প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ১৫ জানুয়ারি, ২০২৬
পানি আল্লাহর দেওয়া সবচেয়ে বড় বড় নিয়ামতের একটি। পানি দিয়েই সব জীবের সৃষ্টি হয়েছে। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘আর প্রাণবান সব কিছু সৃষ্টি করলাম পানি থেকে।’ (সুরা আম্বিয়া : ৩০)। পানি হলো জীবনের মূল ভরসা ও পরিবেশের এমন এক উপাদান- যা সব প্রাণীর প্রয়োজন। মানুষ, পশু ও গাছ পানি ছাড়া বাঁচতে পারে না। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘তিনিই আকাশ থেকে ভারী বর্ষণ করেন। এতে তোমাদের জন্য রয়েছে পানীয় ও তা থেকে জন্মায় উদ্ভিদ, যাতে তোমরা পশুচারণ করে থাক। তিনি তোমাদের জন্যে এর দ্বারা জন্মান শস্য, যায়তুন, খেজুর গাছ, দ্রাক্ষা এবং সর্বপ্রকার ফল। অবশ্যই এতে চিন্তাশীল সম্প্রদায়ের জন্যে রয়েছে নিদর্শন।’ (সুরা নাহল : ১০-১১)।
পানি হলো পবিত্রতা অর্জনের মাধ্যম। আর পবিত্রতা ঈমানের অর্ধেক এবং নামাজ ও বহু ইবাদতের শর্ত। পানি দিয়ে অজু ও গোসল করা হয়। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘তিনিই স্বীয় অনুগ্রহের প্রাক্কালে সুসংবাদবাহী রূপে বায়ু প্রেরণ করেন। আমি আকাশ থেকে বিশুদ্ধ পানি বর্ষণ করি- যা দিয়ে আমি মৃত ভূখণ্ডকে সঞ্জীবিত করি এবং আমার সৃষ্টির মধ্যে বহু জীবজন্তু ও মানুষকে তা পান করাই।’ (সুরা ফুরকান : ৪৮-৪৯)।
বৃষ্টি আল্লাহর সবচেয়ে বড় নিয়ামতগুলোর একটি, যার জন্য কৃতজ্ঞ হওয়া জরুরি। আল্লাহ বলেন, ‘এরা যখন হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়ে তখনই তিনি বৃষ্টি প্রেরণ করেন ও তাঁর করুণা বিস্তার করেন। (সুরা শুরা : ২৮)। আল্লাহ বৃষ্টির জন্য নির্দিষ্ট সময় ও নির্ধারিত পরিমাণ ঠিক করে রেখেছেন এবং তার একটি মৌসুম আছে, যা মানুষ অপেক্ষা করে। আল্লাহ বলেন, ‘তুমি কি দেখ না, আল্লাহ সঞ্চালিত করেন মেঘমালাকে, পরে এদের একত্র করেন এবং পরে পুঞ্জীভূত করেন, এরপর তুমি দেখতে পাও, এর মধ্য থেকে নির্গত হয় বারিধারা; আকাশস্থিত শিলাস্তূপ থেকে তিনি বর্ষণ করেন শিলা এবং এটা দিয়ে তিনি যাকে ইচ্ছা আঘাত করেন এবং যাকে ইচ্ছা তার ওপর হতে এটা অন্য দিকে ফিরিয়ে দেন। মেঘের বিদ্যুৎ ঝলক দৃষ্টিশক্তি প্রায় কেড়ে নেয়।’ (সুরা নুর : ৪৩)।
যখন বৃষ্টি দেরিতে আসে, তখন মানুষের কষ্ট ও ভয় বেড়ে যায়। দুর্ভিক্ষ ও সংকট নেমে আসে। ফসল ও গাছপালা নষ্ট হয়ে যায়। ঝর্ণা ও কূপ শুকিয়ে যায়। আল্লাহ বলেন, ‘বল, তোমরা ভেবে দেখেছ কি যদি পানি ভূগর্ভে তোমাদের নাগালের বাইরে চলে যায়, তখন কে তোমাদেরকে এনে দেবে প্রবহমান পানি?’ (সুরা মুলক : ৩০)।
মানুষের ওপর অনেক সময় দুর্ভিক্ষ এসেছে, এমনকি নবীরা তাদের মধ্যেই ছিলেন। তখন তারা মানুষকে বিপদ দূর করার উপায় শিখিয়েছেন। আল্লাহ কিছু জাতিকে বহু বছরের দুর্ভিক্ষ ও ফল-ফসলের ঘাটতিতে আক্রান্ত করেছেন, যাতে তারা শিক্ষা গ্রহণ করে। তবে আমাদের নবী মুহাম্মাদ (সা.) আল্লাহর কাছে দোয়া করেছিলেন, যেন তার উম্মতকে ব্যাপক দুর্ভিক্ষ দিয়ে ধ্বংস না করা হয়। আর মহান আল্লাহ তার দোয়া কবুল করেছেন। যখন আল্লাহ তাঁর বান্দাদের কল্যাণ চান, তখন রহমত নেমে আসে। মানুষ সাহায্য পায়, দেশ ও ভূমি পানিতে সিক্ত হয়। জমিন তার সৌন্দর্য ধারণ করে ও সুশোভিত হয়। আনন্দের লক্ষণ প্রকাশ পায় ও সর্বত্র খুশি ছড়িয়ে পড়ে।
