প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ১৫ অক্টোবর, ২০২০
সাদ বিন আবি ওয়াক্কাস (রা.) একজন প্রসিদ্ধ সাহাবি। তার বাবার নাম মালেক বিন উহাইব বিন আবদে মানাফ। উপনাম আবু ইসহাক। ৫৯৬ খ্রিষ্টাব্দ মোতাবেক হিজরি-পূর্ব ২৩ সালের দিকে মক্কার কোরাইশ বংশে তিনি জন্মগ্রহণ করেন।
তিনি ছিলেন নবী জননী আমেনার চাচাতো ভাইয়ের ছেলে। অর্থাৎ নবীজির নানা ওয়াহাব এবং সাদের দাদা উহাইব আপন দুই ভাই। এ হিসেবে নবীজি ও সাদ দু’জন মামাতো-ফুফাতো ভাই। কিন্তু আরবের রীতি অনুযায়ী নানার বংশধর হিসেবে নবীজি তাকে মামা বলে সম্বোধন করতেন। উল্লেখ্য, আমেনার আপন কোনো ভাইবোন ছিল না।
সাদ ছিলেন সৎসাহসী, সত্যবাদী, বীরপুরুষ, অভিজাত কোরাইশ বংশীয় একজন সম্মানিত ব্যক্তি। ইসলামের প্রথম যুগে তিনি মুসলমান হয়েছিলেন। মুহাজিরদের মধ্যে তার মৃত্যু সবার পরে হয়েছে।
বদর, ওহুদ, খন্দক, খায়বার, হোদায়বিয়ার সন্ধি, মক্কা বিজয়সহ সব যুদ্ধে তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সঙ্গে ছিলেন। তার নেতৃত্বে মাদায়েন, কুফা ও পারস্য বিজয় হয়েছে।
দীর্ঘদিন তিনি কুফা নগরির গভর্নরের দায়িত্ব পালন করেছেন। খলিফা ওমর বিন খাত্তাব গঠিত ছয় সদস্যবিশিষ্ট মজলিসে শূরার তিনি ছিলেন অন্যতম সদস্য। জান্নাতি প্রসিদ্ধ ১০ সাহাবির তিনি একজন।
প্রথম হিজরি সনে ওবায়দা বিন হারেসের নেতৃত্বে ইসলামের প্রথম অভিযান পরিচালিত হয়েছিল। এই প্রথম যুদ্ধের পতাকা সাদের হাতে উড়েছিল। তিনি ওই ভাগ্যবান, যিনি আল্লাহর পথে শত্রুর প্রতি প্রথম তির নিক্ষেপকারী।
সাদ ছিলেন একজন নিপুণ তিরন্দাজ। ওহুদ যুদ্ধে নবীজি সাদের হাতে একটি তির ধরিয়ে দিয়ে সাহস যুগিয়ে বলেছিলেন, ‘হে সাদ, তুমি তির নিক্ষেপ করো, তোমার ওপর আমার মা-বাবা উৎসর্গিত হোক।’ নবীজির মা-বাবা দু’জনই কারও জন্য উৎসর্গিত হওয়ার কথা তিনি এর আগে কাউকে বলেননি।
সাদ (রা.) বলেন, ওই নিক্ষিপ্ত তিরটি গিয়ে শত্রুর কপালে বিদ্ধ হলো। সে মাটিতে পড়ে গেলে তার সতর পর্যন্ত উন্মুক্ত হয়ে গেল। তা দেখে নবীজি এমনভাবে হাসতে লাগলেন যে, তাঁর মাড়ির দাঁত পর্যন্ত বেরিয়ে পড়ল।
তিনি বলেন, অনেক সময় আমরা নবীজির সঙ্গে যুদ্ধে যেতাম। কিন্তু আমাদের কাছে পর্যাপ্ত খাদ্য থাকত না অথবা তা শেষ হয়ে যেত। তখন লতাপাতা বা বাবলা গাছের পাতা ছাড়া আমাদের খাওয়ার মতো কিছু পেতাম না। ফলে সেসব খেতে খেতে আমাদের মলত্যাগ হতো ছাগলের লেদার মতো।
উম্মুল মুমিনিন আয়েশা (রা.) বলেন, এক রাতে নবীজি ঘুমাতে পারলেন না। তিনি বললেন, আমার কোনো নেককার সাহাবি যদি আজ রাতে পাহারা দিত, তাহলে হয়তো ঘুমাতে পারতাম।
আয়েশা বলেন, কিছুক্ষণ পর ঘরের বাইরে অস্ত্রের শব্দ শুনতে পেলাম। নবীজি বললেন, বাইরে কে?
