প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ২৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬
পবিত্র কোরআনে আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘হে ঈমানদারগণ, তোমাদের ওপর রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেমন ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের আগেরকার মানুষের ওপর, যেন তোমরা তাকওয়া (আল্লাহভীতি) অর্জন করতে পার।’ (সুরা বাকারা : ১৮৩)। এ আয়াত প্রমাণ করে, রোজার বিধান এই প্রথম নয়, আগের আসমানি ধর্মের অনুসারীদের ওপরও রোজার বিধান ছিল। সুতরাং বর্তমান সময়ের বিভিন্ন ধর্ম, যার সঙ্গে আসমানি ধর্ম বা ঐশী বাণীর যোগ রয়েছে, তাদের মধ্যেও রোজার প্রচলন থাকা বিচিত্র নয়। তবে এই বিধান সব নবী ও তার অনুসারীদের ওপর ছিল কি না- সে বিষয়ে আল্লামা আলুসি (রহ.) বলেন, ‘এখানে ‘মিন কাবলিকুম (আগেরকার মানুষের ওপর)’ দিয়ে নবী আদম (আ.) থেকে ইসা (আ.) পর্যন্ত সব যুগের মানুষকে বোঝানো হয়েছে।’ (ফখরুদ্দিন রাজি, তাফসিরে রাজি, সংশ্লিষ্ট আয়াতের ব্যাখ্যা)। শাইখুল হিন্দ মাহমুদুল হাসান (রহ.) বলেন, ‘রোজার বিধান আদম (আ.) থেকে বর্তমানকাল পর্যন্ত ধারাবাহিক চলে এসেছে। পরে রমজানের রোজা ফরজ হলে পূর্বেকার বিধান রহিত হয়ে যায়।’ (ফাওয়াইদে উসমানি ও তাফসিরে রুহুল মাআনি, সংশ্লিষ্ট আয়াতের ব্যাখ্যা)।
আদম (আ.)-এর রোজা : নবী আদম (আ.) রোজা রাখতেন; যদিও তার রোজার ধরন কেমন ছিল তা সঠিকভাবে বলা যায় না। বেহেশতে নিষিদ্ধ ফল খাওয়ার পর তওবা করে ৩০ দিন রোজা রেখেছিলেন তিনি। এরপর তার সন্তানদের ওপরও ৩০টি রোজা ফরজ হয়। (ফাতহুল বারি, খণ্ড: ৪, পৃষ্ঠা: ১০২-১০৩)। চান্দ্রমাসের আইয়ামে বিজের (প্রতি মাসের ১৩, ১৪ এবং ১৫ তারিখের রোজা) তিনদিন রোজাও তার জন্য ফরজ ছিল বলে জানা যায়।
যেমন ছিল নুহ (আ.)-এর রোজা : নুহ (আ.)-এর যুগে প্রতিমাসে তিনটি রোজা পালনের বিধান ছিল; ওই মধ্যবর্তী তিনদিনই। তাফসিরবিদ কাতাদা (রহ.) বলেন, ‘মাসে তিন দিন রোজা রাখার বিধান নুহ (আ.)-এর যুগ থেকে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর যুগ পর্যন্ত বলবৎ ছিল। শেষকালে রমজানের মাসব্যাপী রোজার বিধান দেওয়া হলে মাসিক তিনটি রোজার বিধান রহিত হয়। অবশ্য কোরআন ও বাইবেলে নুহ (আ.)-এর যে জীবনবৃত্তান্ত পেশ করা হয়েছে, তাতে তার রোজা পালনের উল্লেখ নেই। (তাফসিরে ইবনে কাসির, খণ্ড: ২, পৃষ্ঠা: ৫০১)।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘নুহ (আ.) ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহার দিন ছাড়া সারা বছর রোজা রাখতেন।’ (ইবনে মাজাহ : ১৭১৪)। বলা হয়ে থাকে, ইবরাহিম (আ.)-এর যুগে ৩০টি রোজার বিধান ছিল। ইমাম তাবারি (রহ.) বলেন, ‘নবী ইবরাহিম (আ.)-এর ওপর রমজানের ত্রিশ রোজা ফরজ ছিল।’ (তাফসিরে রাজি)।
মুসা (আ.)-এর রোজা পালন : আসমানিগ্রন্থ তাওরাত অবতীর্ণ হওয়ার আগে মুসা (আ.) ৪০ দিন রোজা রেখেছেন মর্মে বর্তমান বাইবেলের ওল্ডটেস্টামেন্টেও স্বীকারোক্তি পাওয়া যায়, মুসা (আ.) তুর পাহাড়ে ৪০ দিন পর্যন্ত ক্ষুধা-পিপাসার ভেতর দিয়ে অতিবাহিত করেছেন। (বাইবেল, যাত্রাপুস্তক : ৩৪-২৮)।
ইহুদিদের জন্য ৪০টি রোজা রাখা উত্তম বিবেচনা করা হয়। এ ছাড়া তাদের অন্যান্য সহিফায় অন্যসব দিনের রোজার বিধানও বিস্তারিত রয়েছে। এর মধ্যে ৪০তম দিনটিতে তাদের ওপর রোজা রাখা অপরিহার্য; যা তাদের সপ্তম মাস তিশরিনের দশম (লেভান্টের দুটি গ্রেগরিয়ান মাসের নাম) তারিখে পড়ে। মক্কায় এসে ইহুদিরা হিসাব মিলিয়ে দেখে যে, সেটি আরবি হিসেবে মহররমের দশম দিবসে পড়ে; যাকে আশুরা বলে। ইহুদিরা এ দিনকে বলে, ইয়ম কিপুর।
হিব্রুতে ‘ইয়ম’ মানে দিন, ‘কিপুর’ অর্থ প্রায়শ্চিত্ত। তাওরাতে সেদিন রোজা রাখার বিষয়ে তাগিদ এসেছে। (বাইবেল, প্রথম শামুয়েল (৭ : ৬) ও জেরেমিয়া (৩৬ : ৬)। এ সময় তারা আগের সূর্যাস্ত থেকে পরের সূর্যাস্ত টানা ২৫ ঘণ্টা রোজা রাখে। ইসলামের আগে আরবের অন্যান্য অধিবাসীরাও এ রোজা সম্পর্কে জ্ঞাত ছিল।
মক্কার কুরাইশ সম্প্রদায় আশুরার রোজা রাখত এবং এ দিনে কাবাঘরে নতুন গিলাফ চড়ানো হতো। (বাইবেল, লেবিয় পুস্তক (১৬ : ২৯-৩১)। তবে মদিনায় বসবাসকারী ইহুদিরা পৃথকভাবে আশুরা উৎসব পালন করত।
আশুরার রোজা : আরেক বর্ণনায় জানা যায়, খায়বারের ইহুদিরা আশুরায় রোজা পালন করত এবং ঈদ উৎসবের মধ্য দিয়ে দিনটি উদযাপন করত। সেদিন তারা ইহুদি ললনাদের মূল্যবান অলংকার ও সাজসজ্জায় ভূষিত করত। (সহিহ বুখারি, খণ্ড: ১, পৃষ্ঠা: ১৬২)।
নবীজি (সা.) মদিনায় আগমন করার পরে এদিন রোজা রাখতে দেখে কারণ জিজ্ঞেস করেন। তারা বলেন, এ অতি উত্তম দিন। এ দিনে আল্লাহ তাআলা বনি ইসরাইলকে তাদের শত্রুর কবল থেকে নাজাত দান করেন, তাই এ দিনে মুসা (আ.) রোজা পালন করেন। নবীজি বলেন, মুসা (আ.)-এর বিষয়ে আমি তোমাদের অপেক্ষা অধিক হকদার। এরপর তিনি এ দিন রোজা পালন করেন এবং রোজা পালনের নির্দেশ দেন। (ইবনে মাজাহ : ১৭৩৪)। তবে তিনি সঙ্গে অন্তত একদিন অতিরিক্ত রাখতে বলেন, আগের দিন কিংবা পরের দিন। রমজানের রোজা ফরজ হওয়ার পরে এ রোজা নফল হয়ে যায়। (ইবনে মাজাহ : ১৭৩৭)।
আল্লাহর কাছে প্রিয় দাউদ (আ.)-এর রোজা : দাউদ (আ.) ছিলেন পরহেজগার রোজাদার। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহর কাছে দাউদ (আ.)-এর রোজা সর্বাধিক প্রিয়। কেননা, তিনি এক দিন রোজা রাখতেন এবং একদিন না রেখে থাকতেন।’ (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস: ১৭১২)।
যেমন ছিল ইসা (আ.)-এর রোজা : ইঞ্জিল পাওয়ার আগে ইসা (আ.) জঙ্গলে ৪০ দিন রোজা পালন করেছিলেন। (বাইবেল, মথি (৪ : ২)। বাইবেলে আছে, ‘জোহন—যিনি যিশুর সমসাময়িক ছিলেন, তিনিও রোজা রাখতেন এবং তার অনুসারীগণের মাঝেও রোজা রাখার রীতির প্রচলন ছিল। (বাইবেল, মার্ক (২ : ১৮)।
একবার অনুসারীরা তাকে জিজ্ঞেস করেন, আমরা অপবিত্র আত্মাকে কী করে বের করব? জবাবে তিনি বলেন, তা দোয়া ও রোজা ছাড়া অন্য কোনো উপায়ে বের হতে পারে না। (সিরাতে ইবনে হিশাম, খণ্ড: ৫, পৃষ্ঠা: ২৮৭-২৮৮)।
লোহিতসাগরে ফেরাউন নিমজ্জিত হওয়ার দিনও তারা রোজা রাখত। রোজা তাদের ওপর ফরজ ছিল। দীর্ঘ একটা সময় পর্যন্ত তারা তা নিয়মিত পালনও করে। কিন্তু কিছুকাল পর রোজার নির্ধারিত সময়টি প্রচণ্ড গরমের মৌসুমে এসে পড়ে। রোজা পালন তাদের জন্য কষ্টকর হয়ে পড়ে। বিভিন্ন দিকে সফর ও রোজগার কঠিন হয়ে যায়। এ নিয়ে তারা পরামর্শ সভার আয়োজন করে। ধর্মযাজক ও নেতৃবর্গের সম্মতিতে শীত ও গরমের মাঝামাঝি মৌসুমণ্ডবসন্তকালে রোজা পালন করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। এ-ও সিদ্ধান্ত হয়, এখন থেকে রোজার এ সময়টি অপরিবর্তিত থাকবে, আর কখনও পরিবর্তন করা হবে না। শরিয়ত প্রবর্তিত সিদ্ধান্তে পরিবর্তন আনার কাফফারা স্বরূপ, নির্ধারিত ত্রিশ দিনের রোজার সঙ্গে আরও ১০ দিন বাড়িয়ে ৪০ দিন করা হয়। বর্তমানকালেও খ্রিষ্টধর্মে রোজার প্রভাব বিদ্যমান। অনেক ধর্মপ্রাণ রোমান ক্যাথলিক খ্রিষ্টান ইস্টার সানডের আগের ৬ (ছয়) সপ্তাহ এই প্রথা পালন করেন, একে লেন্ট বলা হয়।
কেমন ছিল রোজা রাখার পদ্ধতি? : ইসলামপূর্ব সময়ে অবতীর্ণ রোজা- তা যে-ধর্মেরই হোক, তার সঙ্গে ইসলামণ্ডনির্ধারিত রোজার নিয়মণ্ডপদ্ধতির পরিষ্কার ব্যবধান রয়েছে। যদিও আমরা মোটের ওপর তেমন কিছুই জানি না যে, আদম, নুহ, ইবরাহিম, মুসা, ইসা (আ.) কিংবা অন্যান্য নবীদের সময়ে রোজা বলতে কী উদ্দেশ্য ছিল। তা কি শুধু পানাহার থেকে বিরত থাকা বোঝানো হতো, নাকি যৌনসম্ভোগও অন্তর্ভুক্ত ছিল? সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত নিরবধি ছিল, নাকি আরও খানিকটা কম কিংবা বেশি? যদিও সাইদ ইবনে জোবায়ের (রহ.) বলেন, ‘পূর্ববর্তী যুগে রোজার নির্ধারিত সময় ছিল ইসলামের শুরু যুগের মতো আঁধার থেকে নিয়ে পরবর্তী রাত পর্যন্ত।
কথা হলো, যদি শুধু পানাহার-বর্জন উদ্দেশ্য হয়ে থাকে, তবে বৌদ্ধধর্ম, কনফুসীয়, সনাতন, তাও কিংবা জৈনবাবাদে যে উপবাসের প্রচলন রয়েছে, তা থেকে রোজার সর্বজনীন ধর্মীয় বৈধতার একটা আন্তর্জাতিক সম্মতি পাওয়া যেতে পারে। বলা যেতে পারে, মানবশুদ্ধির জন্য আদিম যুগ থেকেই গোত্র, বর্ণ, সম্প্রদায় নির্বিশেষে রোজা প্রচলিত ছিল। ধরন ও প্রক্রিয়ার বিচারে তাতে সংখ্যা, নিয়মকানুন ও সময়রেখা ছিল ভিন্নতর। একমাত্র শোনা যায়, আদি পারস্যের ধর্ম ‘জরথুস্ত্রুবাদ’-এ উপবাস সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ছিল। তা হলেও বলা যায় যে, ইসলাম রোজার পূর্বপ্রচলিত ধারায় ব্যাপক সংস্কার সাধন করেছে এবং ধারণা ও বিধানগত বেশ কিছু পরিবর্তন এনেছে। যেমন ইহুদিদের দৃষ্টিতে রোজা ছিল বেদনা ও শোকের প্রতীক। ইসলাম এই হতাশাব্যঞ্জক ধারণাকে স্বীকার করেনি।
আবার কোনো কোনো প্রাচীন ধর্মমতে রোজা এক বিশেষ শ্রেণির জন্য পালনীয় ছিল। কিন্তু ইসলাম রোজাকে সব শ্রেণিবিভক্তি ও সীমাবদ্ধতা থেকে মুক্ত করে এক সর্বজনীন রূপ দান করেছে। ইসলামের বিধানে প্রত্যেক সক্ষম মুসলমানের জন্য রোজা রাখা ফরজ।
তা ছাড়া আগের উম্মতদের প্রতি নির্দেশ ছিল, এশার নামাজ আদায় করার পর যখন তারা শুয়ে যেত, তখন তাদের ওপর পানাহার ও স্ত্রী সহবাস হারাম হয়ে যেত। (তাফসিরে ইবনে কাসির, খণ্ড: ২, পৃষ্ঠা: ৫০১)। ইসলাম আসার পর সেখানে সাহরি ও সুবহে সাদিক সম্পর্কিত বিধান যোগ হয়েছে।