নিয়ামতের শুকরিয়া আদায় করা ফরজ। এটি নিয়ামত টিকে থাকার ও স্থায়ী হওয়ার কারণ। এই নিয়ামতের পূর্ণ শুকরিয়া হলো, খাঁটি প্রশংসা ও একনিষ্ঠ আনুগত্যের মাধ্যমে তা গ্রহণ করা। কারণ, যখন নিয়ামতের শুকরিয়া করা হয় তখন তা বাড়ে ও স্থায়ী হয়, আর যখন অকৃতজ্ঞতা করা হয় তখন তা কেড়ে নেওয়া হয় ও শেষ হয়ে যায়। আল্লাহ বলেন, ‘স্মরণ কর, তোমাদের প্রতিপালক ঘোষণা করেন, ‘তোমরা কৃতজ্ঞ হলে তোমাদের অবশ্যই অধিক দেব আর অকৃতজ্ঞ হলে অবশ্যই আমার শাস্তি হবে কঠোর।’ (সুরা ইবরাহিম : ৭)। অতএব, তোমরা আল্লাহকে স্মরণ করো, তিনি তোমাদের স্মরণ করবেন। তাঁর নিয়ামত ও অনুগ্রহের জন্য তাঁর শুকরিয়া আদায় করো, তিনি তোমাদের আরও বাড়িয়ে দেবেন। আমরা এই মহান রহমতের জন্য আল্লাহর প্রশংসা করি, যার উপকার সবার মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে ও যার কল্যাণ ব্যাপক হয়েছে। প্রয়োজনের সময় এই বৃষ্টি এসেছে, ফলে ফসল সতেজ হয়েছে ও হৃদয়গুলো আনন্দিত হয়েছে। আমরা তাঁর কাছে তাঁর অনুগ্রহ অব্যাহত থাকার দোয়া করি। আল্লাহর প্রশংসা যে, তিনি আমাদের ওপর বৃষ্টি ও বারিধারা প্রেরণ করেছেন এবং এতে বরকত, কল্যাণ ও উপকার রেখেছেন। তিনি এর মাধ্যমে দেশ ও জনপদকে সিক্ত করেছেন, নির্ধারিত পরিমাণে মৃত জমিনকে জীবিত করেছেন ও হৃদয়কে সতেজ করেছেন। হে আল্লাহ! আপনার জন্যই এমন প্রশংসা, যা আপনার মহিমার উপযোগী ও আপনার অসংখ্য নিয়ামতের সমতুল্য। আপনার প্রশস্ত রহমত, মহান দয়া ও অফুরন্ত দানের জন্য আপনারই প্রশংসা। আপনি যে দান উজাড় করে দিয়েছেন, যে নিরাপত্তা ও আচ্ছাদন দিয়েছেন, যে নিয়ামত দিয়েছেন ও যে দয়া করেছেন সেগুলোর জন্য আপনারই প্রশংসা। আমরা আপনার প্রশংসা গুণে শেষ করতে পারি না। আপনি নিজেই যেমন নিজের প্রশংসা করেছেন, আপনি তেমনই। নিয়ামতের শুকরিয়ার একটি অংশ হলো, এই নিয়ামতকে আল্লাহর দান বলে স্বীকার করা, তাঁর আনুগত্যের মাধ্যমে গ্রহণ করা, তাঁর সন্তুষ্টির কাজে তা ব্যয় করা এবং এটিকে তওবা ও আল্লাহর দিকে ফিরে আসার মাধ্যম বানানো। গুনাহ ও অবাধ্যতা ছেড়ে দেওয়া, আল্লাহর কাছে ফিরে যাওয়া ও বেশি বেশি ইসতেগফার করা- নিয়ামত স্থায়ী থাকার, বরকত নেমে আসার ও বৃষ্টি বর্ষণের কারণ। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘বলেছি, তোমাদের প্রতিপালকের ক্ষমা প্রার্থনা কর, তিনি তো মহাক্ষমাশীল, তিনি তোমাদের জন্যে প্রচুর বৃষ্টিপাত করবেন, তিনি তোমাদের সমৃদ্ধ করবেন ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততিতে এবং তোমাদের জন্যে স্থাপন করবেন উদ্যান ও প্রবাহিত করবেন নদী-নালা।’ (সুরা নুহ : ১০-১২)।
