প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ২৪ ডিসেম্বর, ২০২০
সৃষ্টিজীবকে কষ্ট দেওয়া ও অন্যায়ভাবে পীড়নের কারণ হওয়া মানুষের কাছে সবচেয়ে মারাত্মক ও ভীতিপ্রদ পন্থা। সেগুলো পাশবিক শয়তানি নীতি, যা বৈরিতাপ্রসূত বিরোধ ও আত্মঘাতী বিবাদ থেকে উৎপত্তি হয়। তাতে থাকে না মায়া-মমতার মূলনীতি, থাকে না স্নেহ ও করুণার মূল্যবোধ।
মানুষকে কষ্ট দেওয়া একটি নিন্দনীয় আচরণ। এটি তার অন্তরালে বহু ধ্বংসাত্মক বিষয় ও নানা অপরাধের সমাবেশ ঘটায়। কথা ও কাজে অন্যদের পীড়া দিতে মনের লাগাম ছেড়ে দেওয়ার কাজটি শুধু প্রবৃত্তির অনুসারী দুর্বল ঈমানের অধিকারী লোক থেকেই প্রকাশ পায়। অন্যায় তাকে তাড়িত করে। মন্দ ও অশ্লীল কাজের নির্দেশদাতা মন তাকে পরিচালিত করে।
হে মুসলিম, অন্যকে পীড়া দেওয়া থেকে নিজের মনকে সংযত রাখুন। নিজের প্রবৃত্তিকে আঘাত করা থেকে বারণ করুন। তাহলে দুনিয়া ও আখেরাতে নিরাপদ থাকবেন, সাফল্য লাভ করবেন। আমাদের রব বলেন, ‘যারা বিনা অপরাধে মোমিন পুরুষ ও মোমিন নারীদের কষ্ট দেয়, তারা মিথ্যা অপবাদ ও প্রকাশ্য পাপের বোঝা বহন করে।’ (সুরা আহযাব : ৫৮)। আল্লাহ আরও বলেন, ‘যে ব্যক্তি ভুল কিংবা গোনাহ করে, অতঃপর কোনো নিরপরাধের ওপর অপবাদ আরোপ করে, সে নিজের মাথায় বহন করে জঘন্য মিথ্যা ও প্রকাশ্য গোনাহ।’ (সুরা নিসা : ১১২)।
আমাদের রাসুল (সা.) আপন রবের কিতাব ব্যাখ্যা করেন, সুস্পষ্টভাবে এসব আয়াতের বিস্তারিত বিবরণ তুলে ধরেন। অন্যদের কষ্ট দেওয়া, নির্যাতন করা, তাদের প্রতি বৈরিতা প্রদর্শন করা ও তাদের ক্ষতি করার ক্ষেত্রে রাসুলের পক্ষ থেকে কঠোর হুঁশিয়ারি ও শক্ত নিষেধাজ্ঞার বিবরণ ধারাবাহিকভাবে বর্ণিত হয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘মুসলমান মুসলমানের ভাই। সে তার প্রতি অবিচার করবে না, তাকে অবজ্ঞা করবে না, তাকে অসহযোগিতা করবে না।’ (মুসলিম)। ইমাম মুসলিম (রহ.) রাস্তাঘাটের মধ্যখানে বসে থাকার নিষেধাজ্ঞা সংক্রান্ত হাদিসও উল্লেখ করেছেন। তাতে নবী করিম (সা.) রাস্তাঘাটে বসার হকগুলো বর্ণনা করেছেন। তার মধ্যে আছে কষ্টদায়ক বস্তু সরিয়ে ফেলা।
হে মুসলিম, নিজের পুণ্যগুলো সংরক্ষণ করুন। আপনার দ্বীনকে সুরক্ষিত রাখুন। অন্যকে পীড়া দেওয়া থেকে বিরত থাকুন। ঠিক তেমন হয়ে যান, যেমনটি ফুযাইল ইবনে ইয়াজ (রহ.) বলেছেন, হে মুসলিম, একটি কুকুর কিংবা একটি শূকরকে কষ্ট দেওয়াও তোমার জন্য বৈধ নয়, তাহলে যে সর্বশ্রেষ্ঠ সৃষ্টি তার বিষয়টি কেমন হতে পারে?
মুসলমানদের পীড়া দেওয়ার বিষয়ে সতর্ক করতে গিয়ে নবী করিম (সা.) প্রবল নিষেধাজ্ঞা ব্যক্ত করেছেন। তিনি বলেন, ‘তোমাদের মধ্যে যারা মুখে মুখে ইসলাম গ্রহণ করেছে, যাদের হৃদয়ে ঈমান পৌঁছেনি, তোমরা মুসলমানদের কষ্ট দিও না। তাদের তিরস্কার করো না। তাদের গোপন বিষয়াদির পেছনে লেগ না। কেননা যে ব্যক্তি তার মুসলিম ভাইয়ের গোপনীয়তা তালাশ করে আল্লাহ তার গোপনীয়তা তালাশ করেন। আর আল্লাহ যার গোপনীয়তা সন্ধান করেন তা ফাঁস করে দেন, যদিও সে তার বাড়ির অভ্যন্তরে থাকে।’ (তিরমিজি ও আবু দাউদ)।
কাতাদাহ (রহ.) বলেন, ‘তোমরা মোমিনকে কষ্ট দেওয়া থেকে বিরত থাক। কেননা আল্লাহ তাকে বেষ্টন করে রাখেন। এতে তিনি ক্রুদ্ধ হন।’ অন্যকে পীড়া দেওয়া থেকে বেঁচে থাকুন। নিজের মনকে বৈরিতা প্রদর্শন করতে বাধা দেন। তাহলে আপনি লাঞ্ছনা ও আঘাত থেকে নিরাপদ থাকবেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘প্রকৃত মুসলিম সেই যার জিহ্বা ও হাত থেকে অন্য মুসলমান নিরাপদ থাকে।’ (বোখারি)। তিনি আরও বলেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহ ও শেষ দিবসের প্রতি ঈমান এনেছে সে যেন তার প্রতিবেশীকে কষ্ট না দেয়।’ (বোখারি)। মুসলিম শরিফে আছে, ‘যে ব্যক্তির অনিষ্ট থেকে তার প্রতিবেশী নিরাপদ থাকে না, সে জান্নাতে যাবে না।’
আজকাল অনেকেই মুসলমানদের কষ্ট দিতে এবং তাদের শাসক শ্রেণি, আলেম-ওলামা, নাগরিকবৃন্দ ও সমাজকে বিব্রত করতে যাবতীয় দুর্বৃত্তিজাত কথাবার্তা ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত নানা প্রপাগা-া ছড়িয়ে আজকের বিশ্বে যোগাযোগমাধ্যম নামে পরিচিত বিভিন্ন চ্যানেলকে কাজে লাগাচ্ছে। এসব লোকের স্মরণ রাখা উচিত, আল্লাহ তাদের পর্যবেক্ষণ করছেন। সৎকর্ম ও মন্দকর্মগুলো মানদ-ে মাপা হবে। তাই তারা যেন নিজেদের রবের সঙ্গে সাক্ষাতের বিষয়ে সাবধানতা অবলম্বন করে। তারা তখন দেউলিয়া ও আশাহত অবস্থায় থাকবে। আমরা আল্লাহর কাছে ক্ষমা ও শান্তি প্রার্থনা করছি।
মুসলমানকে কষ্ট দেওয়া হারাম ও নিষিদ্ধ হওয়ার বিষয়টি শুধু ব্যক্তিবিশেষ বা তাদের কোনো সদস্যকে কষ্ট দেওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং মুসলমানকে পীড়া দেওয়ার বিষয়টি তাদের জনস্বার্থ ও যৌথ কল্যাণকেও আওতাভুক্ত করে। যেমন জনসম্পদ, চাকরি, পেশা ইত্যাদি। ইসলামের অন্যতম একটি মূলনীতি হচ্ছে, ‘না নিজের ক্ষতি করা যাবে, না অন্যের ক্ষতি করা যাবে।’
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা অভিসম্পাতকারী দুটি বিষয় থেকে সাবধান থাকবে : যে মানুষের চলার পথে কিংবা তাদের ছায়া দেওয়ার জায়গায় মলত্যাগ করে।’ (মুসলিম)।
