ঢাকা রোববার, ০৫ এপ্রিল ২০২৬, ২২ চৈত্র ১৪৩২ | বেটা ভার্সন

সন্তানের নৈতিক চরিত্র গঠনে পরিবারের ভূমিকা

সন্তানের নৈতিক চরিত্র গঠনে পরিবারের ভূমিকা

আদর্শ পরিবারের সন্তান সুসন্তান হবে- এটাই স্বাভাবিক। শিশু যখন নিজ থেকেই হাত-পা নাড়তে শেখে, তখন থেকেই মূলত সে পরিবারের বড়দের কাছ থেকে শিখতে শুরু করে। আর তখন থেকেই তার সামনে বাবা-মা তথা বড়দের কথাবার্তাসহ বিভিন্ন বিষয়ে বেশ সতর্কতা অবলম্বন করতে হয়। বাড়ন্ত শিশুকে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে ভালো-মন্দ বিষয়ে অবহিত করতে হয়। তার সঙ্গে নরম সুরে, মার্জিত আচরণে বিভিন্ন বিষয় শেয়ার করতে হয়। কোনো অবস্থায়ই শিশুকে গালমন্দ করা যাবে না। কারণ শিশুদের মনমানসিকতা থাকে খুবই কোমল, তাই খুব সহজেই যে কোনো বিষয়ে তারা শিখে নিতে পারে। বড়দের কর্তব্য, আদর-স্নেহের মাধ্যমে বুঝিয়ে তাদের যে কোনো বদঅভ্যাস থেকে বিরত রাখা। আল্লাহ তায়ালা এরশাদ করেন, আর যারা বলে হে আমাদের রব, আপনি আমাদের এমন স্ত্রী ও সন্তানাদি দান করুন, যারা আমাদের চক্ষু শীতল করবে। আর আপনি আমাদের মুত্তাকিনদের ইমাম বানিয়ে দিন। (সুরা ফুরকান : ৭৪)।

যাপিত জীবনে প্রত্যেক মানুষের সবচেয়ে বেশি যা প্রয়োজন তা হলো পারিবারিক শিক্ষা। আর এগুলো রপ্ত করতে হয় প্রথমত পরিবার থেকেই। কারণ সভ্যতা, ভদ্রতা, নৈতিকতা, কৃতজ্ঞতা বোধ, অপরের প্রতি শ্রদ্ধা-স্নেহ, পরোপকার, উদার মানসিকতা- এগুলো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে খুব বেশি অর্জন করা যায় না। একাডেমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে পড়ালেখা করে শিক্ষিত হওয়া যায়। মেধাবী হয়ে উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন করে ও অন্যের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করেন না বা করতে দেখা যায় না। এর অন্যতম কারণ হলো, তিনি ছোটবেলায় তার পরিবার বা বাবা-মায়ের কাছ থেকে সামাজিক লোকাচারের শিক্ষাটি ভালোভাবে পাননি বা তাকে দেওয়া হয়নি। কিন্তু পরিবার থেকে সুশিক্ষা না পেলে একসময় সব শিক্ষাই ম্লান হয়ে যাবে।

সন্তান জন্ম দেওয়া খুব সহজ; কিন্তু তাদের মানুষ করা কঠিন। একজন আদর্শ মানুষ হিসেবে সন্তানকে গড়ার জন্য পিতা-মাতা ও পরিবারের সদস্যদেরই অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে। সন্তানকে মাঝেমধ্যে কাছে কিংবা দূরে কোথাও প্রকৃতির সান্নিধ্যে নিয়ে যেতে হবে। ভ্রমণেও শিশু অনেক কিছু শিখতে পারে। বর্তমান শহুরে সমাজে অনেক পরিবারের দুই অভিভাবকই থাকেন নিজ কর্মস্থলে ব্যস্ত। ফলে তাদের কাছ থেকে যতটুকু সময় সন্তানের প্রাপ্য তা থেকে সে হয় বঞ্চিত। সন্তান-সন্ততির সঙ্গে বাবা-মায়ের বন্ধন অনেকটা দুর্বল হয়ে পড়ে। তাই কার্টুন ছবি দেখে আর মোবাইল গেম খেলে শিশু সময় কাটায়। এতে তার মস্তিষ্ক ধারণ করে যতসব উদ্ভট চিন্তা।

