
প্রচণ্ড তাপপ্রবাহের সতর্কতার মধ্যে ম্যাচটি ছিল এবারের বিশ্বকাপের সবচেয়ে কঠিন লড়াইগুলোর একটি। ম্যাচের সময় তাপমাত্রা ছিল প্রায় ৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস। বৈরী আবহাওয়ায় লড়েছে প্যারাগুয়ের রক্ষণ বনাম ফ্রান্সের আক্রমণভাগ। রক্ষণাত্মক খেলায় লাতিন দেশটি ২০১৮ সালের বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের প্রায় আটকে দিয়েছিলো। তবে কিলিয়ান এমবাপ্পের পেনাল্টিতে দেয়া একমাত্র গোলই পার্থক্য গড়ে দিয়েছে।
শেষ পর্যন্ত প্যারাগুয়েকে ১-০ গোলে হারিয়ে বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে উঠেছে ফ্রান্স।
বজ্রঝড়ের কবলে ম্যাচে বিঘ্ন ঘটার শঙ্কা ছিলো। তেমন কিছু না হলেও ফিলাডেলফিয়ার লিঙ্কন ফাইনান্সিয়াল ফিল্ডে গরমের দাপট সইতে হয়েছে ফ্রান্স-প্যারাগুয়েকে। এরই মাঝে প্রতিপক্ষের রক্ষণ দেয়াল ভেদ করার প্রাণান্ত চেষ্টা চালায় দিদিয়ের দেশমের ফ্রান্স। প্যারাগুয়ে গোল দেয়ার চেয়ে প্রতিপক্ষের আক্রমণ নষ্ট ও ছন্দে ব্যাঘাত ঘটাতে মরিয়া ছিলো। দৃষ্টিকটু কিছু ফাউলও করেছে তারা। যে কারণে খেলা শেষেও উভয়পক্ষের হাতাহাতি ছাড়াতে এগিয়ে যান দেশম।
ম্যাচের আগে যেমনটা ধারণা করা হয়েছিল, মাঠের লড়াই শুরু হতেই তেমন কিছুর দেখা মেলে। এমবাপ্পে-দেম্বেলে-ওলিসেদের আটকাতে পুরোপুরি রক্ষণাত্মক কৌশল নেয় প্যারাগুয়ে। বেশিরভাগ সময় তাদের আউটফিল্ডের ১০ জন খেলোয়াড়ই ডি-বক্সে ও এর আশেপাশে অবস্থান নিয়ে থাকে। ট্রানজিশনের সময়ও তাদের সংঘবদ্ধ কৌশল ছিল দারুণ। মাঝেমধ্যে পাল্টা আক্রমণে উঠলেও, তা ব্যর্থ হওয়ার পর অসাধারণ ক্ষিপ্রতায় তারা আবার ছুটে আসছিল রক্ষণে। তাইতো, প্রথম ২৫ মিনিটে ৮০ শতাংশের বেশি সময় পজেশন রেখেও উল্লেখযোগ্য কিছুই করতে পারেনি ফরাসিরা। মাঝে একবার বেশ দূর থেকে চেষ্টা চালান মানু কোনে, তবে তার শট লক্ষ্যে থাকেনি।
প্রথম হাইড্রেশন ব্রেকের পর, প্যারাগুয়ের জমাট রক্ষণ একটু একটু করে উন্মুক্ত হতে থাকে। তবুও প্রথমার্ধে একবারও দলটির গোলরক্ষককে পরীক্ষায় ফেলতে পারেনি ফ্রান্স। ৩১তম মিনিটে প্রথমবার তারা ভালো একটা সুযোগ তৈরি করে। ডান দিক থেকে উসমান দেম্বেলে ডি-বক্সে দারুণ ক্রস বাড়ান; কিন্তু প্রতিপক্ষের চ্যালেঞ্জের মুখে হেড করতেই পারেননি এমবাপ্পে। দ্বিতীয়ার্ধের শুরু থেকে দৃশ্যপট বদলাতে শুরু করে। প্যারাগুয়ে একটু ওপরে উঠে চেষ্টা করতে থাকে, তাতে ফ্রান্সের আক্রমণের জায়গাও তৈরি হয়। পরপর দুই মিনিটে দারুণ দুটি সুযোগও পায় তারা।
৫২তম মিনিটে ফ্রান্স গোলরক্ষক মাইক মিয়াঁ বল ধরে, প্রতিপক্ষের খেলোয়াড়দের মাঝমাঠে উঠে আসতে দেখে এমবাপ্পের উদ্দেশ্যে লম্বা করে বল বাড়ান, ক্ষিপ্র গতিতে সবাইকে পেছনে ফেলে ছুটে যান এমবাপ্পে; কিন্তু তার শট নেয়ার আগেই ক্লিয়ার করেন ডিফেন্ডার কাসেরেস।
এরপর, ডি-বক্সের বাইরে থেকে বুলেট গতির শট নেন কোনে। এবার বল লক্ষ্যেই ছিল, দারুণ নৈপুণ্যে এক হাত দিয়ে বল বাইরে পাঠান প্যারাগুয়ে গোলরক্ষক ওরলান্দো হিল। অবশেষে, ৭০তম মিনিটে এমবাপ্পের সফল স্পট কিকে ডেডলক ভাঙে। দেজিরে দুয়ে ডি-বক্সে ফাউলের শিকার হলেও, প্রথমে খেয়াল করেননি রেফারি। খেলা চলতে থাকে। বেশ কিছুক্ষণ পর, ভিএআরের পরামর্শে, সাইড মনিটরে দেখে সিদ্ধান্ত পাল্টান রেফারি। প্যারাগুয়ের খেলোয়াড়দের প্রতিবাদ চলতে থাকে, ডাগআউটে দলটির কোচ ইঙ্গিতে বলার চেষ্টা করেন, ডাইভ দিয়েছে দুয়ে। এমনকি হাইড্রেশন ব্রেকের সময়ও এমবাপ্পের কাছে গিয়ে প্যারাগুয়ের একজন কিছু একটা বলেন, তাতেও সামান্য উত্তেজনার সৃষ্টি হয়।
গোল্ডেন বুটের লড়াইয়ে আবারও শীর্ষে উঠলেন এমবাপ্পে, সাতটি গোল ও দুটি অ্যাসিস্ট নিয়ে। সমান সাতটি গোল করেছেন লিওনেল মেসি। বিশ্বকাপে এমবাপ্পের মোট গোল হলো ১৯টি, একটি বেশি নিয়ে তালিকার চূড়ায় মেসি। ওই গোলের পরও কিছুক্ষণ, মাঠের খেলায় কিছুটা উত্তাপ বজায় থাকে। অহেতুক কিছু কড়া ফাউলেরও দেখা মেলে।
নির্ধারিত সময়ের এক মিনিট বাকি থাকতে আবার ভীতি ছড়ান এমবাপ্পে। রায়ান শের্কির পাস ধরে রিয়াল মাদ্রিদ ফরোয়ার্ডের জোরাল শট ঝাঁপিয়ে রুখে দেন গোলরক্ষক। ১০ মিনিট যোগ করা সময়ে আরও দুটি দারুণ সুযোগ পান এমবাপ্পে। ডি-বক্সের মুখ থেকে তার জোরাল শট ঝাঁপিয়ে আটকানোর পর, ফিরতি বলে তার দ্বিতীয় প্রচেষ্টাও রুখে দেন হিল।
সেমিফাইনালে ওঠার লড়াইয়ে মরক্কোর বিপক্ষে খেলবে ফ্রান্স। গত আসরে আফ্রিকার এ দলকে হারিয়েই ফাইনালে উঠেছিল দেশমের দল।