নবী করিম (সা.) আরও বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি মুসলমানকে তাদের রাস্তাঘাটে কষ্ট দিয়েছে তার প্রতি তাদের অভিসম্পাত অবধারিত হয়ে গেছে।’ (তাবরানি)। তাই হে মোমিন, নিজে নিরাপদ থাকুন। নিজের জিহ্বা, কথা ও কাজকে মুসলমানদের কষ্ট দেওয়া থেকে সংযত রাখুন। তাহলে ইহকোল ও পরকালে সফল হবেন, সুখী হবেন।
হে মুসলিম ভাই, নিজের অন্তরকে মানুষকে কষ্ট দেওয়া থেকে মুক্ত রাখতে অভ্যস্ত কর। মনকে এ বিষয়ে দীক্ষিত কর। মনের ভেতর-বাহিরকে অন্যের প্রতি অবিচার করা থেকে পবিত্র রাখ।
জেনে রাখুন, অন্তরকে শিরক, বেদাত, শত্রুতা, হিংসা-প্রতিহিংসা থেকে মুক্ত রাখা মুক্তি লাভের অন্যতম একটি উপায়, এটি জান্নাতবাসীর একটি গুণ। আল্লাহ নিজের বান্দা ও বন্ধু ইবরাহিম (আ.) সম্পর্কে বলেন, যা তিনি নিজের রবের কাছে দোয়ায় বলেছিলেন, ‘পুনরুত্থান দিবসে আমাকে লাঞ্ছিত করো না, যে দিবসে ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি কোনো উপকারে আসবে না; কিন্তু যে সুস্থ অন্তর নিয়ে আল্লাহর কাছে আসবে।’ (সুরা শুআরা : ৮৭-৮৯)। জান্নাতবাসী গুণের অধিকারী হন। ‘তাদের অন্তরে যে ক্রোধ ছিল, আমি তা দূর করে দেব। তারা ভাই ভাইয়ের মতো সামনাসামনি আসনে বসবে।’ (সুরা হিজর : ৪৭)।
মুসলমানের হৃদয়কে ঘৃণা, হিংসা-বিদ্বেষ, প্রতিহিংসা ও অন্যকে কষ্ট দেওয়া থেকে মুক্ত রাখার বিশাল প্রতিদান ও মর্যাদার সুস্পষ্ট বিবরণ সংবলিত বহু বিশুদ্ধ হাদিস বর্ণিত হয়েছে। সেসব হাদিসের একটি হলো এক আনসারি লোকের গল্প, যার জন্য নবী করিম (সা.) জান্নাতের সাক্ষ্য দিয়েছেন। আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনুল আস (রা.) লোকটির বিষয়ে অনুসন্ধান চালাতে তার কাছে দিন-রাত থাকেন। তিনি তার সৎকর্ম বলতে দেখতে পেলেন সে রাত জেগে কোনো ইবাদত করে না, তবে যখন সে তার বিছানায় জেগে একটু শব্দ করে ওঠে এবং পাশ বদল করে তখন সে আল্লাহকে স্মরণ করে, আল্লাহু আকবার বলে। আর এক পর্যায়ে ফজরের নামাজ পড়তে ওঠে। তিনি তাকে ভালো কথা ছাড়া কিছুই বলতে শোনেননি। তারপর তিনি লোকটিকে জানালেন নবী করিম (সা.) তার ব্যাপারে যা বলেছেন। তখন লোকটি তার আমল সম্পর্কে বলল, আপনি যা দেখেছেন এতটুকুই। তবে, আমি কোনো মুসলিমের জন্য আমার মনের মধ্যে কোনো কিছু পোষণ করে রাখি না। কারও ভালো কিছু থাকলে সেটা নিয়ে হিংসা করি না, যেটা আল্লাহ তাকে দিয়েছেন। তখন আবদুল্লাহ (রা.) বললেন, ‘এটাই সেই জিনিস যা তোমাকে এ মর্যাদায় নিয়ে এসেছে আর আমরা সেটা পারি না।’
হে মুসলিম, হিংসা-বিদ্বেষ ও অন্যকে পীড়াদান থেকে অন্তরকে মুক্ত করতে, হৃদয়কে নিরাপদ রাখতে নিজের আত্মাকে দীক্ষিত কর, নিজের মনকে অভ্যস্ত কর। তাহলে ইহকালে ও পরকালে নিরাপদ থাকবে।
২৬ রবিউস সানি ১৪৪২ হিজরি মদিনার মসজিদে নববিতে প্রদত্ত জুমার খুতবার সংক্ষিপ্ত অনুবাদ
মাহমুদুল হাসান জুনাইদ