ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৮ অক্টোবর ২০২৬, ২৪ আশ্বিন ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

চীনের বাজারে বাংলাদেশের নতুন জানালা কুনমিং

* কক্সবাজার-কুনমিং সরাসরি ফ্লাইট চালুর উদ্যোগ * স্থায়ী প্রদর্শনকেন্দ্র ও গুদাম সুবিধা * কৃষি ও ফলপণ্যের বাজার সম্প্রসারণ * নতুন নতুন পণ্যের বাজার তৈরির সুযোগ রয়েছে
চীনের বাজারে বাংলাদেশের নতুন জানালা কুনমিং

চীনের বিশাল বাজারে বাংলাদেশের পণ্য রপ্তানি বাড়ানোর নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে দেশটির দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক শহর ও ইউনান প্রদেশের রাজধানী কুনমিং বাংলাদেশের জন্য চীনের বাজারে প্রবেশের নতুন দ্বার হতে পারে। স্থায়ী প্রদর্শনকেন্দ্র ও গুদাম সুবিধা, কৃষি ও ফলপণ্যের বাজার সম্প্রসারণ এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলায় অংশগ্রহণ— সব মিলিয়ে কুনমিংকে ঘিরে বাংলাদেশের রপ্তানিকারকদের সামনে নতুন সুযোগ তৈরি হয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হতে পারে সরাসরি আকাশ যোগাযোগ। কক্সবাজার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে কুনমিংয়ে সরাসরি ফ্লাইট চালুর উদ্যোগের কথা জানিয়েছেন বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত। এটি চালু হলে পর্যটনের পাশাপাশি ব্যবসা-বাণিজ্য, বিনিয়োগ, শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক যোগাযোগও সহজ হবে।

কুনমিংয়ে স্থায়ী প্রদর্শনকেন্দ্র : বাংলাদেশের জন্য বড় সুযোগগুলোর একটি হলো কুনমিংয়ে স্থায়ী পণ্য প্রদর্শনকেন্দ্র ও গুদাম সুবিধা পাওয়া। ইউনান প্রদেশের বাণিজ্য বিভাগ বিনামূল্যে এ সুবিধা দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে। ইপিবি সূত্রে জানা গেছে, কুনমিংয়ের একটি বিপণিবিতানে বাংলাদেশি পণ্য প্রদর্শন ও বিক্রির জন্য প্রায় ২ হাজার বর্গফুটের প্রদর্শনকেন্দ্র এবং এর পাশে প্রায় ২ হাজার বর্গফুটের গুদাম বিনামূল্যে দেওয়ার কথা রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোকে (ইপিবি) জানিয়েছে চীন সরকার। একই বিপণিবিতানে আরও কয়েকটি দেশের পণ্যের জন্য স্থায়ী জায়গা রয়েছে।

গত বছরের মে মাসে ইউনান প্রদেশের বাণিজ্য বিভাগের লানচাং-মেকং উপ-আঞ্চলিক অর্থনৈতিক ও বাণিজ্য উন্নয়ন কেন্দ্রের উপ-পরিচালক লিউ জিয়ের নেতৃত্বে একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল ঢাকা সফর করে। তারা বাংলাদেশের পণ্য প্রদর্শন ও বিক্রির জন্য বিনামূল্যে কেন্দ্র ও গুদাম দেওয়ার প্রস্তাব করে। এর ধারাবাহিকতায় গত বছরের ডিসেম্বরে চীনের ইউনান প্রদেশের টংদে কুনমিং প্লাজায় আয়োজিত ফল উৎসবে স্থায়ী পণ্য প্রদর্শন ও গুদামের জন্য ইপিবি এবং ইউনান প্রদেশের বাণিজ্য বিভাগের মধ্যে সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষর হয়। ওই উৎসবে বাংলাদেশের ৯ জন ফল উৎপাদক ও রপ্তানিকারক অংশ নেন।

ইপিবি জানিয়েছে, প্রদর্শনকেন্দ্র ও গুদামের পাশাপাশি ইউনানের নির্ধারিত অনলাইন কমোডিটি সিটিতে বিনামূল্যে প্রবেশের সুযোগ থাকবে। ফলে বাংলাদেশি রপ্তানিকারকেরা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে পণ্য প্রদর্শন ও বিক্রি করতে পারবেন। তাজা ও দ্রুত পচনশীল কৃষিপণ্যের দ্রুত শুল্ক খালাসের সুবিধাও থাকছে।

কৃষি ও ফলপণ্যে সম্ভাবনা : কুনমিংয়ে কৃষি ও ফলপণ্যের বাজার সম্প্রসারণেও বাংলাদেশ ইতিমধ্যে কাজ শুরু করেছে। গত আগস্টে অনুষ্ঠিত মেকং-লানচান ফল উৎসবে বাংলাদেশের কয়েকটি প্রতিষ্ঠান অংশ নেয়। তাজা ও শুকনো ফলসহ বিভিন্ন কৃষিপণ্য সেখানে প্রদর্শন করা হয়। এতে চীনা ক্রেতা ও আন্তর্জাতিক ব্যবসায়ীদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের সুযোগ তৈরি হয়। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় জানায়, কুনমিংয়ে ফল উৎসবে দ্বিতীয়বারের মতো সহ-আয়োজক হিসেবে অংশ নিয়েছে বাংলাদেশ। কৃষি বাণিজ্য সম্প্রসারণ, রপ্তানি সহযোগিতা, ব্যবসায়িক নেটওয়ার্কিং ও নতুন বাজার অনুসন্ধান ছিল এ আয়োজনের অন্যতম লক্ষ্য।

