ঢাকা সোমবার, ০৬ এপ্রিল ২০২৬, ২৩ চৈত্র ১৪৩২ | বেটা ভার্সন

পাহাড় আল্লাহর দেওয়া এক বিশেষ নেয়ামত

পাহাড় আল্লাহর দেওয়া এক বিশেষ নেয়ামত

মহান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা পৃথিবীতে কোনো কিছুই অহেতুক সৃষ্টি করেননি। এরই ধারাবাহিকতায় পাহাড় আল্লাহর এক বিস্ময়কর সৃষ্টি। পাহাড়ের অপরূপ সৌন্দর্য প্রতিটি ভ্রমণপিপাসু মানুষের মনোযোগ আকর্ষণ করে। ইসলামিক দৃষ্টিকোণ থেকেও এই পাহাড় মনোযোগ আকর্ষণ করার মতো একটি সৃষ্টি। আল্লাহ তায়ালা পৃথিবীতে পাহাড়ের ওজন স্থাপন করে প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষা করেছেন। কোরআন মজিদের অন্তত ১২টি সুরায় পাহাড়-পর্বতের বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা এসেছে। যেমন-‘আমি পৃথিবীকে বিস্তৃত করেছি, তাতে পর্বতমালা স্থাপন করেছি, আর আমি তাতে সব কিছু উদ্গত করেছি সুপরিমিতভাবে।’ (সুরা হিজর : ১৯)। ‘আমি জমিনের ওপর সুদৃঢ় পর্বতমালা সৃষ্টি করেছি, যাতে তাদের নিয়ে পৃথিবী ঝুঁকে না পড়ে...।’ (সুরা আম্বিয় : ৩১)। আমি কি জমিনকে করিনি বিছানাসদৃশ ও পাহাড়গুলোকে পেরেকস্বরূপ? (সুরা নাবা : ৬-৭)। ‘তারা (মানুষ) কি পাহাড়ের প্রতি লক্ষ করে না? যে, কীভাবে তা স্থাপিত হয়েছে?’ (সুরা গাশিয়াহ : ৮৮)। ‘তিনি পৃথিবীর উপরিভাগে অটল পর্বতমালা সৃষ্টি করেছেন, আর তাতে কল্যাণ নিহিত রেখেছেন এবং চার দিনের মধ্যে তাতে খাদ্যের ব্যবস্থা করেছেন...।’ (সুরা হামিম সাজদাহ : ১০)।

আধুনিক বিজ্ঞানীদের মধ্যে ডা. ফ্রাংক প্রেস সর্বপ্রথম বলেছিলেন, পাহাড় হলো গোঁজ বা পেরেকের আকৃতির। ভাসমান খুঁটির মতো তা পৃথিবীর স্থিতিশীলতা রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। পাহাড়ের গভীর শিকড় পৃথিবীর অভ্যন্তরে প্রোথিত। তার মাত্র ১০ শতাংশ ওপরে আর ৯০ শতাংশই পানির নিচে।

বিজ্ঞানীদের ধারণা, পাহাড় সৃষ্টির আগে পৃথিবী অস্বাভাবিক উত্তপ্ত ছিল। পর্যায়ক্রমে তাপ বিকিরণের কারণে পৃথিবী ঠান্ডা হয়ে সংকুচিত হতে থাকে। ভূপৃষ্ঠের ভেতরের অতিরিক্ত চাপের কারণে তার কিছু অংশ ওপরের দিকে ভাঁজ হয়ে ফুলে উঠতে থাকে। এ প্রক্রিয়ায় পাহাড়-পর্বত সৃষ্টি হয়। ভূতত্ত্ববিদদের মতে, যে ভারি ভারি বৃহদাকার প্লেট পৃথিবীর ওপরের শক্ত স্তর সৃষ্টি করে, সেগুলোর নড়াচড়া আর সংঘর্ষের ফলেই উৎপত্তি ঘটে পর্বতমালার। দুটি প্লেট যখন পরস্পর ধাক্কা খায় তখন শক্তিশালী প্লেটটি অন্য প্লেটের নিচে গড়িয়ে চলে যায়। তখন ওপরের প্লেটটি বেঁকে গিয়ে পর্বত ও উঁচু উঁচু জায়গার জন্ম দেয়। নিচের স্তরটি ভূমির নিচে অগ্রসর হয়ে ভেতরের দিকে এক গভীর প্রসারণের জন্ম দেয়। এর মানে পর্বতের রয়েছে দুটি অংশ। ওপরে সবার জন্য দর্শনযোগ্য একটি অংশ থাকে। তেমনি নিচের দিকে গভীরে এর সমপরিমাণ বিস্তৃতি রয়েছে।

পর্বতগুলো ভূমির ওপরে ও নিম্নদেশে বিস্তৃত হয়ে পেরেকের মতো ভূপৃষ্ঠের বিভিন্ন প্লেটকে দৃঢ়ভাবে আটকে ধরে রাখে। ভূপৃষ্ঠের ওপরের অংশ বা ক্রাস্ট অবিরাম গতিশীল প্লেট নিয়ে গঠিত। পর্বতগুলোর দৃঢ়ভাবে ধরে রাখার বৈশিষ্ট্যই ভূপৃষ্ঠের ওপরের স্তরকে ধরে রাখে। এর মাধ্যমে ভূকম্পন প্রতিরোধ করে অনেকাংশে। অথচ এই ক্রাস্টের রয়েছে গতিশীল গঠন। পাহাড়ের গঠন সম্পর্কে বিজ্ঞানের দৃষ্টিভঙ্গি হচ্ছে, মহাদেশগুলোর যে অঞ্চল পুরু, যেখানে সারি সারি পর্বতমালা আছে, সে স্থানে ভূপৃষ্ঠের শক্ত স্তর বা ক্রাস্ট ম্যান্টলের ভেতরে গভীরে ঢুকে যায়।

হাদিসে এসেছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহ তায়ালা জমিন সৃষ্টি করলে তা নড়াচড়া শুরু করে, তিনি তখন পাহাড় সৃষ্টি করলেন। এর ফলে জমিনের স্থিতিশীলতা কায়েম হয়।’ (সুনান আত-তিরমিজি : ৩২৯১)। ‘আল্লাহতায়ালা শনিবার মাটি সৃষ্টি করেছেন, আর রোববারে পাহাড়-পর্বত।’ (বোখারি : ৬৯৬৫)।

পাহাড়ের গুরুত্ব বোঝাতে পবিত্র কোরআনে তুর পাহাড়ের নামে একটি সুরারও নামকরণ করা হয়েছে। পাহাড় কেটে ফেলা অথবা তা ধ্বংস করা কখনও একজন বিবেকবান ব্যক্তিত্বের পরিচয় হতে পারে না। একজন মোমিন হিসেবে আমাদের উচিত রাসুলুল্লাহ (সা.) এর সুন্নত অনুযায়ী পাহাড়কে ভালোবাসা। কারণ হাদিসে এসেছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘এই ওহুদ পাহাড় আমাদের ভালোবাসে, আমরাও ওহুদ পাহাড়কে ভালোবাসি।’ (বোখারি : ২/৫৩৬)।

লেখিকা : শিক্ষার্থী, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত