ঢাকা সোমবার, ১৫ জুন ২০২৬, ১ আষাঢ় ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

পদার্থ বিজ্ঞানে মুসলিম

ড. রাগিব সারজানি
পদার্থ বিজ্ঞানে মুসলিম

বিভিন্ন জাতি ও সভ্যতার উত্তরাধিকারের ওপর ভিত্তি করেই জ্ঞান-বিজ্ঞানের সব শাখার উন্নতি ও বিকাশ ঘটে; তেমনি মুসলিমদের প্রকৃতি বিজ্ঞানচর্চাও শুরুর দিকে গ্রিক রচনারাশির ওপর নির্ভরশীল ছিল। এসব রচনায় গ্রিক বিজ্ঞানীরা শুধু দর্শনের ওপর নির্ভরশীল থেকেছেন; দর্শনের মধ্য দিয়ে প্রকৃতিকে বোঝার চেষ্টা করেছেন। তাদের প্রচেষ্টায় পরীক্ষা-নিরীক্ষার উল্লেখযোগ্য কোনো ভূমিকা ছিল না। মুসলিম বিজ্ঞানীরা ধীরে ধীরে এই মৌলিক বিষয়টির বিকাশ ঘটিয়েছেন। তারা পদার্থবিজ্ঞানের ময়দানে অভূতপূর্ব যোগ্যতা ও মেধা নিয়ে অবতীর্ণ হয়েছেন। যেন তারা জ্ঞানের একটি নতুন শাখার উদ্ভাবন ঘটিয়েছেন। কারণ মুসলিম বিজ্ঞানীরাই পদার্থবিজ্ঞানের ভিত পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও এক্সপেরিমেন্টের ওপর প্রতিষ্ঠিত করেছেন; তারা দর্শন ও চিন্তা-ভাবনার ওপর নির্ভরশীল হননি।

মুসলিম বিজ্ঞানীরা নতুন থিওরি ও সূত্র প্রদান করেছেন এবং উদ্ভাবনমূলক গবেষণায় ব্রতী হয়েছে। যেমন : গতিসূত্র, জলসূত্র, মহাকর্ষ নিয়ম। তাছাড়া তারা খনিজ পদার্থ ও তরল পদার্থের নির্দিষ্ট ভর নিয়ে গবেষণা করেছেন। তরল পদার্থের নির্দিষ্ট ভর পরিমাপ করতে সক্ষম হয়েছেন। এটিকে বর্তমান যুগে বাস্তবধর্মী আধুনিক উপকরণ থাকা সত্ত্বে¡ও কঠিন কাজ মনে করা হয়!

মুসলিম বিজ্ঞানীরা শুরুতে পূর্বসূরিদের গ্রন্থাবলির ওপর নির্ভর করেছেন। যেমন : ১. অ্যারিস্টটল কর্তৃক রচিত বুক অব ম্যাটাফিজিক্স, এই গ্রন্থে তিনি গতিসূত্র নিয়ে আলোচনা করেছেন। ২. আর্কিমিডিসের রচনাবলি, এসব রচনায় পানিতে ভাসমান বস্তু, কতিপয় পদার্থের নির্দিষ্ট ভর ইত্যাদি বিষয়ে আলোচনা রয়েছে। ৩. তিসিবিওসের গ্রন্থাবলি, এসব গ্রন্থে পাম্প ও জলঘড়ির সূত্রাবলি রয়েছে। ৪. হেরন অব আলেকজান্দ্রিয়ার গ্রন্থাবলি, যেখানে চাকা ও কাজের সূত্র সম্পর্কে আলোচনা করেছেন।

মুসলিম বিজ্ঞানীরা অব্যাহতভাবে পূর্ববর্তী বিজ্ঞানীদের পদার্থ বৈজ্ঞানিক থিওরি ও সূত্রাবলির উন্নতি সাধন করেন; তারা এগুলোকে শুধু চিন্তাধারার পর্যায় থেকে প্রায়োগিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার স্তরে নিয়ে আসেন। মূলত পরীক্ষা-নিরীক্ষাই পদার্থ বিজ্ঞানের ভিত্তি।

মুসলিম বিজ্ঞানীরা শব্দ বিজ্ঞান, শব্দের সৃষ্টি ও স্থানান্তর নিয়ে গবেষণা করেন। তারাই প্রথম জানতে পারেন যে শব্দ সৃষ্টিকারী বস্তুর কম্পন থেকে শব্দের (শব্দতরঙ্গের) সৃষ্টি হয় এবং গোলকাকৃতিতে ছড়িয়ে পড়া তরঙ্গরূপে বাতাসের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়। তারা প্রথম শব্দকে কয়েক প্রকারে ভাগ করেন। বিভিন্ন প্রাণীর স্বর বা আওয়াজ কেন ভিন্ন হয় তারও কারণ বের করেন। গলার লম্বাত্ব, কণ্ঠনালির প্রশস্ততা ও স্বরযন্ত্রের গঠন ভিন্ন ভিন্ন হওয়ার কারণে স্বর বা আওয়াজেরও ভিন্নতা ঘটে। মুসলিম বিজ্ঞানীরাই প্রথম প্রতিধ্বনির কার্যকারণ ব্যাখ্যা করেন। তারা বলেন, তরঙ্গিত বায়ু (শব্দতরঙ্গ) উঁচু কোনো প্রতিবন্ধকের যেমন পাহাড় বা দেওয়ালের সঙ্গে বাধাপ্রাপ্ত হয়ে উল্টে গেলে (ফিরে এলে) প্রতিধ্বনির সৃষ্টি হয়। (প্রতিবন্ধক বস্তুর) নৈকট্যের কারণে প্রতিধ্বনির শ্রুতি-অনুভূতি নাও হতে পারে; শব্দের ও তার উল্টে যাওয়ার সময়ের ব্যবধানের কারণেও প্রতিধ্বনির শ্রুতি-অনুভূতি হয় না।

তরল পদার্থ-সম্পর্কিত বিজ্ঞান সম্পর্কে বলতে গেলে বলা যায়, মুসলিম বিজ্ঞানীরা তরল পদার্থের নির্দিষ্ট ভর পরিমাপের পদ্ধতি সম্পর্কে বিশেষ গবেষণামূলক রচনাবলি লিখেছেন। তারা খনিজ পদার্থ উত্তোলনের বেশ কিছু পদ্ধতি আবিষ্কার করেছেন; কিছু উপাদানের ঘনত্ব নিরূপণে সক্ষম হয়েছেন। তাদের হিসাব ও পরিমাপ ছিল অত্যন্ত সূক্ষ্ম এবং বর্তমান সময়ে যে-পরিপাম রয়েছে তার অনুরূপ অথবা কিছুটা ভিন্ন।

মুসলিম বিজ্ঞানীদের মধ্যে যারা পদার্থবিজ্ঞানে সুনাম কুড়িয়েছেন তাদের অন্যতম হলেন আবু রায়হান আল-বিরুনী। তিনি ১৮ ধরনের বহুমূল্য পাথরের আপেক্ষিক গুরুত্ব নিরূপণ করেন। তিনি এই সূত্র প্রদান করেন যে, বস্তুর আপেক্ষিক গুরুত্ব তা যতটুকু পানি সরিয়ে দেয় তার আয়তনের সঙ্গে সমানুপাতিক। আল-বিরুনী সংযোগযুক্ত পাত্রের সূত্র থেকে প্রাকৃতিক ঝরনা এবং আর্তেজীয় কূপ থেকে পানি-প্রবাহের কার্যকারণ ব্যাখ্যা করেন।

