প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ০৯ জুলাই, ২০২৬
মৃত ব্যক্তির গোসল, কাফন, জানাজা ও দাফন যথাসম্ভব দ্রুত সম্পন্ন করতে বলেছে ইসলাম। বিভিন্ন হাদিসে মৃত্যুর পর দাফন পর্যন্ত কাজগুলো বিলম্ব করতে নিষেধ করা হয়েছে। হাদিসে আছে, ‘তালহা ইবনে বারা (রা.) অসুস্থ হলে হজরত মুহাম্মদ (সা.) তাকে দেখতে গেলেন। এরপর বললেন, আমি তালহার মধ্যে মৃত্যুর আলামত দেখতে পাচ্ছি। সে মারা গেলে আমাকে জানাবে। তোমরা দ্রুত কাফন-দাফনের ব্যবস্থা করবে। কেননা, কোনো মুসলমানের লাশকে পরিবারের লোকদের মাঝে আটকে রাখা উচিত নয়।’ (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৩১৫৯)
আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) বলেন, ‘আমি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে বলতে শুনেছি, তোমাদের মধ্যে কোনো ব্যক্তি মারা গেলে তোমরা তাকে আটকে রেখ না। তাকে দ্রুত দাফন করে দিও।’ (আলমুজামুল কাবির, তাবরানি, হাদিস: ১৩৬১৩)
সহিহ বুখারির এক হাদিসে জানাজা নামাজের পর লাশ দাফনের জন্য নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে বিলম্ব না করার নির্দেশ এসেছে। তিনি বলেছেন, ‘জানাজাকে দ্রুত নিয়ে যাও। কেননা, মৃত ব্যক্তি যদি নেক লোক হয়, তবে তো তাকে তার শুভ পরিণতির দিকেই নিয়ে যাচ্ছে। আর যদি সে মন্দ হয়, সে ক্ষেত্রে তোমাদের ঘাড় থেকে আপদ সরিয়ে দিচ্ছে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১৩১৫)
ইসলামি বিশেষজ্ঞরা মৃতের গোসল, কাফন-দাফন ও জানাজাসংক্রান্ত যাবতীয় কাজ দ্রুত সম্পন্ন করাকে উত্তম বলেছেন এবং অপ্রয়োজনে বিলম্ব করাকে মাকরুহ (অপছন্দনীয়) বলেছেন।
স্বাভাবিক সময়ের ভেতরে মৃতের জানাজা-দাফনের প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়ে গেলে মৃতের ওলি বা অভিভাবক উপস্থিত লোকদের নিয়ে জানাজা পড়ে দ্রুত দাফন করে দেবে। এ সময়ের ভেতর কোনো আত্মীয়স্বজন বা বিশেষ কোনো ব্যক্তির উপস্থিত হওয়া সম্ভব না হলে তার জন্য বিলম্ব করা সমীচীন হবে না। অবশ্য ওলি দূরে অবস্থানের কারণে স্বাভাবিক সময়ের ভেতরে উপস্থিত হওয়া সম্ভব না হলে, সে ক্ষেত্রে ওলির জন্য উচিত তো এটাই যে, তার জন্য অপেক্ষা করতে না বলে দ্রুত দাফন করে দিতে বলবে। এতে শরিয়তের হুকুমের প্রতি যথাযথ আমল হবে। তবে ওলি অপেক্ষা করতে বললে তার জন্য বিলম্ব করার অবকাশ আছে। অবশ্য এ ক্ষেত্রেও এ পরিমাণ বিলম্ব করার অবকাশ নেই, যার কারণে মরদেহের মধ্যে পরিবর্তন হওয়ার শঙ্কা হয়। এত বেশি বিলম্ব করা ওলি বা অন্য কারও জনই জায়েজ নয়।
ঢাকা থেকে প্রকাশিত আবুল হাসান মুহাম্মাদ আবদুল্লাহ সম্পাদিত মাসিক আল-কাউসারে এক ফতোয়ায় বলা হয়েছে, ‘দাফনে দীর্ঘ বিলম্বের জন্য মরদেহের পরিবর্তন ও বিকৃতি রোধে লাশকে হিমাগারে রাখা, ফর্মালিন মেডিসিন ইত্যাদি পচনরোধক ওষুধ দিয়ে রাখা জায়েজ নয়, বরং লাশের স্বাভাবিক অবস্থা পরিবর্তন হওয়ার আগেই দাফন করে দেওয়া জরুরি। এর অধিক বিলম্ব করা গুনাহ।’
আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) বলেছেন, ‘কোনো মুমিন ব্যক্তিকে তার মৃত্যুর পর কষ্ট দেওয়া তেমন, যেমন জীবিত অবস্থায় তাকে কষ্ট দেওয়া।’ (মুসান্নাফে ইবনে আবি শাইবা, হাদিস: ১১৯৯০)
এ সংক্রান্ত হাদিস ও আসারের ব্যাখ্যায় আল্লামা ইবনে হাজার (রহ.) বলেন, জীবিত ব্যক্তি যেসব বস্তু দিয়ে আরাম বোধ করে, মৃত ব্যক্তি তা দিয়ে আরাম বোধ করে। ইবনুল মালাক (রহ.) বলেন, ‘মৃত ব্যক্তি কষ্টদায়ক বস্তু দিয়ে কষ্ট পায়। (মিকাতুল মাফাতিহ, খণ্ড: ৪, পৃষ্ঠা: ১৭০)। মৃত ব্যক্তিকে হিমাগারে রাখা মূলত তাকে কষ্ট দেওয়ারই নামান্তর। এসব কাজ থেকে বিরত থাকা অপরিহার্য।
জানাজা দাফনে বিলম্ব করার প্রবণতা যতই ব্যাপক হোক না কেন, তা গ্রহণযোগ্য ও অনুসরণীয় নয়। বরং সবকিছুর ঊর্ধ্বে শরিয়তের হুকুমকে প্রাধান্য দিতে হবে। মৃতের জানাজা-দাফনে অংশ নিতে পারাটাই জীবিতদের একমাত্র কতর্ব্য নয়। বরং দাফনের পরও মৃত ব্যক্তির জন্য জীবিতদের অনেক করণীয় থাকে। যেমন, মৃতের জন্য দোয়া করা, কবর জিয়ারত করা ও শরিয়া-তরিকায় সওয়াব পাঠানোর কাজ করা।
কোরআন ও হাদিসে লাশ দাফনের জন্য এক দিন, তিন বা নির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়নি। ইসলামির মূলনীতি হলো, যত দ্রুত সম্ভব দাফন করা, বিলম্ব না করা এবং শয়িরতসম্মত বা অনিবার্য কারণ থাকলে প্রয়োজন অনুযায়ী বিলম্ব করা।
এ ছাড়া ময়নাতদন্ত বা আইনি তদন্ত, নিকটাত্মীয়ের অপেক্ষা, বিদেশ থেকে মেহমান আনা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা জরুরি পরিস্থিতি বিলম্বের অনুমতি আছে। তবে বিলম্ব না করাই উত্তম।
জানাজার নামাজের নিয়ত
মনের ইচ্ছায় নিয়ত। তবে মনে মনে এভাবে নিয়ত করা যেতে পারে- ‘আমি জানাজার ফরজে কেফায়া নামাজ চার তাকবিরসহ এই ইমামের পেছনে কিবলামুখী হয়ে আদায়ের নিয়ত করছি।’
জানাজা নামাজের নিয়ম
কান পর্যন্ত হাত উঠিয়ে প্রথম তাকবিরের পর হাত বেঁধে সানা পড়তে হবে। দ্বিতীয় তাকবিরের পর পড়তে হবে দরুদ শরিফ। এরপর তৃতীয় তাকবিরের পর দোয়া পড়ে চতুর্থ তাকবির দিয়ে সালাম ফিরিয়ে নামাজ শেষ করতে হবে। প্রতিটি তাকবিরে ‘আল্লাহু আকবার’ বলতে হবে।
সানা হলো-
উচ্চারণ: সুবহানাকা আল্লাহুম্মা ওয়া বিহামদিকা ওয়া তাবারাকাসমুকা, ওয়া তাআলা জাদ্দুকা ওয়া জাল্লা সানাউকা ওয়া লা ইলাহা গাইরুকা।
অর্থ: হে আল্লাহ, সব প্রশংসা আপনার। আপনি সব ধরনের ত্রুটিবিচ্যুতি থেকে পবিত্র। আপনার নাম মঙ্গল ও বরকতপূর্ণ। আপনার মহত্ত্ব অতি বিরাট, আপনার প্রশংসা অতি মহত্ত্বপূর্ণ এবং একমাত্র আপনি ছাড়া আর কোনো প্রভু নেই।
এরপর দ্বিতীয় তাকবির বলে দরুদ পড়তে হবে। এই তাকবিরে হাত উঠানো যাবে না। দরুদটি হলো-
উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা সাল্লি আলা মুহাম্মাদিন, ওয়া আলা আলি মুহাম্মাদ, কামা সাল্লাইতা আলা ইবরাহহিমা, ওয়া আলা আলি ইবরাহিম, ইন্নাকা হামিদুম্মাজিদ। আল্লাহুম্মা বারিক আলা মুহাম্মাদিন, ওয়া আলা আলি মুহাম্মাদ, কামা কারাকতা আলা ইবরাহিমা ওয়া আলা আলি ইবরাহিম, ইন্নাকা হামিদুম্মাজিদ।
অর্থ: হে আল্লাহ, মুহাম্মদ এবং তাঁর পরিবার-পরিজনদের ওপর এমনভাবে রহমত বর্ষণ করো, যেমনভাবে করেছ ইবরাহিম ও তাঁর পরিবার-পরিজনের ওপর। নিশ্চয় তুমি মহান এবং প্রশংসিত। হে আল্লাহ, মুহাম্মদ এবং তাঁর পরিবার-পরিজনদের ওপর এমনভাবে বরকত দাও, যেমনভাবে দিয়েছ ইবরাহিম ও তাঁর পরিবার-পরিজনের ওপর। নিশ্চয় তুমি মহান এবং প্রশংসিত।
জানাজা নামাজের দোয়া
এরপর তৃতীয় তাকবির বলে মৃত ব্যক্তির জন্য দোয়া করতে হবে। তখনও হাত উঠানো যাবে না। মৃত ব্যক্তি প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ বা নারী হলে এ দোয়া পড়তে হবে-
উচ্চারণ: আল্লাহুম্মাগফির লি হাইয়িনা ওয়া মাইয়িতিনা, ওয়া শাহিদিনা ওয়া গায়েবিনা ওয়া সগিরিনা ওয়া কাবিরিনা ওয়া জাকারিনা ওয়া উনসানা। আল্লাহুম্মা মান আহয়াইতাহু মিন্না ফা আহয়িহি আলাল ইসলাম। ওয়া মান তাওয়াফ ফাইতাহু মিন্না ফাতাওয়াফ ফাহু আলাল ইমান।
অর্থ: হে আল্লাহ, আমাদের জীবিত এবং মৃতদের, উপস্থিত এবং অনুপস্থিত, ছোট ও বড়দের এবং আমাদের নারী-পুরুষ সবাইকে ক্ষমা করুন। হে আল্লাহ, আপনি আমাদের মধ্য থেকে যাকে জীবিত রাখবেন, তাকে ইসলামের ওপরই জীবিত রাখুন। যাকে মৃত্যু দান করবেন, তাকে ইমানের সঙ্গেই মৃত্যু দিন। হে আল্লাহ, এর সওয়াব থেকে আমাদের বঞ্চিত করবেন না এবং এরপর আমাদের পথভ্রষ্ট করবেন না।
মৃত ছেলেশিশু হলে এ দোয়া পড়তে হবে-
উচ্চারণ: আল্লাহুম্মাজ আলহু লানা ফারাতও, ওয়াজ আলহু লানা আজরাও, ওয়া জুখরাও, ওয়াজ আলহু লানা শাফিআও ওয়া মুশাফফাআ।
অর্থ: হে আল্লাহ, এই বাচ্চাকে আমাদের নাজাত ও আরামের জন্য আগে পাঠিয়ে দাও। তার জন্য যে দুঃখ, তা আমাদের প্রতিদান ও সম্পদের কারণ বানিয়ে দাও। তাকে আমাদের জন্য সুপারিশকারী বানাও, যা তোমার কাছে কবুল হয়।
মৃত মেয়ে শিশু হলে এ দোয়া পড়তে হবে-
উচ্চারণ: আল্লাহুম্মাজ আলহা লানা ফারাতও, ওয়াজ আলহা লানা আজরাও, ওয়া জুখরাও, ওয়াজ আলহা লানা শাফিতাও ওয়া মুশাফফাআ।
অর্থ: হে আল্লাহ, এই বাচ্চাকে আমাদের নাজাত ও আরামের জন্য আগে পাঠিয়ে দাও। তার জন্য যে দুঃখ, তা আমাদের প্রতিদান ও সম্পদের কারণ বানিয়ে দাও। তাকে আমাদের জন্য সুপারিশকারী বানাও, যা তোমার কাছে কবুল হয়।