প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ০২ এপ্রিল, ২০২৬
পুণ্যের মাস রমজান আমাদের কাছ থেকে বিদায় নিয়েছে। রমজান বিদায় নেওয়ার পর সংযম ও সাধনার জীবন পরিহার করছে বহু মানুষ, ফিরে গেছে পূর্বের গোনাহমাখা জীবনের দিকে। অথচ মাহে রমজানের দাবি হলো, পাপমুক্ত যে জীবনের অনুশীলন মোমিনগণ রমজানে করেছিল, তা রমজানের পরেও অব্যাহত থাকবে এবং আল্লাহমুখী, ইবাদতমুখর যে সময় সে কাটিয়েছিল, তাতে কোনো ধরনের পরিবর্তন আসবে না। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘তুমি তোমার প্রতিপালকের ইবাদত করো মৃত্যু আসার আগ পর্যন্ত।’ (সুরা হিজর : ৯৯)। এখানে রমজান পরবর্তী মোমিনদের জীবন কেমন হওয়া উচিত, সে বিষয়ে আলোচনা করা হলো-
আল্লাহর ভয় ধারণ করা : দীর্ঘ ১ মাস রোজা আদায়ের প্রধান উদ্দেশ্য তাকওয়া বা আল্লাহভীতি অর্জন করা। আল্লাহ বলেন, ‘হে মোমিনরা, তোমাদের ওপর রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেমন ফরজ করা হয়েছিল পূর্ববর্তীদের ওপর; যেন তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পার।’ (সুরা বাকারা : ১৮৩)।
সুতরাং রমজান-পরবর্তী জীবনে যদি আল্লাহর ভয় অন্তরে থেকে যায়, তবে দীর্ঘ ১ মাসের সিয়াম সাধনা সার্থক বলে গণ্য হবে। আর আল্লাহভীতিই মোমিন জীবনে সাফল্যের মাপকাঠি। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘যে আল্লাহকে ভয় করে আল্লাহ তার পথ প্রশস্ত করে দেন এবং তাকে ধারণাতীত উৎস থেকে জীবিকা দান করেন।’ (সুরা তালাক : ২-৩)।
আমলের ধারাবাহিকতা রক্ষা করা : রমজান হলো মোমিনের জন্য ভালো কাজের প্রশিক্ষণ নেওয়ার মাস। সে এই মাসে তাকওয়া ও আত্মশুদ্ধি অর্জন এবং ভালো কাজ করা ও মন্দ কাজ পরিহারের অভ্যাস করবে; অতঃপর বছরের অবশিষ্ট দিনগুলোতে সে অনুযায়ী জীবনযাপন করবে। সুতরাং রমজান মাসে যেসব নেক আমল করা হতো তার ধারাবাহিকতা রক্ষা করতে হবে। মহানবী (সা.) আমলের ধারাবাহিকতা রক্ষায় উৎসাহিত করেছেন। আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, ‘নবী (সা.) বলেছেন, তোমরা সাধ্যানুযায়ী (নিয়মিত) আমল করবে। কেননা তোমরা বিরক্ত না হওয়া পর্যন্ত আল্লাহ প্রতিদান দেওয়া বন্ধ করেন না। মহান আল্লাহ ওই আমলকে ভালোবাসেন যা নিয়মিত করা হয়, যদিও তা পরিমাণে কম হয়। তিনি (সা.) কোনো আমল করলে তা নিয়মিত করতেন।’ (আবু দাউদ : ১৩৬৮)।
পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ মসজিদে আদায় করা : সমাজের অনেককে দেখা যায় রমজান মাসে মসজিদে গিয়ে জামাতের সঙ্গে নামাজ আদায় করে এবং রমজানের পর মসজিদের সঙ্গে সম্পর্ক রাখে না- এটি নিন্দনীয়। মসজিদে জামাতের সঙ্গে নামাজ আদায় করা সব সময়ের জন্য আবশ্যক। রাসুলুল্লাহ (সা.) সেসব মানুষের প্রতি তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন যারা মসজিদে উপস্থিত না হয়ে ঘরে নামাজ আদায় করে। তিনি বলেন, ‘যদি ঘরে নারী ও পরিবারের অন্য সদস্যরা না থাকত, তবে আমি এশার নামাজে দাঁড়াতাম এবং দুই যুবককে নির্দেশ দিতাম যারা (জামাতে অংশ না নিয়ে) ঘরে আছে তাদের পুড়িয়ে দিতে।’ (মুসনাদে আহমদ : ৮৭৯৬)।
পাপ কাজে ফিরে না যাওয়া : পাপ কাজ পরিহার করার পর আবার তাতে লিপ্ত হওয়া আল্লাহর দৃষ্টিতে অত্যন্ত নিন্দনীয়। আল্লাহ কোরআনের একাধিক স্থানে এই শ্রেণির মানুষের প্রতি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন। ইরশাদ হয়েছে, ‘তোমরা সেই নারীর মতো হইয়ো না, যে তার সুতা মজবুত করে পাকানোর পর তা খুলে নষ্ট করে দেয়।’ (সুরা নাহল : ৯২)।
আল্লাহর ওপর ভরসা করা : আল্লাহর ওপর ভরসা করার অর্থ হলো- দুনিয়া ও আখেরাতের যাবতীয় বিষয়ের কল্যাণ লাভ ও ক্ষতি থেকে বাঁচার জন্য সঠিকভাবে অন্তর থেকে আল্লাহর ওপর নির্ভর করা। বান্দা তার প্রতিটি বিষয় আল্লাহর ওপর সোপর্দ করবে। ঈমানে এই দৃঢ়তা আনবে যে, দান করা না করা, উপকার-অপকার একমাত্র তিনি ছাড়া আর কারো অধিকারে নেই।
আল্লাহতায়ালা মোমিন বান্দাদের তাওয়াক্কুলের প্রতি উদ্বুদ্ধ করে পবিত্র কোরআনে অনেক আয়াত উল্লেখ করেছেন। কোরআনে আছে, ‘তোমরা যদি মোমিন হয়ে থাকো, তবে আল্লাহর ওপরেই ভরসা করো। ’ (সূরা মায়েদা: ২৩)।
হাদিসেও তাওয়াক্কুলের গুরুত্ব ও তার প্রতি উদ্বুদ্ধ করে অনেক হাদিস বর্ণিত হয়েছে। হজরত ওমর বিন খাত্তাব (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা যদি সঠিকভাবে আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল করতে তবে তিনি তোমাদের রিজিক দান করতেন, যেমন পাখিকে রিজিক দান করে থাকেন। যারা খালি পেটে সকালে বের হয় এবং পেট ভর্তি হয়ে রাতে ফিরে আসে। ’ (আহমাদ ও তিরমিজি)
বিপদাপদে আল্লাহর সাহায্য প্রার্থনা : আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘অবশ্যই আমি তোমাদের পরীক্ষা করব ভয়ভীতি, ক্ষুধার কষ্ট, জানমাল ও ফসলের ক্ষতিসাধন করে। যারা ধৈর্যের সঙ্গে এর মোকাবিলা করে, তুমি ওই সমস্ত ধৈর্যশীলদের জান্নাতের সুসংবাদ দান করো। যখন তাদের ওপর বিপদণ্ডআপদ আসে তখন যেন তারা বলে, অবশ্যই আমরা আল্লাহতায়ালার জন্য। একদিন অবশ্যই তার কাছে আমাদের ফিরে যেতে হবে।’ (সুরা বাকারা : ১৫৫-৫৬)।
বিপদে-আপদে কোনোভাবেই নিরাশ হওয়া যাবে না। বরং ঈমানের বলে বলীয়ান হয়ে আল্লাহর প্রতি আরও বেশি ভরসা করতে হবে। যখনই কোনো বিপদ আসবে তার কাছে সাহায্য চাইতে হবে। নিজেও সেই বিপদকে কাটিয়ে উঠার জন্য চেষ্টা করতে হবে। সেই চেষ্টাও যেন দ্বীনের পথে থেকে হয়। তাগুতের পথে নয়। কারণ মোমিন-মুসলমানের জন্য দুনিয়ার দুঃখ-কষ্ট ও আনন্দ-বিনোদন সব কিছুতেই কল্যাণ, যদি সে আল্লাহর দেখানো পথ ও মতের ওপর অটল থেকে দুনিয়ার জিন্দেগি পরিচালনা করে।
হালাল রোজগার করা : উপার্জনের রয়েছে দুটি দিক। বৈধ ও অবৈধ। অবৈধভাবে উপার্জিত খাবার খেয়ে ইবাদত করলে সাওয়াব পাওয়া যাবে না এমনকি ওই ইবাদতের মাধ্যমে জান্নাতেও যাওয়া যাবে না বলে হাদিসে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করা হয়েছে। উপার্জন হালাল না হলে বান্দার দোয়াও কবুল হয় না। রাসুল (সা.) বলেন, ‘যে শরীর হারাম পেয়ে হৃষ্ট পুষ্ট হয়েছে, তা জান্নাতে যাবে না।’ (মুসনাদে আবি ইয়ালা : ১/৮৪)।
এ জন্য ইসলাম হালাল উপার্জনের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করার নির্দেশ দেয়। এমনকি ফরজ ইবাদতের পর হালাল পন্থায় উপার্জন করাকে ফরজ সাব্যস্ত করা হয়েছে। হাদিসে রাসুল (সা.) বলেন, ‘ফরজ আদায়ের পর হালাল পন্থায় উপার্জনও ফরজ।’ (বায়হাকি)।
কাউকে জুলুম না করা : মানুষের ওপর অত্যাচার, জুলুম, নিপীড়ন, নির্যাতন এমন অপরাধ, দুনিয়ার জীবনেই মানুষ যার শাস্তি পেয়ে যায়। শুধু মানুষ নয়, পশুপাখির ওপরও জুলুম করা হারাম। জুলুম ভয়াবহ অপরাধ। এই অপরাধে দুনিয়ার শাস্তির পাশাপাশি পরকালে কঠিন শাস্তি দেওয়া হবে। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘জালিমরা শিগগিরই জানবে, কোথায় তারা প্রত্যাবর্তন করবে।’ (সুরা : শুআরা : ২২৭)।
তাই সবলদের উচিত দুর্বলদের সঙ্গে ভাই ভাই হয়ে মিলেমিশে থাকা। মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘মুসলমান মুসলমানের ভাই। সে তার ওপর জুলুম করবে না কিংবা তাকে জালিমের হাতে সোপর্দ করবে না। যে ব্যক্তি তার ভাইয়ের অভাব পূরণ করবে, আল্লাহ তার অভাব পূরণ করে দেবেন। যে ব্যক্তি কোনো মুসলমানের বিপদ দূর করবে, আল্লাহ কেয়ামতের দিন তার বিপদ দূর করে দেবেন। যে ব্যক্তি কোনো মুসলমানের দোষ গোপন রাখবে, আল্লাহ কেয়ামতের দিন তার দোষ গোপন রাখবেন।’ (বোখারি : ২২৬৫)।
নফল নামাজ আদায় করা : ফরজ নামাজের পর নফল নামাজের রয়েছে অনেক গুরুত্ব। নবীজি (সা.) ও সাহাবায়ে কেরাম নফল নামাজের খুব গুরুত্ব প্রদান করতেন। নবীজি সুস্থতাণ্ডঅসুস্থতা, সফর-নিবাস, নিরাপত্তা-যুদ্ধ সব সময় ফরজের পাশাপাশি যত্নবান ছিলেন নফল নামাজেও।নফল নামাজে বহুবিধ উপকারের কথাও বর্ণনা করেছেন। নফল নামাজ মহান আল্লাহর ভালোবাসা পাওয়ার মাধ্যম। এর মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য অর্জন করা যায়। ফরজে হয়ে যাওয়া ত্রুটির ক্ষতিপূরণ হয়। নিজের আমলনামায় অতিরিক্ত ককিছু নেকি অর্জন হয়। গোনাহগুলো মিটে যায় এবং সাওয়াব দিগুণ হয়। ইহকাল-পরকালে উঁচু মর্যাদা লাভ হয় এবং অন্তর পরিশুদ্ধ হয়।
তাহাজ্জুদের নামাজ আদায় করা : হজরত আয়েশা (রা.) বলেন, ‘রাসুল (সা.) রাতে নামাজ আদায় করতেন; এমনকি তার পা ফুলে যেত। আমি তাকে বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি এতো কষ্ট করেন কেন? অথচ আল্লাহ আপনার পূর্বাপরের সব গোনাহ ক্ষমা করে দিয়েছেন। তিনি বলেন, আমি কি আল্লাহর কৃতজ্ঞ বান্দা হবো না।’ (বোখারি : ৪৮৩৭)।
তাহাজ্জুদের প্রতি হজরত রাসূল (সা.)-এর তীব্র আকর্ষণ বিবৃত হয়েছে পবিত্র কোরআনেও। হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) সারারাত তাহাজ্জুদে কাটিয়ে দিতেন। তাই আল্লাহতায়ালা পরম মমতায় বলেছেন, হে চাদরাবৃত! আপনি রাতের সামান্য অংশে জাগরণ করুন। অর্ধরাত বা তার চেয়ে কম অথবা (সামান্য) বেশি। আপনি কোরআন তেলাওয়াত করুন ধীরস্থিরভাবে। (সুরা মুজ্জাম্মিল : ১-৪)
রমজানে তাহাজ্জুদের প্রতি হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর আকর্ষণ আরও বেড়ে যেতো। তিনি রমজানে অধিক পরিমাণ তাহাজ্জুদের নামাজ আদায় করতেন। বিশেষত রমজানের শেষ দশকে তিনি ইতেকাফ করতেন এবং রাত্রী জাগরণ করতেন। এ সময় তিনি তার পরিবারের সদস্যদেরও রাতে আমলের জন্য ডেকে দিতেন। হজরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, ‘রমজানের শেষ দশকে হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) রাত জেগে ইবাদত করতেন, তার পরিবারকে ডেকে দিতেন এবং লুঙ্গি শক্ত করে বেঁধে নিতেন।’ (বোখারি)।
কোরআন তেলাওয়াত করা : রাসুলুল্লাহ (সা.) থেকে পরবর্তী যুগের সব মনীষী রমজান মাসে কোরআন চর্চা বাড়িয়ে দিলেও বছরের কোনো সময় তারা কোরআন চর্চা থেকে একেবারেই বিরত থাকতেন না। ইসলামি আইনজ্ঞরা কোরআন থেকে বিমুখ হওয়াকে হারাম বলেছেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজে কোরআন পরিত্যাগকারীদের বিরুদ্ধে আল্লাহর দরবারে অভিযোগ করেছেন। ইরশাদ হয়েছে, ‘রাসুল বললেন, হে আমার প্রতিপালক! আমার সম্প্রদায় এই কোরআনকে পরিত্যাজ্য মনে করে।’ (সুরা ফোরকান : ৩০)।
নফল রোজা রাখা : রমজানের পর রাসুলুল্লাহ (সা.) শাওয়াল মাসে গুরুত্বের সঙ্গে ছয় রোজা পালন করতেন। একাধিক বিশুদ্ধ হাদিস দ্বারা শাওয়ালের ছয় রোজার মর্যাদা ও ফজিলত প্রমাণিত। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি রমজানের রোজা রাখল, অতপর তার সঙ্গে সঙ্গে শাওয়াল মাসের ছয়টি রোজা রাখল, সে যেন পূর্ণ বছরই রোজা রাখল।’ (মুসলিম : ১১৬৪)। এ ছাড়া মহানবী (সা.) আইয়ামে বিজ তথা চন্দ্র মাসের ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখ রোজা রাখতেন। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, আমার বন্ধু (সা.) আমাকে তিনটি বিষয়ে নির্দেশ দিয়েছেন, প্রতি মাসে তিন দিন করে সওম পালন করা, দুই রাকাত সালাতুদণ্ডদুহা আদায় এবং ঘুমানোর আগে বিতর নামাজ পড়া।’ (বোখারি : ১৯৮১)।