বৃষ্টি আল্লাহর মহান নিদর্শনগুলোর একটি। এটি তাঁর অসীম ক্ষমতা ও নিখুঁত প্রজ্ঞার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। বৃষ্টি নামার মধ্যে শিক্ষা ও উপদেশ রয়েছে। এতে এমন এক ঈমানি বার্তা আছে, যা হৃদয়কে জাগিয়ে তোলে এবং মৃত্যু, ধ্বংস, পুনরুত্থান, হিসাব ও প্রতিদানের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। অনুর্বর ও শুকনো জমিনে বৃষ্টির মাধ্যমে মৃতের পর জীবন আসা, শুষ্কতার পর সবুজ গাছ জন্মানো ও কষ্টের পর স্বাচ্ছন্দ্য ফিরে আসা চোখে দেখা প্রমাণ, যা মৃত্যু ও পুনরুত্থানের কথা মনে করিয়ে দেয়। আগে জমিন ছিল নিস্তেজ ও অনুর্বর; তারপর তা কেঁপে ওঠে, ফুলে ওঠে ও সব ধরনের সুন্দর উদ্ভিদ বের করে। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘তাঁর একটি নিদর্শন এই যে, তুমি ভূমিকে দেখতে পাও শুষ্ক ঊষর, এরপর যখন আমি এতে বারি বর্ষণ করি তখন তা আন্দোলিত ও স্ফীত হয়। যিনি ভূমিকে জীবিত করেন তিনিই তো মৃতের জীবনদানকারী। নিশ্চয় তিনি সর্ববিষয়ে সর্বশক্তিমান।’ (হামিম সিজদা : ৩৯)। মহান আল্লাহ আরও বলেন, ‘হে মানুষ, পুনরুত্থান সম্পর্কে যদি তোমরা সন্দিগ্ধ হও তবে অবধান করো আমি তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছি মাটি থেকে, তার পর শুক্র থেকে, তারপর ‘আলাকা’ থেকে, তারপর পূর্ণাকৃতি বা অপূর্ণাকৃতি গোশতপি- থেকে- তোমাদের কাছে ব্যক্ত করার জন্য, আমি যা ইচ্ছা করি তা এক নির্দিষ্ট কালের জন্যে মাতৃগর্ভে স্থিত রাখি, তার পর আমি তোমাদের শিশুরূপে বের করি, পরে যাতে তোমরা পরিণত বয়সে উপনীত হও। তোমাদের মধ্যে কারও কারও মৃত্যু ঘটান হয় এবং তোমাদের মধ্যে কাউকেও কাউকেও প্রত্যাবৃত্ত করা হয় হীনতম বয়সে, যার ফলে এরা যা কিছু জানত সে সম্পর্কে এরা সজ্ঞান থাকে না। তুমি ভূমিকে দেখ শুষ্ক, এরপর এতে আমি বারি বর্ষণ করলে তা শস্য-শ্যামলা হয়ে আন্দোলিত ও স্ফীত হয় এবং উদ্গত করে সর্বপ্রকার নয়নাভিরাম উদ্ভিদ; এটা এইজন্যে যে, আল্লাহ সত্য। তিনিই মৃতকে জীবন দান করেন এবং তিনি সর্ববিষয়ে শক্তিমান। আর কিয়ামত আসবেই, এতে কোনো সন্দেহ নেই। কবরে যারা আছে তাদেরকে নিশ্চয়ই আল্লাহ উত্থিত করবেন।’ (সুরা হজ : ৫-৭)।
অনেক মানুষ ছুটি ও অবকাশের সময় ভ্রমণ, সফর, খোলা মাঠে বের হওয়া ও পার্ক-বিনোদনকেন্দ্রে ঘুরতে যেতে পছন্দ করে। একজন মুসলিমের জন্য উচিত হলো, এমন কিছু করতে চাইলে সে যেন এ বিষয়ে শরিয়তের বিধান জেনে নেয় ও ইসলামের আদব-আচরণ মেনে চলে। ভ্রমণের বিধান ও শিষ্টাচারের মধ্যে রয়েছে, পরিবারের লোকদের বিদায় জানানো, যানবাহনে উঠা ও বের হওয়ার দোয়া পড়া। ভ্রমণের আদবের মধ্যে রয়েছে, সৎ সঙ্গী নির্বাচন করা ও একা সফর না করা। কারণ সঙ্গী থাকলে ইবাদতে সাহায্য হয় এবং শয়তান ও ভুল থেকে নিরাপদ থাকা যায়। ভ্রমণের আরেকটি আদব হলো, ফরজ নামাজ সময়মতো আদায় করা।
(২০-০৭-১৪৪৭ হিজরি মোতাবেক ০৯-০১-২০২৬ খ্রিষ্টাব্দে মসজিদে নববিতে প্রদত্ত জুমার খুতবার সংক্ষেপিত অনুবাদ করেছেন জামিয়া ইসলামিয়া ইসলামবাগের মুহাদ্দিস- আবদুল কাইয়ুম শেখ)