বাড়ছে চীনে রপ্তানি : রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, জুলাই-সেপ্টেম্বরে চীনে বাংলাদেশের রপ্তানি গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৯ দশমিক ৩৩ শতাংশ বেড়ে ২২ কোটি ৫৪ লাখ ১০ হাজার মার্কিন ডলারে দাঁড়িয়েছে। গত বছরের একই সময়ে এর পরিমাণ ছিল ২০ কোটি ৬১ লাখ ৮০ হাজার ডলার।

ইপিবির ভাইস চেয়ারম্যান মোহাম্মদ হাসান আরিফ বলেন, 'চীন একটি বিশাল বাজার। সেখানে নতুন নতুন পণ্যের বাজার তৈরির সুযোগ রয়েছে।' চীনের বাজারে পণ্য বহুমুখীকরণের ওপর ইপিবি গুরুত্ব দিচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, দেশটির বিশাল ভোক্তা বাজার ও ক্রমবর্ধমান চাহিদা বাংলাদেশের রপ্তানিকারকদের জন্য নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছে।

ইপিবির সহযোগিতায় কয়েকটি বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠান ১০ম চীন-দক্ষিণ এশিয়া এক্সপো এবং ৩০তম চায়না কুনমিং আমদানি-রপ্তানি মেলা ২০২৬-এ অংশ নিয়েছে। এসব আয়োজনে পণ্য প্রদর্শনের পাশাপাশি সম্ভাব্য ক্রেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ ও বাজারের চাহিদা বোঝার সুযোগ পাচ্ছেন রপ্তানিকারকেরা।

হাসান আরিফ বলেন, রপ্তানি বাড়াতে পণ্যের মান, সংশ্লিষ্ট দেশের বিধিবিধান পরিপালন, সময়মতো সরবরাহ এবং বাজারের চাহিদা সম্পর্কে সঠিক ধারণা থাকা জরুরি। ইপিবি বাণিজ্য মেলা, ব্যবসায়ী প্রতিনিধি দল, বাজার অনুসন্ধান ও প্রচারমূলক কার্যক্রমের মাধ্যমে রপ্তানিকারকদের সহায়তা করছে বলেও জানান তিনি।

বাণিজ্য বড়, রপ্তানি কম : চীন বর্তমানে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বাণিজ্য অংশীদার। সর্বশেষ ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশটির সঙ্গে বাংলাদেশের পণ্য বাণিজ্য হয়েছে ২ হাজার ২৯৬ কোটি মার্কিন ডলারের। এর মধ্যে চীন থেকে বাংলাদেশ আমদানি করেছে ২ হাজার ২১৪ কোটি ডলারের পণ্য। বিপরীতে রপ্তানি করেছে মাত্র ৮২ কোটি ডলারের পণ্য। চীন ২০২০ সালে ৯৭ শতাংশ বাংলাদেশি পণ্যের জন্য শুল্কমুক্ত বাজারসুবিধা চালু করে। পরে ২০২৪ সালে প্রায় সব পণ্যে সে সুবিধা দেওয়া হয়। তারপরও চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য মূলত আমদানিনির্ভর।

বাংলাদেশ-চায়না চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (বিসিসিসিআই) সভাপতি মোহা. খোরশেদ আলম বলেন, 'এটি বাংলাদেশের রপ্তানি খাতের জন্য সুসংবাদ। এটি আমাদের জন্য বিরাট সুযোগ।'

সরাসরি আকাশ যোগাযোগের সম্ভাবনা : কুনমিংয়ের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ বাড়াতে কক্সবাজার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ফ্লাইট চালু হলে নতুনমাত্রা যোগ হতে পারে। একদিকে বঙ্গোপসাগরের কক্সবাজার, অন্যদিকে পাহাড়ঘেরা কুনমিং— দুই পর্যটন গন্তব্যের সরাসরি সংযোগ ব্যবসা ও পর্যটন উভয় ক্ষেত্রেই কার্যকর হতে পারে। চীনের ইউনান প্রদেশ বাংলাদেশের তুলনামূলকভাবে কাছের অঞ্চল। সরাসরি ফ্লাইট চালু হলে ব্যবসায়ী, বিনিয়োগকারী, শিক্ষার্থী, গবেষক ও পর্যটকদের যাতায়াত সহজ হবে। এতে ব্যবসায়িক যোগাযোগ ও বিনিয়োগের সুযোগও বাড়তে পারে।

চীনের বাজারে বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের বাণিজ্যঘাটতি কমাতে হলে শুধু শুল্কসুবিধা যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন বাজারে স্থায়ী উপস্থিতি, পণ্যের বহুমুখীকরণ এবং ক্রেতার সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ। কুনমিংয়ে প্রদর্শনকেন্দ্র ও গুদাম সুবিধা সেই সুযোগ তৈরি করছে। কৃষি ও খাদ্যপণ্যসহ নতুন পণ্যের বাজার তৈরি এবং সরাসরি আকাশ যোগাযোগ— দুই উদ্যোগ কাজে লাগাতে পারলে কুনমিং বাংলাদেশের জন্য চীনের বিশাল বাজারে প্রবেশের একটি কার্যকর বাণিজ্যিক প্রবেশদ্বার হয়ে উঠতে পারে।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত