প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ০৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২১
আল্লাহ তায়ালা যে পরিবেশ সৃষ্টি করেছেন তা হলো পরিচ্ছন্ন, নিরাপদ ও উপকারী। তিনি পরিবেশকে মানুষের আয়ত্বাধীন করে দিয়েছেন। একই সঙ্গে মানুষের ওপর পরিবেশের প্রয়োজনীয় সুরক্ষাবিধান আবশ্যক করে দিয়েছেন। যেমন তিনি আল্লাহর সৃষ্টিজগতের নিদর্শনাবলিতে প্রয়োজনীয় চিন্তাভাবনা করতে মানুষকে আহ্বান জানিয়েছেন। এ জগৎকে তিনি অত্যন্ত সুন্দর করে সৃষ্টি করেছেন। আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, ‘তারা কি তাদের ঊর্ধ্বস্থিত আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখে না, আমি কীভাবে তা নির্মাণ করেছি এবং তা সুশোভিত করেছি এবং তাতে কোনো ফাটলও নেই? আমি বিস্তৃত করেছি ভূমিকে ও তাতে স্থাপন করেছি পর্বতমালা এবং তাতে উদ্গত করেছি নয়নপ্রীতিকর উদ্ভিদ।’ (সুরা ক্বাফ : আয়াত ৬-৭)।
কোরআনের এই দৃষ্টিভঙ্গির ওপর ভিত্তি করেই মুসলিম মানব এবং প্রাণিকুল ও জড়পদার্থের সমন্বয়ে গঠিত তার চারপাশের পরিবেশ-পৃথিবীর মধ্যে প্রেম ও ভালোবাসার সম্পর্কের সৃষ্টি হয়েছে। এ দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই মানুষ বুঝতে পেরেছে যে, পরিবেশ সুরক্ষায় পার্থিব জীবনে তার উপকারিতা রয়েছে। কারণ সে সুন্দর-স্বাচ্ছন্দ্যময় জীবনযাপন করতে পারবে এবং আখিরাতেও আল্লাহর পক্ষ থেকে রয়েছে চমৎকার পুরস্কার।
সৃষ্টিজগতের প্রতি কোরআনের যে-সমাগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি তার সমর্থনে রাসুলুল্লাহ (সা.) এর চিন্তাভাবনা প্রতিফলিত হয়েছে এবং তার ভিত্তি এই যে, প্রকৃতির উপাদান ও মানুষের মধ্যে মৌলিক বন্ধন বিদম্যান এবং তাদের মধ্যে রয়েছে আদান-প্রদানমূলক সম্পর্ক। মানুষ যখন প্রকৃতির কোনো উপদানের অপব্যবহার করবে বা পুরো উপাদান নিঃশেষ করে দেবে তখন গোটা পৃথিবীই সরাসরি বিভিন্ন ধরনের ক্ষতির সম্মুখীন হবে। এই বিশ্বাসই হলো রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর চিন্তাভাবনার মূল পয়েন্ট।
এ-কারণে, পৃথিবীর বুকে বসবাসকারী মানবম-লীর জন্য সর্বজনীন নীতি প্রবর্তন করেছে ইসলামী শরিয়া। তা হলো এই ধরিত্রীর কোনো ধরনের ক্ষতি সাধন না করা। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “কেউ কারও ক্ষতি করবে না, কেউ কারও ক্ষতির সম্মুখীন হবে না।” (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস নং ২৭১৯)।
ইসলামী শরিয়ার ধারাবাহিক বিধানাবলি পরিবেশকে নোংরা এবং বিনষ্ট করার ব্যাপারে সতর্ক করেছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) অনুরূপ একটি বিধান দিয়ে বলেছেন, ‘তোমরা তিনটি অভিসম্পাতপূর্ণ কাজ থেকে বিরত থাক : যাওয়া-আসার স্থানে মলমূত্র ত্যাগ করা, রাস্তার মধ্যস্থলে মলমূত্র ত্যাগ করা এবং গাছের ছায়ায় মলমূত্র ত্যাগ করা।” (আবু দাউদ : হাদিস নং ২৬)।
