ঢাকা রোববার, ১৫ মার্চ ২০২৬, ১ চৈত্র ১৪৩২ | বেটা ভার্সন

নারী এশিয়ান কাপে চমকের আশায় বাংলাদেশ কোচ

নারী এশিয়ান কাপে চমকের আশায় বাংলাদেশ কোচ

দেশের নারী ফুটবলের ইতিহাসে সেরা অবস্থানে রয়েছেন আফঈদা খন্দকার-ঋতুপর্ণা চাকমারা। জিতেছে সাফ নারী চ্যাম্পিয়নশিপ, জিতেছে সাফ নারী ফুটসালও। এবার লক্ষ্য এএফসি নারী এশিয়ান কাপ। প্রথমবারের মতো মেয়েদের এশিয়ান কাপে খেলার যোগ্যতা বাংলাদেশের জন্য অবশ্যই বড় অর্জন। এই আসর পেরিয়ে সরাসরি অলিম্পিকস কিংবা বিশ্বকাপের আঙিনায় ঋতুপর্ণা-আফঈদাদের পা পড়লে তা হবে অভাবনীয়। বাংলাদেশ কোচ পিটার জেমস বাটলার বাস্তবের জমিনে পা রেখেই দেখছেন দারুণ কিছুর স্বপ্ন। আগামী ৩ মার্চ অস্ট্রেলিয়ায় থেকে শুরু হবে মেয়েদের এশিয়ান ফুটবলের সর্বোচ্চ আসর। ‘বি’ গ্রুপে বাংলাদেশের সঙ্গী উত্তর কোরিয়া, চীন ও উজবেকিস্তান।

এই আসরে গ্রুপ পর্ব পেরুনো আট দল পাবে ২০২৮ সালে লস অ্যাঞ্জেলেস অলিম্পিকসে সরাসরি খেলা সুযোগ। সেরা ছয় দল পাবে এ বছরের জুন-জুলাইয়ে ব্রাজিলে হতে যাওয়া নারী ফুটবল বিশ্বকাপে খেলার টিকেট। আসছে এশিয়ান কাপে বাংলাদেশের লক্ষ্য, নারী ফুটবলের ক্রমোন্নতি, সামনের দিনের করণীয়সহ নানা বিষয় নিয়ে ফিফাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে কথা বলেছেন বাটলার। তিন বছর ধরে দেশের নারী ফুটবল নিয়ে কাজ করার অভিজ্ঞতা থেকে ৫৯ বছর বয়সী এই ইংলিশ কোচের লক্ষ্য শক্ত ভিতে বাংলাদেশকে দাঁড় করানো। ‘আমি এই কোয়ালিফিকেশনে (নারী এশিয়ান কাপ) খেলাটাকে একটি বিশাল অর্জন হিসেবে দেখছি। এটি খুব তরুণ একটি দল। দলের প্রায় অর্ধেক খেলোয়াড়ের বয়স ২০ বছরের নিচে এবং একই সময়ে আমাদের অনূর্ধ্ব-২০ দলও এশিয়ান কাপে খেলার যোগ্যতা অর্জন করেছে। এটি দেখাচ্ছে যে, বড় কিছু ঘটতে যাচ্ছে।’

২০২২ সালে নারী সাফ চ্যাম্পিয়নশিপে পাওয়া সাফল্যের মুকুট বাটলারের হাত ধরে ২০২৪ সালেও ধরে রাখে বাংলাদেশ। নেপালের ওই আসরের পর ১৮ খেলোয়াড়ের ‘বিদ্রোহে’ অনেক ভাঙা-গড়ার মধ্য দিয়ে গেছে দল। সাবিনা খাতুন, মাসুরা পারভীন, কৃষ্ণা রানী সরকার, নিলুফা ইয়াসমিন নীলার মতো অভিজ্ঞরা ব্রাত্য হয়ে গেছেন বাটলারের কাছে। ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের দল ওয়েস্টহ্যাম ইউনাইটেডে একসময় খেলা বাটলার আফঈদা, স্বপ্নাদের মতো তরুণদের নিয়ে এগিয়ে যেতে চান সামনে। অবশ্য নারী এশিয়ান কাপ নিয়ে বড় স্বপ্নের কথা বলে এখনই দলকে মানসিকভাবে চাপে ফেলতে চান না তিনি। ‘এটি (নারী এশিয়ান কাপ) এই খেলোয়াড়দের জন্য সুযোগ, যারা অনেক বড় মঞ্চ নিজেদের প্রতিভা দেখাতে চায়। আমরা এই টুর্নামেন্ট জেতার প্রত্যাশা নিয়ে যাচ্ছি না; আমাদের মূল লক্ষ্য এমন একটি ভিত্তি তৈরি করা, যেন বাংলাদেশ বারবার এখানে খেলার যোগ্যতা অর্জন করতে পারে।’

সাক্ষাৎকারে বাংলাদেশের দায়িত্ব নেওয়ার শুরুর দিকেও পিছু ফিরে তাকিয়েছেন বাটলার। সেসময় বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের (বাফুফে) কাছে নিজের মনোভাব, পরিকল্পনা, প্রত্যাশা-সবই পরিষ্কার করেছিলেন তিনি। কিছু পরিবর্তন ‘জনপ্রিয়’ হবে না, বাফুফেকে জানিয়েছিলেন সেটাও। ‘মূলত আমরা আরও বেশি তরুণ খেলোয়াড় এনে সিনিয়র জাতীয় দলটিকে নতুন করে গুছিয়েছি। আমি আসার আগে স্কোয়াডে এমন কিছু খেলোয়াড় ছিল, যারা সেখানে থাকার যোগ্য ছিল না। কাজটা সবার জন্য সহজ ছিল না, কিন্তু আমি এখানে মানুষকে খুশি করতে আসিনি। মাঝে মাঝে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হয় এবং খেলোয়াড়রা সেই চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেছে।’ তিনি বলেন, ‘আমার মনে হয় সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো মানুষকে নতুন ধ্যান-ধারণা এবং একটি নতুন প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশের সাথে মানিয়ে নিতে রাজি করানো। ডায়েট এবং পুষ্টি বড় বাধা, তেমনি বড় বাধা প্রশিক্ষণের সুযোগ-সুবিধা। এই দেশে ভালো প্রশিক্ষণ মাঠের অভাব রয়েছে। এই সীমাবদ্ধতাগুলোর কারণে আমাদের নতুন করে ভাবতে হয়েছে।

এখান থেকে আমি যদি একটি জিনিস শিখে থাকি, তবে তা হলো মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা। প্রতিকূল পরিস্থিতির কারণে আমাকে প্রশিক্ষণের পদ্ধতিতে আরও নমনীয় হতে হয়েছে।’ নারী এশিয়ান কাপে খেলার যোগ্যতা অর্জনের সাফল্যের আটকে থাকতে রাজি নন বাটলার। সতর্ক পদক্ষেপে, বড় চ্যালেঞ্জ নিয়ে তিনি পাড়ি দিতে চান আরও অনেক পথ। ‘আমি মনে করি, আমাদের এখনও অনেক পথ পাড়ি দেওয়া বাকি। আমরা কেবল শুরু করেছি। বড় চ্যালেঞ্জ এখনও সামনে। আমার মনোযোগ ট্রফি জয়ের দিকে নয়, বয়সভিত্তিক টুর্নামেন্টগুলোর দিকে। আঞ্চলিক পর্বে কারা পারফরম করতে পারে, তাদেরকে চিহ্নিত করা, যারা পরবর্তী ধাপে পারফরম করার সামর্থ্য রাখে।’

এশিয়ান কাপের মূল লড়াইয়ে বাংলাদেশের চেয়ে যোজন যোজন এগিয়ে উত্তর কোরিয়া, চীন। উত্তর কোরিয়া এ আসরের রেকর্ড ৯ বারের চ্যাম্পিয়ন, চীনও সেরা হয়েছে তিনবার। উজবেকিস্তানই শুধু বাংলাদেশের ধরাছোঁয়ার মধ্যে।

বাধাগুলো বাটলার পেরুতে চান প্রতিদ্বন্দ্বিতার মানসিকতা নিয়ে। ‘আমরা সুশৃঙ্খল ও লড়াকু হব এবং ভালো ফুটবল খেলার চেষ্টা করব। তবে নারী বিশ্বকাপে খেলার যোগ্যতা অর্জন করা আমাদের জন্য একটি বিশাল পাহাড়ের চূড়ায় ওঠার মতো কঠিন কাজ হবে।’ বাংলাদেশের হাল ধরার আগে বতসোয়ানা, লাইবেরিয়ার মতো জাতীয় দলসহ অনেক ক্লাব ক্লাবের দায়িত্বে ছিলেন বাটলার। ২০২৩ সালে বাফুফের এলিট একাডেমির দায়িত্ব নেওয়ার পর নারী ফুটবল দলেরও হাল ধরেন তিনি।

এই ইংলিশ কোচের ভাবনা এখন সামনের পথচলায় ছাপ রেখে যাওয়ার। ‘আমার একমাত্র মনোযোগ এখন চীন, উত্তর কোরিয়া এবং উজবেকিস্তানের বিরুদ্ধে ভালো লড়াই করা। এটিই আমাদের সামনের মূল চ্যালেঞ্জ।

মূল উদ্দেশ্য শুধু কোয়ালিফাই করা নয়, বরং সঠিক উপায়ে শৃঙ্খলা ও ভালো পারফরম্যান্সের মাধ্যমে নিজেদের ছাপ রেখে যাওয়া। ফুটবল কেবল সামাজিকমাধ্যম, কিছু ড্রিল বা ছোট ভিডিও ক্লিপ নয়।

প্রকৃত উন্নয়ন আসে সেই কোচদের হাত ধরে, যারা সত্যিকার অর্থে কোচিং করান, খেলোয়াড়দের সঙ্গে কাজ করেন, প্রোগ্রামগুলো সাজান এবং জ্ঞান ভাগাভাগি করে নেন।

নারী ফুটবলের দ্রুত উন্নতি হচ্ছে এবং আপনি যদি, তাল মিলিয়ে চলতে না পারেন, তাহলে পিছিয়ে পড়বেন।’

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত