
সেমিফাইনালে উঠার লড়াইয়ে মুখোমুখি ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা ও ৭২ বছর পর কোয়ার্টার ফাইনাল উঠা সুইজারল্যান্ড। বাংলাদেশ সময় আজ সকাল ৭টায় যুক্তরাষ্ট্রের কানসাস সিটি স্টেডিয়ামে শুরু হবে ম্যাচটি। অতীতে সাতবারের দেখায় সুইজারল্যান্ড কখনো আর্জেন্টিনাকে হারাতে পারেনি; ৫টিতে হেরেছে এবং ২ ম্যাচ হয়েছে ড্র। এছাড়া ১৯৬৬ ও ২০১৪ বিশ্বকাপের দুই লড়াইয়েও জয় পেয়েছিল আলবিসেলেস্তেরা। দুই দলের সর্বশেষ ২০১৪ বিশ্বকাপ সাক্ষাতের স্কোয়াড থেকে মাত্র তিন খেলোয়াড় লিওনেল মেসি, সুইস অধিনায়ক গ্রানিত জাকা এবং ডিফেন্ডার রিকার্দো রদ্রিগেজ খেলবেন আজকের ম্যাচে। আর্জেন্টিনার কোয়ার্টারে ওঠার পথ ছিল নাটকীয়তায় ভরপুর। ‘জে’ গ্রুপে প্রত্যেক ম্যাচ জিতে নকআউটে আসে লিওনেল স্কালোনির শিষ্যরা। এরপর শেষ ৩২-এর ম্যাচে কেপ ভার্দের সঙ্গে অতিরিক্ত সময়ে ৩-২ গোলের ব্যবধানে জয় পায় দলটি। শেষ ষোলোর ম্যাচে মিশরের বিপক্ষে ২-০ ব্যবধানে পিছিয়ে পড়ার পর শেষ ১১ মিনিটের দুর্দান্ত কামব্যাকে ৩-২ ব্যবধানে নাটকীয় জয় পায় আর্জেন্টিনা।
২০২২ বিশ্বকাপে গ্রুপ পর্বে সৌদি আরবের সঙ্গে হারার পর থেকে টানা ১১ ম্যাচ অপরাজিত রয়েছে বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা। ৩৯ বছর বয়সী অধিনায়ক লিওনেল মেসি ৫ ম্যাচে ৮ গোল নিয়ে গোল্ডেন বুটের রেসে রয়েছেন কিলিয়ান এমবাপের ঠিক পেছনে। ২১ গোল নিয়ে মেসি এখন বিশ্বকাপ ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতা। ম্যাচণ্ডপূর্ববর্তী সংবাদ সম্মেলনে কোচ লিওনেল স্কালোনি বলেন, ‘লিও প্রতিটি ম্যাচে নিজের সেরাটা দিচ্ছেন। যখন বুঝতে পারে বিপজ্জনক পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে তখন সে একটি মেশিনের মতো কাজ করে।’
এদিকে কলম্বিয়াকে টাইব্রেকারে হারিয়ে ৭২ বছর পর বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে জায়গা করে নেওয়ার পর সুইজারল্যান্ডে বইছে উচ্ছ্বাসের হাওয়া। ১৯৫৪ সালের পর আবার শেষ আটে উঠে আত্মবিশ্বাসে টইটম্বুর দলটি। কিন্তু এবার তাদের সামনে বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা, যারা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নিজেদের আধিপত্যের ছাপ রেখে চলেছে। ২০১৪ সালের সেই ম্যাচের স্মৃতি এখনো ভোলেননি বর্তমান অধিনায়ক গ্রানিত জাকা। অতিরিক্ত সময়ে হেরে বিদায় নেওয়া সেই লড়াই আজও তার কাছে অপূর্ণতার গল্প। সেই কারণেই এবারের ম্যাচে প্রতিশোধের আবেগও জড়িয়ে আছে। জাকা বলেন, ‘২০১৪ সালের হার আমাদের অনেক কষ্ট দিয়েছিল, সেবার আমরা প্রায় তাদের ধরে ফেলেছিলাম।’
সুইস শিবিরের বিশ্বাস, এবার তাদের দল আগের চেয়ে অনেক বেশি পরিণত। গোলবারের নিচে গ্রেগর কোবেল আস্থার প্রতীক হয়ে উঠেছেন। মাঝমাঠে জাকা ও রেমো ফ্রয়লারের সমন্বয় দলকে দিয়েছে ভারসাম্য, আর কোচ মুরাত ইয়াকিনের কৌশলী পরিকল্পনা সুইজারল্যান্ডকে করেছে আরও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ। এই ম্যাচকে নিজেদের ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে বড় উপলক্ষ হিসেবে দেখছেন ফরোয়ার্ড ব্রিল এম্বোলোও, ‘সম্ভবত এটি আমার, আমাদের দল এবং পুরো জাতির জন্য সর্বকালের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খেলা হতে যাচ্ছে।’
আর্জেন্টিনাকে নিয়ে সুইসদের ভয় যেমন আছে, তেমনি আছে আশাও। লিওনেল মেসি দুর্দান্ত ছন্দে থাকলেও এবারের টুর্নামেন্টে আর্জেন্টিনাকে কয়েকটি ম্যাচে চাপে পড়তে হয়েছে। সেই জায়গাটিকেই সুযোগ হিসেবে দেখছে সুইজারল্যান্ড। তাদের বিশ্বাস, ব্যক্তিগত প্রতিভার বিপক্ষে দলগত শৃঙ্খলাই হতে পারে সবচেয়ে কার্যকর অস্ত্র। সেই ভাবনারই প্রতিফলন সাবেক সুইস তারকা ব্লেরিম জেমাইলির কথায়, ‘আর্জেন্টিনার রয়েছে অসাধারণ কিছু একক তারকা, কিন্তু সুইজারল্যান্ডের আছে একটি সংগঠিত দল।’ পরিসংখ্যানও সুইসদের পক্ষে কথা বলছে। ২০২২ বিশ্বকাপে পর্তুগালের কাছে হারের পর বড় কোনো টুর্নামেন্টের নির্ধারিত সময়ে আর পরাজয়ের মুখ দেখেনি দলটি। সেই ধারাবাহিকতাই তাদের আত্মবিশ্বাসের ভিত্তি।
ইতিহাস বলছে, ১৯৫৪ সালে শেষবার বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে খেলতে নেমে প্রচণ্ড গরমের মধ্যে অস্ট্রিয়ার কাছে ৭-৫ গোলে হেরে বিদায় নিয়েছিল সুইজারল্যান্ড। সাত দশক পর আবারও উত্তপ্ত আবহাওয়ায় শেষ আটের লড়াই। তবে এবার লক্ষ্য শুধু ভালো খেলা নয়, বিশ্বচ্যাম্পিয়নকে হারিয়ে নিজেদের ফুটবল ইতিহাসে সবচেয়ে স্মরণীয় এক ম্যাচ উপহার দেওয়া।তবে ম্যাচের আগে ইনজুরির খবর সুইস শিবিরে দুশ্চিন্তা বাড়িয়েছে। হাঁটুতে চোটের কারণে দলের অন্যতম ভরসা ৩ গোল করা ২০ বছর বয়সী জোহান মানজাম্বি এই ম্যাচে খেলতে পারবেন না। দলের নির্ভরযোগ্য এই স্ট্রাইকারের অনুপস্থিতি নিয়ে কোচ ইয়াকিন বলেন, ‘দুর্ভাগ্যবশত জোহান মানজাম্বিকে এই ম্যাচে পাব না। সে আমাদের দলকে মোমেন্টাম দিত এবং এই বিশ্বকাপে নিজের সেরাটা দিয়েছিল।‘ এছাড়া লুকা জাকুয়েজ ও মিচেল এবিশার ইনজুরির কারণে দলের বাইরে আলাদাভাবে অনুশীলন করছেন। এই লড়াই মূলত আর্জেন্টিনার আক্রমণাত্মক মিডফিল্ড বনাম সুইজারল্যান্ডের ডিফেন্সিভ মিড-ব্লকের। সুইস কোচ মুরাত ইয়াকিনের মূল পরিকল্পনা হবে গ্রানিত জাকা ও রেমো ফ্রুলারের মতো অভিজ্ঞ মিডফিল্ডারদের দিয়ে আর্জেন্টিনার পাসিং লাইন ব্লক করা।