রাসুলুল্লাহ (সা.) কষ্টদায়ক বস্তু সরিয়ে দেওয়াকে রাস্তার অধিকার বলে ঘোষণা করেছেন। আবু সাঈদ খুদরি (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “তোমরা রাস্তার ওপর বসা থেকে বিরত থাক। তারা (সাহাবিরা) বললেন, আমাদের তো রাস্তার ওপর বসা ছাড়া গত্যন্তর নেই। কারণ, রাস্তায় আমরা প্রয়োজনীয় কথাবার্তা সমাধা করি। তিনি বললেন, যদি তোমরা সেখানে বসতে একান্ত বাধ্যই হও তবে রাস্তার হক আদায় করবে। তার বললেন, রাস্তার হক কী? তিনি বললেন, ... এবং কাউকে (পথচারীকে) কষ্ট না দেওয়া...।” (বোখারি : হাদিস নং ২৩৩৩) ‘কষ্ট না দেওয়া’ কথাটি সামগ্রিক; অর্থাৎ, যেসব মানুষ সড়ক ও অলিগলি ব্যবহার করে তাদের যে-কোনো ধরনের কষ্টদান থেকে বিরত থাকতে হবে।
তার চেয়ে বড় ব্যাপার হলো রাসুলুল্লাহ (সা.) পরিবেশ সুরক্ষা ও প্রতিদানপ্রাপ্তির মধ্যে একটি সম্পর্ক জুড়ে দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘আমার উম্মতের ভালো-মন্দ আমলগুলো আমার কাছে উপস্থিত করা হয়; তখন আমি তাদের ভালো কাজগুলোর মধ্যে পেলামÑ রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক বস্তু দূর করা এবং মন্দ কাজগুলোর মধ্যে পেলামÑ কফ বা নাসা-শ্লেষ্মা মসজিদে ফেলা, যা (মাটিতে) পুঁতে ফেলা ব্যতিরেকে।” (মুসলিম : হাদিস নং ৫৫৩)।
রাসুলুল্লাহ (সা.) আবাসস্থল পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার স্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, “নিশ্চয় আল্লাহ তায়ালা পবিত্র; তিনি পবিত্রতাকেই ভালোবাসেন। তিনি পরিচ্ছন্ন; তাই পরিচ্ছন্নতাকেই পছন্দ করেন। ... সুতরাং তোমরা তোমাদের (ঘর-দুয়ার ও) আঙিনাকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখ, ইহুদিদের তো (অপরিচ্ছন্ন ও অপরিষ্কার) রেখ না।” (তিরমিজি : হাদিস নং ২৭৯৯)।
এসব শিক্ষা ও বিধান কত উত্তম, যা যে-কোনো ধরনের নোংরা ও আবর্জনা থেকে মুক্ত পবিত্র জীবনের প্রতি মানুষকে উদ্বুদ্ধ করে। এসব বিধানের মধ্য দিয়ে ইসলামী শরিয়া মানুষের আত্মিক ও স্বাস্থ্যগত সুখের সুরক্ষা দিয়েছে।
প্রকৃতি ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে সুরক্ষাদানের ব্যাপারে উদ্বুদ্ধ করতে আরও স্পষ্ট ও ব্যাপকার্থক পদ্ধতি অবলম্বন করা হয়েছে। একজন সাহাবি জিজ্ঞেস করলেন, আমার কাপড়-চোপড় সুন্দর, আমার জুতা সুন্দরÑ এগুলো কি অহঙ্কারের মধ্যে পড়ে? রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, “নিশ্চয় আল্লাহ সুন্দর; তিনি সৌন্দর্য ভালোবাসেন। অহঙ্কার হলো সত্য অস্বীকার করা ও মানুষকে অবজ্ঞা করা।” (মুসলিম : হাদিস নং ৯১)।
কোনো সন্দেহ নেই যে, আল্লাহ যে-প্রকৃতিকে রুচিস্নিদ্ধ ও নয়নাভিরাম করে সৃষ্টি করেছেন তা প্রকাশের আগ্রহও সৌন্দর্যের অন্তর্ভুক্ত।
একইভাবে আমরা দেখতে পাই যে, রাসুলুল্লাহ (সা.) সুগন্ধ ভালোবাসতে এবং মানুষের মধ্যে সুগন্ধ ছড়িয়ে দিতে ও হাদিয়া দিতে নির্দেশনা দিয়েছেন। তিনি পরিবেশ সুরভিত করে তুলতে ও নোংরা পরিবেশের বিরুদ্ধে লড়াই করতে নির্দেশ দিয়েছেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “কাউকে সুগন্ধি (উপহার) দেওয়া হলে সে যেন তা ফিরিয়ে না দেয়। কারণ, সুগন্ধি বহন করা সহজসাধ্য এবং ঘ্রাণও চমৎকার।” (মুসলিম : হাদিস নং ২২৫৩)
ইসলামের একটি মহত্ত্ব এই যে, ইসলাম যে-সব ব্যাপারে বিধান দিয়েছে তার মধ্যে পরিবেশ সম্পর্কেও বিশেষ বিধান দিয়েছে। জমিনে বীজ বপন ও চারা রোপণের ব্যাপারে উদ্বুদ্ধ করা হয়েছে। নবী করিম (সা.) বলেছেন, “যে-কোনো মুসলমান কোনো ফলবতী গাছ লাগাবে, তা থেকে কিছু খাওয়া হলে তা তার পক্ষ থেকে দান (সাদকা) স্বরূপ, তা থেকে কিছু চুরি হয়ে তাও দানস্বরূপ, বন্য জীবজন্তু তা থেকে যা খাবে তাও দানস্বরূপ, পাখ-পাখালি যা খাবে তাও দানস্বরূপ। অন্য কেউ কোনো ক্ষতিসাধন করলে তাও দানস্বরূপ।” অন্য একটি বর্ণনায় আছে, “তা কিয়ামত পর্যন্ত সদকা হিসেবে থাকবে।” (মুসলিম : হাদিস নং ১৫৫২)।
ইসলামের মাহাত্ম্য এই যে, পরিবেশ ও পরিবেশের সঙ্গে যুক্ত সবার জন্য উপকারী গাছ রোপণের সওয়াব ততক্ষণ পর্যন্ত পাওয়া যাবে যতক্ষণ ওই গাছ উপকারে আসবে, যদিও ওই গাছের মালিকানা অন্য কারো হাতে চলে যায় বা রোপণকারী মারা যায়!
মানুষ অকর্ষিত বা অনুর্বর ভূমি কর্ষণ করে তাতে ফসল ফলিয়ে যে জীবিকা উপার্জন করে ইসলামী শরিয়া তার উচ্চ প্রশংসা করেছে। কারণ, গাছ রোপণ করা, বীজ বপন করা, শুকনো ও ঊষর ভূমিতে জল সিঞ্চন করা অত্যন্ত পুণ্যের কাজ। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “যে ব্যক্তি অনুর্বর ভূমিকে উর্বর করল তার জন্য এতে রয়েছে প্রতিদান এবং পশুপাখি তা থেকে যা খেল তা তার জন্য সদকা।” (নাসায়ি : হাদিস নং ৫৭৫৬)।
পানি যেহেতু গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক সম্পদ, তাই এতে মিতব্যয়িতা ও তার পবিত্রতা রক্ষা করা ইসলামে দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এ কারণেই রাসুলুল্লাহ (সা.) পানি ব্যবহারে মিতব্যয়িতা অবলম্বন করতে নির্দেশ দিয়েছেন, এমনকি পর্যাপ্ত পানি থাকলেও। এ ব্যাপারে আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রা.) থেকে হাদিস বর্ণিত হয়েছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) সা’দ ইবনে আবু ওয়াক্কাস (রা.)-এর পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন, তখন তিনি ওজু করছিলেন। তিনি বললেন, “কেন এই অপচয়, হে সা’দ? সা’দ বললেন, ওজুতেও কি অপচয় হয়? তিনি বললেন, হ্যাঁ, এমনকি তুমি প্রবহমান নদীতে ওজু করলেও।” (ইবনে মাজাহ : হাদিস নং ৪২৫)।
একইভাবে রাসুলুল্লাহ (সা.) পানি নোংরা করতে নিষেধ করেছেন। স্থির পানিতে পেশাব করতে নিষেধ করা হয়েছে। (মুসলিম : হাদিস নং ২৮১)।
পরিবেশের প্রতি এটাই হলো ইসলাম ও ইসলামী সভ্যতার দৃষ্টিভঙ্গি। মুসলমানরা বিশ্বাস করে যে, আল্লাহ তায়ালা উৎকৃষ্টরূপে যে বিশ্বজগৎ সৃষ্টি করেছেন তাতে তার নীতি অনুযায়ীই প্রকৃতি-পরিবেশ তার নানাবিধ পরিপার্শ্ব নিয়ে আন্তঃক্রিয়া, পরিপূর্ণতা লাভ ও পারস্পারিক সহযোগিতা বজায় রাখে। ইসলাম প্রত্যেক মুসলমানের জন্য পরিবেশের সৌন্দর্য রক্ষা করা আবশ্যক করে দিয়েছে।
অনুবাদ : আবদুস সাত্তার আইনী