আল-খাযিনি পদার্থবিজ্ঞানের ময়দানে নতুন কিছু উদ্ভাবন করেছেন। তিনি বিশেষ করে গতিবিদ্যা ও জলস্থিতিবিদ্যায় (তরল পদার্থের স্থিতিবিজ্ঞান) বিস্ময়কর অবদান রেখেছেন, যা তার পরবর্তী গবেষকদের হতবাক করে দিয়েছে। গতিবিদ্যার ময়দানে বর্তমান সময়েও তার থিওরিগুলো বিদ্যালয়ে ও বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ানো হয়। এসব থিওরির মধ্যে অন্যতম হলো সেøাপ থিওরি ও ইমপাল্স থিওরি। এই দুটি থিওরি গতিবিজ্ঞানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। অনেক ঐতিহাসিক আল-খাযিনিকে সব যুগের পদার্থবিজ্ঞানের ওস্তাদ বলে গণ্য করেছেন। আল-খাযিনি তার অধিকাংশ সময় স্থির তরল পদার্থ বিষয়ে গবেষণায় কাটিয়েছেন। তিনি তরল পদার্থের নির্দিষ্ট ভর জানার জন্য একটি যন্ত্র আবিষ্কার করেছেন। কোনো কঠিন বস্তুকে তরল পদার্থে নিমজ্জিত করা হলে তা তার নিচ থেকে ওপর পর্যন্ত কতটুকু তরলকে সরিয়ে দেবে তা নিয়ে তিনি তার গবেষণায় আলোচনা করেছেন। আল-খাযিনির মহান শিক্ষক আবু রায়হান আল-বিরুনী কিছু কঠিন ও তরল পদার্থের আপেক্ষিক গুরুত্ব নির্ধারণে যে পদ্ধতি ব্যবহার করেছিলেন, তিনিও ওই একই পদ্ধতি ব্যবহার করেছেন। আল-খাযিনি আপেক্ষিক গুরুত্ব পরিমাপে নির্ভুলতার বা যথার্থতার একটি বড় পর্যায়ে পৌঁছেছেন, যা তার সমসাময়িক বিজ্ঞানীদের ও তাদের অনুসারীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে।

আমেরিকান পদার্থবিদ রবার্ট এন হল বিজ্ঞানী চরিতাভিধানে আল-খাযিনি সম্পর্কিত একটি প্রবন্ধে কঠিন ও তরল পদার্থের আপেক্ষিক গুরুত্ব আবিষ্কারে আল-খাযিনির পদ্ধতি ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি যে বাতাসে ও পানিতে বস্তুর ভর নিরূপণের স্কেল আবিষ্কার করেছিলেন তারও ব্যাখ্যা দিয়েছেন। এটির পাঁচটি পাল্লা ছিল, যা একটি পর্যায়ক্রমিক বাহুর ওপর সঞ্চরমান থাকত। হামিদ মুরানি ও আবদুল হালিম মুনতাসির উভয়ে তাদের রচিত গ্রন্থ ‘ফি তারিখিল উলুম ইনদাল আরাব’-এ বলেছেন, ইতালিয়ান পদার্থবিজ্ঞানী ও গণিতজ্ঞ টরিসেলির বহু আগেই আল-খাযিনি বায়ুর উপদান ও ওজন নির্দেশ করেছেন। তিনি নির্দেশ করেছিলেন যে, বায়ুরও তরল পদার্থের মতো ওজন ও ঊর্ধ্বমুখী চাপ রয়েছে। বায়ুপূর্ণ স্থানে বস্তুর ভর তার প্রকৃত ভরের চেয়ে কম; প্রকৃত ভরের চেয়ে কতটুকু কম তা নির্ভর করে বায়ুর ঘনত্বের ওপর। আল-খাযিনি আরও ব্যাখ্যা করেছেন, আর্কিমিডিসের সূত্র শুধু তরল পদার্থের ক্ষেত্রে নয়, বরং তা গ্যাসীয় পদার্থের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। এ ধরনের গবেষণাই ব্যারোমিটার, শোষকল ও পাম্প আবিষ্কারের পথ সহজ করে দিয়েছিল। পদার্থবিজ্ঞানে এসব অবদান রাখার কারণেই আল-খাযিনি টরিসেলি, ব্লেইজ প্যাসকেল, রবার্ট বয়েল ও অন্যান্য বিজ্ঞানীর অগ্রগামী মনীষী হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছেন।

পদার্থবিজ্ঞানের গবেষণায় গতিসূত্রাবলিও অবিচ্ছেদ্য অংশ। এসব সূত্র আবিষ্কারে মুসলিম বিজ্ঞানীদের যথেষ্ট অবদান রয়েছে। নিচে তা আলোচনা করছি।

