প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ২৫ জুন, ২০২০
নবীজি (সা.) এর পবিত্র জবানে জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত ও উম্মতের মামু হিসেবে উপাধিপ্রাপ্ত প্রখ্যাত সাহাবি মুয়াবিয়া বিন আবু সুফিয়ান বিন হারব বিন উমাইয়া (রা.)। উপনাম আবু আবদুর রহমান। উপাধি আমিরুল মুমিনিন, মালিকুল ইসলাম। ৬০৮ খ্রিষ্টাব্দ মোতাবেক হিজরিপূর্ব ১৫ সালে মক্কায় জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা আবু সুফিয়ান ও ওসমান (রা.) এর পিতা আফফান বিন আবুল আস দু’জন আপন চাচাতো ভাই। দু’জনের প্রপিতামহের নাম উমাইয়া। মুয়াবিয়া (রা.) ছিলেন ইসলামি শাসনব্যবস্থার ষষ্ঠ খলিফা এবং উমাইয়া শাসনামলের [৪১-৬০ খ্রি.] প্রথম খলিফা।
তিনি ছিলেন সৎসাহসী, সত্যবাদী, ওহি লেখক, বীর পুরুষ, রাজনীতিবিদ, অভিজাত কুরাইশ বংশীয় একজন সম্মানিত ন্যায়বিচারক। তিনি নবী (সা.) এর শ্যালক; উম্মুল মুমিনিন উম্মে হাবিবা (রা.) এর বৈমাত্রেয় ভাই। উম্মে হাবিবার মায়ের নাম সাফিয়্যা বিনতে আবুল আস। মুয়াবিয়ার মায়ের নাম হিনদা বিনতে উতবা, যিনি ইসলাম গ্রহণের আগে হামজা (রা.) এর কলিজা বের করে চিবিয়েছিলেন। হোদায়বিয়ার সন্ধির পর তিনি ইসলাম গ্রহণ করে গোপন রেখেছিলেন। ৮ হিজরিতে মক্কা বিজয়ের সময় নিজের মুসলমান হওয়ার কথা প্রকাশ করেন।
তার জন্য রাসুলুল্লাহ (সা.) দোয়া করেছিলেন, ‘হে আল্লাহ, মুয়াবিয়ার পেট ইলম দিয়ে ভরে দিন।’ (তারিখে কাবির : ৮/৬৯)। ‘হে আল্লাহ, তাকে কিতাবের জ্ঞান ও হিসাববিজ্ঞান শিক্ষা দিন। রাষ্ট্রক্ষমতায় তাকে প্রতিষ্ঠিত করুন।’ (তাবারানি : ১৬৪১১)। ‘হে আল্লাহ, মুয়াবিয়াকে হেদায়েতের দিশারি ও হেদায়েতপ্রাপ্ত বানিয়ে দিন। তার উসিলায় মানুষকে হেদায়েত দান করুন।’ (তিরমিজি : ৩৮৪২)।
ওমর (রা.) তাকে জর্ডানের গভর্নর বানিয়েছিলেন। তার ভাই ইয়াজিদ বিন আবু সুফিয়ান (রা.)-কে বানিয়েছিলেন দামেশকের গভর্নর। ভাইয়ের মৃত্যু হলে তার কাছে দামেশকের দায়িত্বও এসে পড়ে। ওসমান (রা.) এর শাসনামলে তাকে পুরো সিরিয়ার গভর্নর করা হয়।
ওসমান (রা.) এর হত্যার বিচার নিয়ে আলী (রা.) এর সঙ্গে তার বিরোধ জনসমক্ষে প্রকাশ পায়। অতঃপর আলী (রা.) এর মৃত্যুর পর হাসান (রা.) এর সঙ্গে সন্ধি হলে ইসলামি খেলাফতের একচ্ছত্র ক্ষমতা মুয়াবিয়া (রা.) এর হস্তগত হয়। তিনি তখন দামেশককে রাজধানী করে উমাইয়া শাসনের গোড়াপত্তন করেন। ৬৮০ খ্রিষ্টাব্দ মোতাবেক ৬০ হিজরিতে তিনি দামেশকে ইন্তেকাল করেন।
তিনি যখন মৃত্যুশয্যায় শায়িত, স্ত্রী-সন্তান সবাইকে একত্র করলেন। বাঁদিকে বললেন, তোমার কাছে যে আমানত রেখেছিলাম তা আনো। বাঁদি একটা তালাবদ্ধ বাক্স আনল। সবাই মনে করল, এতে হয়তো মূল্যবান অলঙ্কারাদি সংরক্ষিত আছে। তিনি বললেন, তালা খোল। আজকের জন্য এতদিন এটা সংরক্ষণ করেছিলাম। তালা খোলা হলো। দেখা গেল রুমালে জড়ানো তিনটি কাপড়।
তিনি বললেন, এই জামাটা আমাকে রাসুলুল্লাহ (সা.) পরতে দিয়েছিলেন। বিদায় হজ থেকে ফিরে এ চাদরটা তিনি আমার গায়ে জড়িয়ে দিয়েছিলেন। কিছুক্ষণ চুপ থেকে আমি আবেদন করেছিলাম, আপনার পরনের লুঙ্গিটাও আমাকে দিয়ে দিন, ইয়া রাসুলুল্লাহ। তিনি বললেন, বাড়িতে গিয়ে তোমার কাছে ওটা পাঠিয়ে দেব, হে মুয়াবিয়া। তিনি পরে এটি পাঠিয়েছেন। কিছুক্ষণ পর তিনি নাপিত ডেকে চুল ও দাড়ির অতিরিক্ত অংশ কাটালেন। আমি বললাম, এগুলো আমাকে হাদিয়াস্বরূপ দিয়ে দিন।
তিনি আমাকে সেগুলোও দিয়ে দিলেন। এগুলো চাদরের কোনায় বেঁধে সংরক্ষণ করে রেখেছি। আমার মৃত্যুর পর তাঁর চাদর, জামা ও লুঙ্গি আমাকে কাফন হিসেবে পরাবে। তাঁর চুল ও দাড়ি আমার কপোল, ঠোঁট, মুখ ও বুকের ওপর ছিটিয়ে দেবে। এরপর আমাকে দয়াময় প্রভুর রহমতের ছায়াতলে সঁপে দেবে।
তিনি আশপাশের লোকজনকে নির্দেশ দিলেন, আমাকে বসাও। তারা তাকে ধরাধরি করে বসাল। তিনি বসে বসে আল্লাহর জিকির করতে লাগলেন। কেঁদে কেঁদে নিজেকে সম্বোধন করে বললেন, ‘হে মুয়াবিয়া, এখন যখন ভেঙে পড়েছ, পতন এসে গেছে, তুমি প্রভুর জিকির নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছ। অথচ যৌবনের উত্তাপ ছিল এর জন্য সবচেয়ে বেশি উপযুক্ত।’
অতঃপর তিনি কেঁদে কেঁদে দোয়া করতে লাগলেন, ‘ইয়া রব, ইয়া রব, কঠোর হৃদয়ের অধিকারী বৃদ্ধের ওপর একটু দয়া করুন। হে আল্লাহ, জীবনের পদস্খলন হ্রাস করুন। বিচ্যুতি ক্ষমা করুন। আপনার ধৈর্যের উসিলায় দয়া করুন এই অধমের ওপর, যে কিনা আপনি ছাড়া কারও কাছে আশাবাদী নয়। আপনি ছাড়া কারও ওপর সে কখনও ভরসা করে না।’ এরপর তার অশ্রুতে চোখ ভেসে গেল। তখনই শেষবারের মতো চক্ষুদ্বয় নির্মীলিত করলেন; আর কখনও খোলেননি। (সিয়ারু আলামিন নুবালা : ৫/১১৬, তারিখে দিমাশক : ৪/৩৪৯, তারিখে বাগদাদ : ১/৫৭৪, মুজামুস সাহাবা : ৫/৩৬৩, অসায়াল ওলামা : ৮৫)।
লেখক : ইমাম ও খতিব
টঙ্গী রেলওয়ে স্টেশন পুরাতন জামে মসজিদ