ঢাকা মঙ্গলবার, ২১ এপ্রিল ২০২৬, ৮ বৈশাখ ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

বিদায়ী সম্মানে আবেগাক্রান্ত রুবেল

বিদায়ী সম্মানে আবেগাক্রান্ত রুবেল

একটা সময় ছিল যখন বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের পেস আক্রমণের সামনের সারিতে ছিলেন রুবেল হোসেন। দলকে ব্রেক থ্রু এনে দিতেন নিয়মিত। তবে দীর্ঘদিন ধরেই জাতীয় দলের বাহিরে ‘বাগেরহাট এক্সপ্রেস’ খ্যাত এ পেসার। কিছুদিন আগে অবসরের ঘোষণাও দিয়েছিলেন। এবার আনুষ্ঠানিক বিদায় নিলেন রুবেল। সতীর্থদের কাছ থেকে ভালোবাসা আর ক্রিকেট বোর্ডের আনুষ্ঠানিক সম্মান পেয়ে রুবেল হোসেন ছুটলেন মিরপুরের বাইশগজের দিকে। পুত্রকে পাশে নিয়ে পিচের মাটি স্পর্শ করে নিলেন। অন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে অবসরের ঘোষণা দেওয়া পেসার রুবেল হোসেন বিশেষ সম্মাননা পেয়ে বললেন, তিনি গর্বিত ও কৃতজ্ঞ। রুবেলের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার থমকে ছিল বছর পাঁচেক ধরেই। ৩৬ বছর বয়সী পেসার গত বুধবার সামাজিক মাধ্যমে বিদায়ের ঘোষণা দেন আনুষ্ঠানিকভাবে। মিরপুরে গতকাল সোমবার বাংলাদেশ-নিউজিল্যান্ড সিরিজের দ্বিতীয় ওয়ানডে শুরুর আগে ছোট্ট এক আয়োজনে রুবেলকে সম্মান জানায় বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি)।

সকালে ছেলে আয়ানকে সঙ্গে নিয়ে স্টেডিয়ামে আসেন রুবেল। টসের পর ছেলেকে নিয়েই মাঠে ঢোকেন তিনি। বিসিবি সভাপতি তামিম ইকবালের সঙ্গে দাঁড়িয়ে বেশ কিছুক্ষণ কথা বলতে দেখা যায় তাকে। একটু পর শুরু হয় মূল আনুষ্ঠানিকতা। মাঠের একটুখানি ভেতরে দুই পাশে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়ান বাংলাদেশের ক্রিকেটার ও সাপোর্ট স্টাফরা। তামিম ইকবালসহ বিসিবির অ্যাডহক কমিটির সদস্য রফিকুল ইসলাম বাবু, ফাহিম সিনহা ও বোর্ডের প্রধান নির্বাহী নিজাম উদ্দিন চৌধুরি ছিলেন ছোট্ট এই আয়োজনে। ক্রেস্টের পাশপাশি রুবেলে হাতে তুলে দেওয়া হয় ফ্রেম বাঁধাই করা তিন সংস্করণের জার্সি। সেই জার্সিতে খোদাই করা তার বোলিং পরিসংখ্যান।

রুবেলের বোলিংয়ের কথা বললে প্রথমেই হয়তো আসবে ২০১৫ বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচটি। ওই ম্যাচে তার অবিস্মরণীয় দুটি ডেলিভারি অমর হয়ে আছে দেশের ক্রিকেটে। সেই স্মৃতি স্মরণ করে দলের পক্ষ থেকে রুবেলের প্রতি বিদায়ী বার্তা দিলেন তাসকিন আহমেদ। ‘আমার এখনও মনে আছে ২০১৫ সালের বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের সঙ্গে ম্যাচটা, এমন একটা কঠিন পরিস্থিতি ছিল এবং দুই বলে দুই উইকেট (আসলে তিন বলে) নিয়ে আপনি আমাদের কোয়ালিফাই করতে সাহায্য করেছিলেন। ওই কথাটাই এখনও মনে পড়ে যে, ‘Don’t go for heroe and goes for heroes’, রুবেল হোসেনই জিতিয়েছে ম্যাচটা। অনেক স্মৃতি বার্মিংহামেও আছে, সেটা না বললাম, কিন্তু থ্যাংক ইউ ভেরি মাচ।’

অ্যাডিলেইডে সেদিন ইংল্যান্ডকে হারিয়ে প্রথমবার বিশ্বকাপের কোয়ার্টার-ফাইনালে পা রাখে বাংলাদেশ। রুবেল নিয়েছিলেন ৪ উইকেট। এই ৪ সংখ্যাটি রুবেলের ক্যারিয়ারে জড়িয়ে আছে প্রবলভাবেই। ওয়ানডে ম্যাচে ৪ উইকেট পেয়েছেন তিনি সাতবার। পাঁচ উইকেট পেয়েছেন একবারই। ২০১৩ সালে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে মিরপুরে হ্যাটট্রিকসহ ২৬ রানে ৬ উইকেট নিয়ে দলকে জিতিয়েছিলেন তিনি। এখনও যা ওয়ানডে ক্রিকেটে বাংলাদেশের সেরা বোলিংয়ের রেকর্ড, যৌথভাবে মাশরাফি বিন মুর্তজার সঙ্গে। রুবেলের ওয়ানডে ক্যারিয়ারের সেরা দুটি বোলিং পার্ফরম্যান্সই নিউ জিল্যান্ডের বিপক্ষে এবং দুটিই মিরপুরে। ২০১০ সালে কাইল মিলসের স্টাম্প উড়িয়ে শেষ উইকেট নিয়ে নিউ জিল্যান্ডকে হোয়াইটওয়াশ করার ম্যাচে তার শিকার ছিল ২৫ রানে ৪ উইকেট।

এই মাঠ তাই বিশেষ জায়গা নিয়ে থাকার কথা তার হৃদয়ে। সে কারণে হয়তো সম্মাননা আয়োজন শেষে ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে উইকেটের কাছে গেলেন রুবেল। ছুঁয়ে দেখলেন উইকেট। সেখানে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলেন। হয়তো এখানে ক্যারিয়ারের বিশেষ মুহূর্তগুলো মনে পড়ছিল তার। রুবেল তার শেষ আন্তর্জাতিক ম্যাচটি খেলেছেন ২০২১ সালের এপ্রিলে, নিউজিল্যান্ড সফরে টি-টোয়েন্টিতে। পাঁচ বছর পর আরেকটি এপ্রিলে ঘরের মাঠে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে সিরিজ শুরুর একদিন আগে সামাজিক মাধ্যমে ছোট্ট বার্তায় বিদায় বলে দেন তিনি।

পরে ফোন করে তাকে সম্মাননা জানানোর উদ্যোগের কথা জানান বিসিবি সভাপতি। বোর্ড প্রধান ও সাবেক সতীর্থ তামিমের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানালেন রুবেল। ‘শুরুতে বলতে চাই যে, আমি যখন অবসর ঘোষণা করি আমার সামাজিক মাধ্যমে, তার পরবর্তী সময়ে আমাদের ক্রিকেট বোর্ডের প্রেসিডেন্ট তামিম ইকবাল আমাকে ফোন দিয়ে বলে যে, ‘রুবেল তোকে আমরা সম্মানিত করতে চাই।’ যে বিষয়টা আমার কাছে খুবই গর্বের এবং আনন্দের ছিল এবং আজকে এত সুন্দর একটি পরিবেশ তৈরি করেছে, এত সুন্দরভাবে আমাকে সম্মানিত করেছে, এজন্য বিসিবি এবং আমাদের প্রেসিডেন্ট তামিম ইকবালকে আন্তরিক ধন্যবাদ এবং শুভেচ্ছা জ্ঞাপন করছি।’

রুবেলের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অভিষেক ২০০৯ সালের জানুয়ারিতে। আবির্ভাবেই তাক লাগিয়ে দেন শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে। বাংলাদেশের প্রথম বোলার হিসেবে ওয়ানডে অভিষেকে শিকার করেন ৪ উইকেট। পরের ম্যাচেই তাকে দেখতে হয় মুদ্রার উল্টো পিঠ। ত্রিদেশীয় সিরিজের ফাইনালে শেষ দিকে তাকে তুলাধুনা করেন মুত্তাইয়া মুরালিদারান, শ্রীলঙ্কা জিতে যায় নাটকীয়ভাবে। অন্য দুই সংস্করণেও দ্রুতই অভিষেক হয়ে যায় রুবেলের। এরপর নানা উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে এগিয়ে যায় তার ক্যারিয়ার। ১০৪ ওয়ানডেতে তার উইকেট ১২৯টি। অন্য দুই সংস্করণে তেমন একটা প্রভাব তিনি রাখতে পারেননি। ২৭ টেস্ট খেলে উইকেট ৩৬টি। বোলিং গড় ৭৬.৭৭। টেস্ট ক্রিকেটে ২০টির বেশি উইকেট নেওয়া বোলারদের মধ্যে সবচেয়ে বাজে বোলিং গড় এটি। টি-টোয়েন্টিতে ওভারপ্রতি প্রায় সাড়ে ৯ করে রান দিয়ে ২৮ ম্যাচে উইকেট ২৮টি।

দেশের ক্রিকেটের শীর্ষ পর্যায়ে রুবেলের উঠে আসা ‘পেসার হান্ট’ প্রতিযোগিতা থেকে। এর পেছনে যার ভূমিকা ছিল সবচেয়ে বেশি, দেশের ক্রিকেটের পরিচিত কোচ, সেই সরওয়ার ইমরানের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানালেন তিনি। ‘একটি মানুষের কথা না বললেই নয়, আমার আজকের রুবেল হোসেন হওয়ার পেছনে যে মানুষটার অবদান আমার কাছে অন্যরকম। আমাকে পেসার হান্ট থেকে নিয়ে এসে যে মানুষটা আমাকে ওপরে ওঠার সিঁড়ি ধরিয়ে দিয়েছেন, তিনি আমার প্রিয় কোচ আমার শ্রদ্ধেয় সরওয়ার ইমরান স্যার। স্যারের প্রতি সারা জীবন কৃতজ্ঞ থাকব।’

রুবেল বলেন, ‘ছোটবেলা থেকে স্কুল টুর্নামেন্ট থেকে শুরু করে আমার সমস্ত কোচ এবং জাতীয় পর্যায় থেকে শুরু করে আমার ফিজিও এবং আমাদের গ্রাউন্ডসকর্মী থেকে শুরু করে সমস্ত কোচদের সবাইকে আমি আন্তরিকভাবে ধন্যবাদ জানাই, যারা আমাকে অনেক সমর্থন দিয়েছেন, সাহস জুগিয়েছেন এবং আমার পাশে ছিলেন।’ মা-বাবার পাশাপাশি, বন্ধু, স্বজন, ভক্তদের কথাও স্মরণ করেন রুবেল। ‘আজকে এখানে দাঁড়াতে পেরেছি আমার দুইজন মানুষের জন্য, সে হচ্ছে আমার বাবা এবং আমার মা, যারা আমাকে আন্তরিকভাবে আমাকে সাহস জুগিয়েছেন, আমার পাশে ছিলেন, আমাকে নিঃস্বার্থভাবে ভালোবেসেছেন, আমি তাদের আজকে খুব মিস করছি।’ সর্বশেষে গণমাধ্যম কর্মীদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন রুবেল।

আলোকিত বাংলাদেশ
আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত