
সাফ নারী চ্যাম্পিয়নশিপে হ্যাটট্রিক শিরোপা জয়ের মিশনে বাংলাদেশ দল এখন ভারতের গোয়ায়। মালদ্বীপকে উড়িয়ে দুর্দান্ত শুরুর পর দ্বিতীয় ম্যাচেই মুদ্রার উল্টো পিঠ দেখে ফেলেছেন লাল সবুজ দলের মেয়েরা। স্বাগতিক ভারতের কাছে বড় ব্যবধানে হেরেছে টানা দুইবারের চ্যাম্পিয়নরা। তবে সব আশা ভরসা অবশ্য এখনই শেষ হয়ে যায়নি ‘বি’ গ্রুপের রানার্সআপ হয়ে সেমি-ফাইনালে ওঠা বাংলাদেশ আগামীকাল বুধবার নেপালের মুখোমুখি হবে। যাদের টানা দুই ফাইনালে হারিয়ে দক্ষিণ এশিয়ার নারী ফুটবলের সর্বোচ্চ আসরে শিরোপা জিতেছিল সাবিনা খাতুনরা। সেরা চারের লড়াইয়ে নেপালকে হারাতে আত্মবিশ্বাসী কোচ পিটার বাটলার। তবে অভিষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছুতে খেলবে সাহসী ফুটবল। বাংলাদেশের ইংলিশ কোচ বলেন, ‘দেখুন, একটা ভালো দিনে এই অঞ্চলের বেশিরভাগ দলকে হারানোর জন্য আমি আমাদের দলের ওপর বাজি ধরব। আমাদের অনেক তরুণ খেলোয়াড় আছে। এমন অনেক খেলোয়াড় আছে, যাদের খেলা উচিত, কারণ, তারা খেলার যোগ্য। আর মাঝে মাঝে যখন আপনি তরুণ খেলোয়াড়দের মাঠে নামাবেন, তখন আপনাকে সাহসী হতে হবে। আপনাকে নির্ভীক হতে হবে।’
পিটার বাটলার বলেন, ‘আপনি যখন একটা দল পুনর্গঠন করছেন বা ভবিষ্যতের জন্য দল তৈরি করছেন, তখন সেটা একটা চক্রের মতো চলবে। যখন আপনি ভারতের মতো দলের মুখোমুখি হবেন, নিজের সামর্থ্য বুঝতে পারবেন। আমরা মনে হয়, আমরা নেপালের বিপক্ষে খেলতে পারি এবং তাদেরকে হারাতেও পারি।’ ভারতের বিপক্ষে হজম করা প্রথম গোলে কোহাতি কিসকুর ভুল দেখছেন বাটলার। প্রতিপক্ষের পাওয়া দ্বিতীয় পেনাল্টি নিয়ে আপত্তি আছে তার। দ্বিতীয় সেকেন্ডে আনিকা রানিয়া সিদ্দিকী দারুণ সুযোগটি হেলায় না হারালে গল্প ভিন্নরকম হতে পারত, এমনটাও মনে হচ্ছে এই ইংলিশ কোচের। মাঠে সেরাটা নিংড়ে দিতে না পারা অনেকের সমালোচনার তীর্যক তীরে বিঁধেছেন তিনি। তবে, এগুলো নিয়ে পড়ে থাকতে চান না বাংলাদেশ কোচ। তিনি বলেন, ‘আমার মনে হয়, আমাদের ঘুরে দাঁড়ানোটা সম্পূর্ণ নির্ভর করছে খেলোয়াড়রা এটিকে কীভাবে নিচ্ছে তার ওপর। আমরা এই ক্লান্তি ঝেড়ে ফেলব, রিকভারি করব, একসাথে বসব এবং বিষয়গুলো খতিয়ে দেখব। এরপর আমরা ট্রেনিং গ্রাউন্ডে ফিরে যাব এবং আমি এমন একটা দল মাঠে নামাব, যারা খেলতে চায়। খেলতে চাওয়ার মধ্যেৃ আমি বলছি না যে, নির্দিষ্ট কিছু খেলোয়াড় খেলতে চায় না, তবে কখনো কখনো মানুষ সহজ পথ বেছে নিতে চায়, খেলতে চাওয়া আর এদের মধ্যে একটা বড় পার্থক্য আছে।’
বাংলাদেশ না পারলেও গত আসরের রানার্সআপ নেপাল ঠিকই দুই ম্যাচ জিতে হয়েছে গ্রুপ সেরা। নিজেদের কাজটা করতে পারেনি প্রতিযোগিতার শিরোপাধারী বাংলাদেশ। মালদ্বীপের বিপক্ষে ৪-২ ব্যবধানে জিতলেও ভারতের বিপক্ষে অসহায় আত্মসমর্পনই করেছে দল। ভারত ম্যাচের বিবর্ণতার পেছনে কোনো অজুহাত দেখালেন না বাটলার। ‘কোনো অজুহাত দিতে চাই না। আমরা একটা ভালো দলের কাছে হেরেছি। আমাদের শুরুটাও ছিল ছন্নছাড়া এবং শেষটাও ছন্নছাড়া। স্কোরলাইন ১-০ থাকার সময় আমাদের কিছুটা ঝুঁকি নিতে হয়েছিল। পরিস্থিতির কারণে বাধ্য হয়ে কিছু খেলোয়াড় বদল করতে হয়েছিল। আমার শুধু মনে হয়েছে, আমাদের স্বাভাবিক ছন্দটা ছিল না। অবশ্যই এর পেছনে কিছু কারণ আছে, যেটা আমাদের খতিয়ে দেখতে হবে। কেন নির্দিষ্ট কিছু খেলোয়াড় নিচে নেমে রক্ষণ সামলাচ্ছে না, কিংবা কেন ওয়ার্মণ্ডআপের জন্য সময়মতো আসছে না- এর কারণ খুঁজে বের করতে হবে। তবে, কোনো অজুহাত নয়, আমরা স্রেফ হেরে গেছি। কয়েকজন খেলোয়াড়কে বিশ্রাম এবং কয়েকজনকে খেলার সুযোগ দিয়েছিলাম। তাদের মধ্যে কেউ কেউ খুব ভালো করেছে, আর বাকিদের পারফরম্যান্স আমার কাছে ভীষণ হতাশাজনক।’ ভারত ম্যাচে মনিকাণ্ডমারিয়ার জুটি পারেনি মাঠমাঠের দখল নিতে। একের পর এক এলোমেলো পাস দিয়েছেন অধিনায়ক মারিয়াও। তবে, শুরুতে নির্দিষ্ট করে না বললেও, বাটলার কারো কারো শেষ দেখলেন।
এক পর্যায়ে দুই বছর আগের সেই আলোচিত ‘বিদ্রোহ’র প্রসঙ্গ টানলেন, ক্ষোভ উগরে দিলেন চোট কাটিয়ে ফিরে নিজের সেরাটা মেলে ধরতে না পারা মনিকার উপরও। ‘আমি মূলত খেলোয়াড়দের পাদপ্রদীপের আলো থেকে, অতিরিক্ত চাপের মুখ থেকে সরিয়ে রাখার চেষ্টা করছি। কারণ আমি জানি কী ঘটছে। আর মাঝেমাঠের ব্যাপারটা আমি বুঝি। এটা অনেকটা জুটির মতো। যেমন স্ট্রাইকিং পার্টনারশিপ থাকে, মিডফিল্ড পার্টনারশিপ থাকে। আবার ফুল-ব্যাক ও উইঙ্গারদের মধ্যে একটা ভালো বোঝাপড়া থাকে। কারণ, তারা একে অপরের সাথে পাস আদান-প্রদান করে খেলে। মাঝে মাঝে এই জুটিগুলো কাজ করে না। কখনও শেষ হয়ে যায়। তখন আপনাকে চারপাশটা দেখতে হয়, আর এটা একটা চলমান প্রক্রিয়া।’
বাটলার বলেন, ‘আপনারা জানেন, দুই বছর আগে আমাদের দলে একটা বড় ধরনের রদবদল হয়েছিল। এই হারের কোনো অজুহাত নেই। আমি এর সম্পূর্ণ দায় নিচ্ছি। গত দুটি ম্যাচ আমাকে নির্দিষ্ট কিছু খেলোয়াড় দেখে নেওয়ার একটা সুযোগ করে দিয়েছে। কেউ কেউ সত্যিই ভালো করেছে এবং অন্যেরা হয়তো ফিট নয়, অথবা বলছে তারা ফিট, কিন্তু আসলে ফিট নয়, কিংবা আরও বড় কথা-তারা ক্যারিয়ারের শেষ প্রান্তে চলে এসেছে। মারিয়া, সে একজন ভালো নেতা, আমি নিশ্চিত সে এই দলটাকে খুব খুব ভালোভাবে নেতৃত্ব দেবে। মনিকা হয়তো ক্যারিয়ারের শেষের দিকে চলে এসেছে। ওর একটা ইনজুরি আছে। সে তো এখন আর তরুণী মেয়ে নয়। সে দুর্দান্ত সার্ভিস দিয়ে এসেছে দলকে।’
অধিনায়কত্ব হারানো আফঈদা খন্দকারকে ভারত ম্যাচে খেলাননি বাটলার। এই ডিফেন্ডারকে বিশ্রাম দেওয়ার কারণ বলতে গিয়ে কারো কারো শেষ দেখার কথা ফের বলেছেন কোচ। কারো কারো মধ্যে পেশাদার মনোভাবের চরম ঘাটতিও দেখছেন তিনি। ‘আফঈদা একদিন বুঝতে পারবে, কেন আমি তাকে জ্বলন্ত উনুন থেকে তুলে সরাসরি আগুনে ফেলে দেওয়ার বদলে একটু বিশ্রামের সুযোগ দিয়েছি; এটা তার উন্নতিরই একটা অংশ। আমি আসলে জানি না ওর বয়স কত। হয়তো ১৯ বা ২০ বছর হবে। সব খেলোয়াড়ে সঠিক বয়সও জানি না। তবে, আমি একটা দল নতুন করে গড়ে তোলার চেষ্টা করছি, কারণ আমি জানি, কিছু খেলোয়াড় তাদের ক্যারিয়ারের শেষের দিকে চলে এসেছে।’
বাংলাদেশ কোচ বলেন, ‘আমাদের আরও পেশাদার হতে হবে। আর আমি পেশাদারিত্বের জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করি, কিন্তু কিছু খেলোয়াড় সেই স্তরে যাওয়ার ইচ্ছাটুকুই নেই। তাও আমরা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। এটা কীভাবে জানেন? যেমন, আপনি কাউকে ওয়ার্মণ্ডআপ করতে বললেন, আর সে হেঁটে হেঁটে ওয়ার্মণ্ডআপের জায়গার দিকে গেল। আপনি যদি একজন ইংলিশ খেলোয়াড়কে বা সম্ভবত বর্তমান সময়ে একজন ভারতীয় খেলোয়াড়কে বলেন, আমি ঢালাওভাবে বলছি না, কিছু খেলোয়াড়কে ওয়ার্মণ্ডআপ করতে বললে তারা দৌড়ে সেখানে যাবে এবং দ্রুত কাজটা করবে। কারণ তারা মাঠে ফিরে আসতে চায়।’