গতিসূত্রগুলো এতটাই গুরুত্ব রাখে যে, তা আধুনিক সভ্যতার মেরুদ- হিসেবে গণ্য হয়। বর্তমান যুগের প্রতিটি চলমান যন্ত্রÑ গাড়ি, রেলগাড়ি, উড়োজাহাজ থেকে শুরু করে স্পেস মিসাইল, ইন্টারকন্টিনেন্টাল মিসাইল থেকে শুরু করে সব গতিশীল যন্ত্রের কার্যপ্রণালি গতিসূত্রের ওপর নির্ভরশীল। গতিসূত্রগুলোর ওপর ভিত্তি করেই মানুষ মহাশূন্যে অভিযান পরিচালন করছে এবং চাঁদের পৃষ্ঠে নামতে পেরেছে। তাছাড়া গতিসূত্রাবলিকে গতিশীলতার ওপর নির্ভরশীল পদার্থবিজ্ঞানের সব শাখার মূল ভিত্তি হিসেবে পরিগণিত হয়। আলোকবিজ্ঞান মানে আলোর সঞ্চরমান তরঙ্গ; স্বর বা আওয়াজ মানে প্রবহমান শব্দতরঙ্গ; বিদ্যুৎ বা ইলেক্ট্রিসিটি হলো ইলেকট্রনের তরঙ্গ ইত্যাদি।

পশ্চিমে ও প্রাচ্যে সব মানুষের কাছে এটাই কিংবদন্তি যে, গতিসূত্রগুলোর আবিষ্কারক হলেন ইংরেজ পদার্থবিজ্ঞানী আইজাক নিউটন। তার ফিলসফিয়া ন্যাচারালিস প্রিন্সিপিয়া ম্যাথামেটিকা গ্রন্থটি প্রকাশের পর থেকেই এই কিংবদন্তির সূচনা হয়।

এটিই গোটা বিশ্বে সুবিদিত সত্যে পরিণত হয়। বিজ্ঞানের গ্রন্থাবলিতেও এ তথ্য ব্যবহৃত হয়। স্বাভাবিকভাবেই মুসলমানদের বিদ্যালয়-বিশ্ববিদ্যলয়ও বাদ যায় না। বিংশ শতাব্দীর সূচনাকাল পর্যন্ত এই কিংবদন্তিই চালু ছিল। এ সময় সমসাময়িক কিছু মুসলিম বিজ্ঞানী বিষয়টি খতিয়ে দেখার জন্য চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেন। তাদের মধ্যে অগ্রগামী ছিলেন পদার্থবিজ্ঞানের অধ্যাপক ড. মুস্তাফা নাজিফ, যন্ত্র প্রকৌশলের অধ্যাপক ড. জালাল শাওকি, গণিতের অধ্যাপক ড. আলি আবদুল্লাহ আদ-দিফা প্রমুখ। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ইসলামি পা-ুলিপিগুলোতে যা কিছু ছিল তা তারা পর্যাপ্ত অধ্যয়ন করেন। তারা আবিষ্কার করেন যে, গতিসূত্রাবলি আবিষ্কারের প্রকৃত কৃতিত্ব মুসলিম বিজ্ঞানীদের দিকেই যায়। এ ক্ষেত্রে নিউটনের ভূমিকা ও কৃতিত্ব এই যে, তিনি এসব নিয়মের উপাদান সংগ্রহ করেন, সেগুলোতে সূত্রাবদ্ধ করেন এবং গাণিতিক কাঠামোতে সংজ্ঞায়িত করেন।

আবেগ ও তাত্ত্বিক বক্তৃতা বাদ দিয়ে বলা যায়, গতিসূত্রের ক্ষেত্রে মুসলিম বিজ্ঞানীদের প্রচেষ্টা স্পষ্ট ও দ্বিধাহীন। তাদের পা-ুলিপিতে অসংখ্য নির্ভরযোগ্য ও অকাট্য বক্তব্য রয়েছে, যা এই সত্যকে প্রতিভাত করে। এসব পা-ুলিপি তারা রচনা করেছেন নিউটনের আবির্ভাবের ৭০০ বছর আগে।

অনুবাদ : আবদুস সাত্তার আইনী

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত