
গ্রুপ পর্বের জমজমাট লড়াই শেষে শুরু হয়েছে উত্তর আমেরিকা বিশ্বকাপের ‘রাউন্ড অব থার্টি-২’। নকঅউট পর্বের এই রাউন্ড শুরু হয়েছে কানাডা ও দক্ষিণ আফ্রিকার ম্যাচ দিয়ে। গত রোববার রাতে অনুষ্ঠিত সেই ম্যাচ জিতে ইতিহাস গড়ে শেষ ষোলোতে জায়গা করে নিয়েছে স্বাগতিক কানাডা। আজ বাঁচা মরার পরীক্ষা দিতে নামবে নেদারল্যান্ডস-মরক্কো, আইভরি কোস্ট-নরওয়ে ও ফ্রান্স-সুইডেন। গ্রুপ পর্বে তিনবার সুযোগ পাওয়া গেলেও নকআউটে স্রেফ এক ম্যাচেই গড়তে হয় ভাগ্য। তাই এই লড়াইগুলোর জন্য মানসিকতাও ভিন্ন হওয়া প্রয়োজন বলে মনে করছেন মোহামেদ ওয়াহবি। মরক্কো কোচের মতে, গ্রুপ অপরাজিত থাকা কিংবা গ্রুপ সেরা হওয়ার কীর্তি তেমন কোনো কাজে আসে না নকআউট ম্যাচে।
বাংলাদেশ সময় আজ সকাল সাতটায় শেষ বত্রিশের ম্যাচে শক্তিশালী নেদারল্যান্ডসের মুখোমুখি হবে মরক্কো। গুরুত্বপূর্ণ লড়াইয়ে ভিন্ন কৌশল নিয়ে মাঠে নামার বার্তা দিতে রাখলেন ওয়াহবি। ব্রাজিলের বিপক্ষে ১-১ ড্র করে এবারের বিশ্বকাপ শুরু করে মরক্কো। পরে স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে ১-০ ড্র এবং হাইতির বিপক্ষে দুই দফায় পিছিয়ে পড়ার পরও ৪-২ গোলে জেতে তারা। অপরাজিত থেকে ব্রাজিলের সমান ৭ পয়েন্ট নিয়ে গ্রুপ রানার্সআপ হয় মরক্কো। নিজেদের গ্রুপের সেরা হয় নেদারল্যান্ডস। তারাও এখন পর্যন্ত হারেনি কোনো ম্যাচ। গত বিশ্বকাপে সবাইকে চমকে দেয় মরক্কো। চার বছর আগে কাতারে আফ্রিকার প্রথম দল হিসেবে বিশ্ব আসরে সেমি-ফাইনালে খেলার কীর্তি গড়ে তারা। এবারও তাদেরকে নিয়ে বড় স্বপ্ন দেখছেন সমর্থকরা। নকআউট পর্বের প্রথম ধাপে ডাচদের মুখোমুখি হওয়ার আগে ওয়াহবি বললেন, ম্যাচটিকে ভিন্ন চোখে দেখছেন তারা। ‘গত তিন ম্যাচে প্রমাণ করেছি, আমরা ভালো পারফর্ম করতে সক্ষম এবং মাঠে লড়াকু মানসিকতা দেখাতে পারি। তবে রোববারের ম্যাচটি (ডাচদের বিপক্ষে) সম্পূর্ণ আলাদা এবং এর জন্য ভিন্ন কৌশলের প্রয়োজন। আমরা এই মানসিকতা নিয়েই মাঠে নামব।’
শেষ বত্রিশে খেলা নিশ্চিত হয়ে যাওয়ার পর হাইতির বিপক্ষে শুরুর একাদশে অনেক পরিবর্তন আনেন মরক্কো কোচ ওয়াহবি। সেই পরিকল্পনা ঠিকঠাক মতো কাজ করায় খুশি তিনি। সতেজ খেলোয়াড়দের নিয়ে এবার ডাচ-পরীক্ষায় নামার পালা তাদের। যে ম্যাচে ভুলের সুযোগ নেই একটুও। নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে ঠিক কী কৌশল নিয়ে দল মাঠে নামবেন, তা খোলসা করেননি ওয়াহবি। তবে তিনি জানিয়েছেন, কঠিন গ্রুপ পার হতে যে শক্তির ওপর দল ভরসা করেছিল, সেটার ওপরই আস্থা রাখবেন তারা। ‘আমরা যেটা সবচেয়ে ভালো পারি, সেটাই মাঠে সবচেয়ে নিখুঁত উপায়ে করে যাওয়ার চেষ্টা করে যাব।’
হলান্ডের আলো কেড়ে নিতে চায় আইভরি কোস্ট
ডালাসের ম্যাচে অনুমিতভাবেই কেন্দ্রে থাকবেন আর্লিং হলান্ড। গোলের জন?্য তার দিকে তাকিয়ে থাকবে নরওয়ে। আর এই তারকা ফরোয়ার্ডকে কড়া পাহারায় নিস্ক্রিয় করে রাখতে চাইবে আইভরি কোস্ট। উত্তর আমেরিকা বিশ্বকাপের শেষ বত্রিশের ম্যাচ সামনে রেখে দলটির কোচ আইমার্স ফাই বললেন, হলান্ডের আলোটুকু কেড়ে নিতে চান তারা। গ্রুপ পর্বে হলান্ডের আলোতেই অনেকটা আলোকিত ছিল নরওয়ে। ইরাক ও সেনেগালের বিপক্ষে দুই ম্যাচে জোড়া গোল করেছিলেন এই ফরোয়ার্ড। ফ্রান্সের বিপক্ষে তাকে বিশ্রাম দেন কোচ; ম্যাচটিও নরওয়ে হেরে যায় ৪-১ গোলে। শেষ ষোলোয় ওঠার লড়াইয়ে, বাংলাদেশ সময় আজ রাত ১১টায় মুখোমুখি হবে নরওয়ে ও আইভরি কোস্ট। হলান্ড ফিরবেন নরওয়ের আক্রমণভাগে। ২৪ বছর বয়সী এই ফরোয়ার্ডকে আটকে রাখার সামর্থ্য আছে আইভরি কোস্টের রক্ষণের। বিশেষ করে, তাদের রক্ষণে আছেন উসমানে ডায়মন্ডে। ২২ বছর বয়সী এই তরুণ ইতোমধ্যে নজর কেড়েছেন সবার।
আইভরি কোস্টের আক্রমণভাগও বেশ শক্তিশালী। ইয়ান ডায়মন্ডে, কুরাসাওয়ের বিপক্ষে জোড়া গোল করা নিকোলাস পেপে, একুয়েডরের বিপক্ষে একমাত্র গোলটি করা আমাদ জিয়ালো আছেন। তরুণ আইশ-ইয়োয়ান বনিসহ সব মিলিয়ে দলটিতে আক্রমণভাগের খেলোয়াড়ই নয় জন! ফাইয়ের বিশ্বাস, তার আক্রমণভাগের সামর্থ্য আছে হলান্ডকে আলোহীন করে দেওয়ার। ‘আমি মনে করি, সবার গোল ভাগ করে নেওয়া আমাদের আক্রমণভাগের শক্তিটা দেখাচ্ছে। যেটা কাজে লাগিয়ে আমরা প্রতিপক্ষকে জাপটে ধরতে পারি এবং মাঠের সব জায়গায় তাদের জন্য হুমকি হয়ে উঠতে পারি। এমনকি, আমাদের বেঞ্চে থাকারাও মাঠে নেমে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে।’
এদিকে বাংলাদেশ সময় রাত ৩টায় ফ্রান্সের মুখোমুখি হবে সুইডেন। এই বাধা পেরুতে পারলে, শেষ ষোলোয় তারা মুখোমুখি হতে পারে জার্মানির। তবে, সামনে যে দলই পড়ুক, এমবাপ্পে-দেম্বেলে-ওলিসে ত্রয়ী একসাথে সেরাটা মেলে ধরলে, ফ্রান্সকে আটকানো যে কোনো দলের জন্যই যেন প্রায় অসম্ভব। গ্রুপ পর্বে কিলিয়ান এমবাপ্পের গোল চারটি। হ্যাটট্রিকসহ চার গোল করেছেন উসমান দেম্বেলেও। একটি করে গোল ব্রাডলে বার্কোলা ও দিজিরে দুঁয়ের। এছাড়াও ফ্রান্সের আক্রমণভাগে আছে মাইকেল ওলিসে, হায়ান শেহকি ও মার্কাস থুরাম। আক্রমণভাগের মূল ‘ত্রয়ী’ অবশ্য এমবাপ্পে-দেম্বেলে-ওলিসে। এই তিন জন নিজেদের সেরাটা একসাথে মেলে ধরতে পারেননি এখনও। একসাথে জ্বলে উঠলে প্রতিপক্ষের জন্য কী পরিস্থিতি হবে, তা সহজেই অনুমেয়। জ্লাতান ইব্রাহিমোভিচ অবশ্য ধারণা দিয়ে রাখলেন। সুইডেনের সাবেক তারকার চোখে ফ্রান্সের বর্তমান দলটি ‘পরিপূর্ণ’ এবং প্রতিপক্ষের জন্য ‘ভয়ঙ্কর’। ফ্রান্সের আক্রমণভাগ যে প্রতিপক্ষের জন্য আসলেই ভয়ঙ্কর, তা তারা গ্রুপ পর্বের তিন ম্যাচে ১০ গোল করে প্রতিপক্ষদের বুঝিয়ে দিয়েছে কিছুটা হলেও।
উত্তর আমেরিকা বিশ্বকাপে, ফ্রান্সের আক্রমণ ‘ত্রয়ী’র এক-একজন আলো ছড়াচ্ছেন এক-এক ম্যাচে। নরওয়ের বিপক্ষে যেমন, ওলিসে আগের ম্যাচের তুলনায় কিছুটা আড়ালে ছিলেন। ওই ম্যাচে হ্যাটট্রিক করে পাদপ্রদীপের আলো নিজের দিকে টেনে নেন দেম্বেলে। আগের দুই ম্যাচের তুলনায়, এই ম্যাচে ফ্রান্সের খেলায় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনও ছিল। সেনেগালের বিপক্ষে ম্যাচে ওলিসে ছিলেন আক্রমণের মূল চালিকাশক্তি, এমবাপ্পের সাথে তাৎক্ষণিক বোঝাপড়ায় দারুণ জুটি হয়ে উঠেছিলেন তিনি। ওই ম্যাচে কিছুটা ধুঁকছিলেন দেম্বেলে।
চার দিন পর, ইরাকের বিপক্ষে দেম্বেলে গোলের খাতায় নাম তুললেন। কিছুটা উন্নতির ছাপও দেখালেন।
কিন্তু প্রশ্ন থেকে গেল, ২৯ বছর বয়সী এই ফরোয়ার্ড বাকিদের সাথে খুব ভালোভাবে মানিয়ে নিতে পারছেন কিনা। যেহেতু, ওলিসে-এমবাপ্পের জুটি আর বেশিও জমাট দেখাচ্ছিল। দিদিয়ে দেশোঁ কখনই তার তিন ফরোয়ার্ডকে একসাথে সামর্থ্যের সেরা অবস্থায় পাননি, তবুও প্রতিপক্ষের জন্য দলটি বিপজ্জনক প্রমাণিত হয়েছে, গ্রুপ পর্বের তিন ম্যাচেই। তার দল গোল করেছে ১০টি, ম্যাচগুলো জিতেছে স্বাচ্ছন্দ্যে। ৯ পয়েন্ট নিয়ে গ্রুপ সেরা হয়ে উঠেছে নকআউট পর্বে।