে ব্যবহার করলে ১. শরীরের ক্ষতিকর কোলেস্টেরল (খউখ) এবং উপকারী কোলেস্টেরল (ঐউখ) নিয়ন্ত্রণ করে। ২. গর্ভধারণের পর থেকে সন্তান প্রসব পর্যন্ত মায়ের পেটে জয়তুনের তেল ব্যবহার করলে জন্মদাগ পড়ে না। ৩. খাবারে ব্যবহার করলে পরিপাকতন্ত্রের ক্যান্সার প্রতিরোধ হয়। ৪. বয়স বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে এটি ত্বক কুঁচকানো প্রতিরোধ করে। ৫. পাকস্থলী ও যকৃত পরিষ্কার রাখে। এছাড়া নানাবিধ উপকার রয়েছে এ ফলে। কোরআনে এসেছে : ‘তিনি পানি দ্বারা তোমাদের জন্য উৎপাদন করেন ফসল, জয়তুন, খেজুর, আঙুর ও সর্বপ্রকার ফল।’ (আন-নাহল : ১১)। দেখতে প্রায় এক হওয়ায় অনেকেই জয়তুনকে জলপাইয়ের সঙ্গে এক করে ফেলি; কিন্তু এটি সম্পূর্ণ ভিন্ন।