আওয়াজ এলো, আমি সাদ বিন আবু ওয়াক্কাস। আপনাকে পাহারা দেওয়ার জন্য এসেছি ইয়া রাসুলুল্লাহ।
এরপর নবীজি নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে পড়লেন। তখন তার নাক ডাকার শব্দ শোনা যাচ্ছিল।
আবদুল্লাহ বিন ওমর, আবদুল্লাহ বিন আমর ও আনাস বিন মালেক (রা.) রেওয়ায়েত করেছেন, একদিন আমরা নবীজির সঙ্গে বসা ছিলাম। এমন সময় তিনি বললেন, এখন প্রথমে যে ব্যক্তি দরজা দিয়ে প্রবেশ করবে, সে হবে একজন ভাগ্যবান জান্নাতি।
কিছুক্ষণের মধ্যে প্রথমে যিনি প্রবেশ করলেন, তিনি ছিলেন সাদ বিন আবু ওয়াক্কাস।
সাদ (রা.) বলেন, পবিত্র কোরআনের এই আয়াত আমার ব্যাপারে নাজিল হয়েছে,
‘যদি মা-বাবা তোমাকে আমার সঙ্গে এমন বিষয়ে শরিক করতে চাপ সৃষ্টি করে, যার জ্ঞান তোমার নেই; তবে তুমি তাদের কথা মানবে না। কিন্তু দুনিয়ায় তাদের সঙ্গে ন্যায়সঙ্গতভাবে সহাবস্থান করবে।’ (সুরা লুকমান : ১৫)।
সাদ বলেন, আমি আমার মায়ের খুব অনুগত ছিলাম। যখন ইসলাম গ্রহণ করলাম, আমার মা তা মেনে নিতে পারলেন না।
তিনি বললেন, সাদ, তুমি কী এই নতুন ধর্ম গ্রহণ করেছ! অবশ্যই তোমাকে তা ছাড়তে হবে। অন্যথায় আমি পানাহার করব না। যতক্ষণ তুমি তা না ছাড়বে, আমি কিছুই খাব না, পান করব না। প্রয়োজনে এভাবে অনশন করে মরে যাব। তখন লোকজন তোমাকে ‘মায়ের খুনি’ বলে দোষারোপ করবে।
বললাম, মা, আপনি এমন সিদ্ধান্ত নেবেন না। আমি কিছুতেই এই ধর্ম ছাড়ব না।
এভাবে একদিন কাটল। তিনি কিছু খেলেন না, পান করলেন না। আরেক রাত এভাবে কেটে গেল। পরদিন সকালে তার খুব কষ্ট হতে লাগল। কিন্তু তিনি অনশন চালিয়ে যাবেন বলে নিজ সিদ্ধান্তে অটল থাকলেন।
আমি তার কাছে গিয়ে বললাম, আম্মাজান, আপনি জেনে রাখুন, আল্লাহর কসম, যদি আপনার দেহে ১০০টি প্রাণ হয়, আর একটা একটা করে সবগুলো বেরিয়ে যায়, তবুও আমি এই ধর্ম ত্যাগ করব না। এখন আপনি ইচ্ছা করলে পানাহার করতে পারেন অথবা নাও করতে পারেন।
সাদের এই দৃঢ়তা দেখে তার মা পানাহার করেছিল।
সাদ যখন মৃত্যুশয্যায়, তিনি নিজের ব্যবহৃত পুরোনো পশমি জুব্বাটি আনতে বললেন। তারপর ভাবাবেগে আপ্লুত হয়ে মনের দৃঢ় বিশ্বাস ও প্রত্যাশা নিয়ে বললেন, ‘এই জুব্বাটি পরে আমি বদর যুদ্ধে মুশরিকদের মোকাবিলা করেছিলাম। এটি আমার কাফনের কাজে ব্যবহার করবে। এ জন্যই এটি এতদিন পর্যন্ত যতœ করে রেখেছিলাম।’
তার ছেলে মুসয়াব বলেন, বাবার মৃত্যুশয্যায় তার মাথা আমার কোলে ছিল। তার অবস্থা দেখে আমি কাঁদতে লাগলাম। তিনি মাথা তুলে বললেন, ‘বেটা, তুমি কাঁদছ কেন?’
বললাম, আপনার অবস্থা দেখে নিজেকে ঠিক রাখতে পারছি না, তাই কাঁদছি।
তিনি বললেন, কেঁদো না। কারণ, আল্লাহ তায়ালা আমাকে আজাব দেবেন না। অবশ্যই আমি জান্নাতে যাব।
আল্লামা জাহাবি বলেন, আল্লাহ কসম, সাদ সত্য বলেছেন। জান্নাত তার জন্য সহজলভ্য। কেননা আল্লাহর রাসুল তাকে এ সুসংবাদ দিয়ে গেছেন।
৬৭৪ খ্রিষ্টাব্দ মোতাবেক ৫৫ হিজরিতে তিনি মদিনায় ইন্তেকাল করেন। (সিয়ারু আলামিন নুবালা : ১/৭৩, ইসাবা : ৩/৭৪, তারিখে বাগদাদ : ১/৪৭৬, মুজামুস সাহাবা : ২/২২৩, সাকবুল আবারাত : ১/১৪৫)।
লেখক : ইমাম ও খতিব, টঙ্গী রেলওয়ে স্টেশন পুরাতন জামে মসজিদ