সন্তানের হাতে পিতা অথবা মাতা খুন! অথবা শিক্ষিত ছেলে তার বৃদ্ধ পিতা-মাতাকে বৃদ্ধাশ্রমে রেখে এসেছে। নয়তো পরিবারের অন্য সদস্যদের ঠকিয়ে পিতা-মাতার সব জমি নিজের নামে লেখে নিয়েছে। একটা সময়ে আমাদের দেশে এসব ঘটনা কালে-ভদ্রে ঘটত। এখন তো এমন ঘটনা পান্তা ভাতের মতো। আধুনিকতার নামে সন্তাদের অবাধ স্বাধীনতায় ছেড়ে দিয়েছে। এর ফলস্বরূপ নিজেদের একদিন বৃদ্ধাশ্রমের অংশীদার তৈরি করছে। পিতা-মাতা সন্তানের সামনে যেমন আচরণ করবে, তেমন আচরণ শিখবে সেই সন্তান। আপনি যদি আপনার সন্তানের সামনে বৃদ্ধ পিতা-মাতার সঙ্গে খারাপ আচরণ করেন তাহলে বড় হয়ে সেই সন্তান আপনার সঙ্গে অসৎ আচরণ করবে- এটাই সত্য। আপনি যদি বয়স্ক, আত্মীয়স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশীদের সঙ্গে খারাপ আচরণ করেন তাহলে সেই সন্তান এমন আচরণই শিখবে। আল্লাহ তায়ালা এরশাদ করেন, তোমার প্রতিপালক নির্দেশ দিয়েছেন যে, তোমরা তিনি ছাড়া অন্য কারও ইবাদত করবে না এবং পিতা-মাতার প্রতি সদ্ব্যবহার করবে; তাদের একজন অথবা উভয়ে উভয়েই তোমার জীবদ্দশায় বার্ধক্যে উপনীত হলেও আদেরকে বিরক্তিসূচক কিছু বলো না এবং তাদেরকে ভর্ৎসনা করো না; তাদের সঙ্গে কথা বলো সম্মানসূচক নম্র কথা। (সুরা বনি ইসরাইল-২৩)।

আজকের সমাজের নৈতিক অবক্ষয়ের জন্য প্রধানত দায়ী নৈতিক ও ধর্মীয় অনুশাসনজনিত মূল্যবোধের অভাব। ধর্মীয় অনুশাসনই মানুষকে চরিত্রবান করে তোলে। মানুষের বিবেকবোধকে জাগ্রত করে। তার মধ্যে খারাপ পথে যাওয়া ও চলার ব্যপারে ভয়-ভীতির সৃষ্টি করে। প্রযুক্তি আর অপসংস্কৃতি স্রোত আমাদের ভালোমন্দ চেনাতে পারছে না। নৈতিক অবক্ষয়ের কারণগুলো হলো- পারিবারিক এবং প্রাতিষ্ঠানিভাবে সুশিক্ষার অভাব। পিতা-মাতার সচেতনতার সঙ্গে যথাযথভাবে তাদের দায়িত্ব পালন না করা। শিক্ষক-শিক্ষিকাদের সুশিক্ষাদানে উদাসীন মনোভাব। পাশ্চাত্য, অশ্লীল, অনৈসলামিক বা নোংরা সংস্কৃতির ব্যাপকতা ও সহজলভ্যতা। সমাজসেবামূলক কাজে কিশোর-কিশোরীদের উদ্বুদ্ধ না করা। বালক-বালিকাদের সহশিক্ষার কুফল। পারিবারিকভাবে ধর্মীয় আলোচনার ব্যবস্থা না করা এবং বেয়াদপিমূলক আচরণ করলে তা শুধরে না দেওয়া, নেশাজাতীয় দ্রব্যের সহজপ্রাপ্যতা। অসৎ ও চরিত্রহীন বন্ধু-বান্ধবীদের সাহচর্য। অশ্লীলতার অবলম্বন ও প্রসারে দায়িত্বশীলদের মূর্খতা বা জেনেও না জানার ভাব ধরে চলা।

আমরা যারা বাবা-মা হয়েছি। সন্তানের দায়িত্ব নিয়েছি। তারা নিজেদের আদরের সন্তানের ভবিষ্যৎ চিন্তা করে নিজেকে সংযত করতে পারি না। বর্তমানে পারিবারিক কলহ, হিংসা-বিদ্বেষ বৃদ্ধি পাচ্ছে। কারণ নিজ স্ত্রী বা স্বামীকে রেখে পরনারী বা পরপুরুষের সঙ্গে অবৈধ পরকীয়া নিয়ে ব্যস্ত। মা বাবার এসবের ঝালটা ঝাড়ে বাচ্চাদের ওপর। অথবা মা-বাবা কোনো কারণে ঝগড়া করে বলে সংসারে অশান্তি লেগেই আছে। সংসারে দাউ দাউ করে আগুন জ্বলছে। পারিবারিক কলহের কারণে পরিবারের সবার একসঙ্গে আত্মহত্যার মতো ঘটনাও ঘটছে। আর সন্তান সেগুলো দেখতে দেখতে বড় হচ্ছে। আল্লাহ তায়ালা এরশাদ করেন, ‘হে ঈমানদাররা! বলপূর্বক নারীদের উত্তরাধিকার গ্রহণ করা তোমাদের জন্যে হালাল নয় এবং তাদেরকে আটক রেখো না যাতে তোমরা তাদেরকে যা প্রদান করেছ তার কিয়দংশ নিয়ে নাও; কিন্তু তারা যদি কোনো প্রকাশ্য অশ্লীলতা করে! নারীদের সঙ্গে সদ্ভাবে জীবনযাপন কর। অতঃপর যদি তাদেরকে অপছন্দ কর, তবে হয়তো তোমরা এমন এক জিনিসকে অপছন্দ করছ, যাতে আল্লাহ, অনেক কল্যাণ রেখেছেন। (সুরা আন নিসা-১৯)।

লেখক : শিক্ষার্থী, তামিরুল মিল্লাত কামিল মাদ্রাসা, টঙ্গী

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত