
বিশ্বকাপসহ বড় টুর্নামেন্টে বেসরকারি বিনিয়োগ আনার ফিফার পরিকল্পনা ঘিরে বিরোধিতা জোরালো হয়েছে আরও। উয়েফার ৫৫ সদস্যদেশ বিশ্বকাপসহ ফিফার সব প্রতিযোগিতা বর্জনের হুমকি দেওয়ার পর এবার মধ্য ও উত্তর আমেরিকার ফুটবল সংস্থা কনকাকাফও প্রস্তাবটি প্রত্যাখ্যান করেছে। যদিও কনকাকাফ বিশ্বকাপ বর্জনের ঘোষণা দেয়নি, তবে তাদের ৪১ সদস্যদেশ একযোগে ফিফার পরিকল্পনার বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছে।
সমালোচনার মুখে ফিফাও আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দিয়ে নিজেদের অবস্থান ব্যাখ্যা করেছে এবং দাবি করেছে, এই পরিকল্পনার মাধ্যমে ফুটবল বা ফিফার নিয়ন্ত্রণ কোনোভাবেই বিক্রি করা হচ্ছে না।
কনকাকাফের ৪১ সদস্য দেশের ফুটবল সংস্থার সভাপতিদের বৈঠকের পর দেওয়া বিবৃতিতে বলা হয়েছে, প্রস্তাবটি তৈরির ক্ষেত্রে যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়নি। সদস্যরা কৃত্রিমভাবে নির্ধারিত সংক্ষিপ্ত সময়সীমা, ফিফার সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর পর্যালোচনা ও অনুমোদনের অনুপস্থিতি এবং ইতিহাসের সবচেয়ে লাভজনক বিশ্বকাপ আয়োজনের পরও নতুন ও বিদ্যমান ‘ফিফা ফরোয়ার্ড’ কর্মসূচির অর্থায়নে বেসরকারি বিনিয়োগের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। একই সঙ্গে তারা আরও স্বচ্ছতা ও সুশাসনের প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করে প্রস্তাবটি প্রত্যাখ্যানের ঘোষণা দেন।
এর আগে উয়েফা স্পষ্ট জানিয়ে দেয়, ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর বিতর্কিত প্রস্তাব অনুমোদন পেলে ইউরোপের ৫৫ সদস্যদেশ বিশ্বকাপসহ ফিফার সব প্রতিযোগিতা বর্জন করবে। ফলে ফিফার প্রস্তাব ঘিরে ইউরোপের পাশাপাশি কনকাকাফের বিরোধিতাও এখন আরও বড় চাপ তৈরি করেছে। বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ফিফার প্রস্তাবিত ‘ফিফা ফরোয়ার্ড এন্টারপ্রাইজ (এফএফই)’।
প্রায় ২ হাজার কোটি মার্কিন ডলার মূল্যের এই নতুন প্রতিষ্ঠানের ২০ শতাংশ শেয়ার বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের কাছে বিক্রির পরিকল্পনা করেছে ফিফা। সম্ভাব্য প্রধান বিনিয়োগকারী হিসেবে আলোচনায় রয়েছে মার্কিন বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান থ্রাইভ ইটার্নালের নেতৃত্বে থাকা জশুয়া কুশনার। ইনফান্তিনো সদস্যদেশগুলোকে পাঠানো এক চিঠিতে জানিয়েছেন, পরিকল্পনাটি অনুমোদিত হলে ২০২৭ থেকে ২০৩১ চক্রে ‘ফিফা ফরোয়ার্ড’ কর্মসূচির অনুদান ৮০ লাখ ডলার থেকে বাড়িয়ে ২ কোটি ডলারে উন্নীত করা হবে। পাশাপাশি সমর্থনকারী সদস্যদেশগুলোকে এককালীন আরও ২ কোটি ডলার দেওয়া হবে। তবে প্রস্তাবটি পাস না হলে অনুদান ১ কোটি ডলারে সীমিত থাকবে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এই বিষয়টিকে অনেকেই সদস্যদেশগুলোর ওপর পরোক্ষ চাপ হিসেবে দেখছেন। তবে ক্রমবর্ধমান বিরোধিতার জবাবে ফিফা বলেছে, বিভিন্ন কনফেডারেশনের মতামত তারা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে এবং একটি উন্মুক্ত ও গণতান্ত্রিক পরামর্শ প্রক্রিয়ার প্রতিশ্রুতিতে অটল রয়েছে। সংস্থাটির দাবি, গণমাধ্যমে প্রকাশিত কিছু ভুল তথ্যের কারণে এই পরামর্শ প্রক্রিয়া ব্যাহত হয়েছে। তাই সব সদস্য সংস্থাকে পূর্ণাঙ্গ তথ্যের ভিত্তিতে ভোট দেওয়ার সুযোগ নিশ্চিত করতেই আলোচনা অব্যাহত রাখা হবে।
ফিফার ভাষ্য অনুযায়ী, এফএফই গঠনের একমাত্র উদ্দেশ্য হলো সদস্য সংস্থাগুলোকে নিজ নিজ দেশে ফুটবলের বাণিজ্যিক সুযোগ থেকে আরও বেশি সুবিধা এনে দেওয়া। সংস্থাটি জোর দিয়ে বলেছে, ‘কেউ ফুটবল বিক্রি করছে না’ এবং ফিফা কখনোই ফুটবলের নিয়ন্ত্রণ বা মূল পরিচালন কাঠামো হস্তান্তরের কথা বিবেচনা করেনি। ফিফা আরও জানিয়েছে, এফএফই ফিফার বাণিজ্যিক ও মাঠপর্যায়ের কার্যক্রম পরিচালনার জন্য একটি সহযোগী প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করবে, যা সম্পূর্ণভাবে ফিফার মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণে থাকবে। এই কাঠামো থেকে অর্জিত অতিরিক্ত বাণিজ্যিক আয় ২১১ সদস্য সংস্থার মধ্যে বণ্টন করা হবে, যাতে তারা নিজ নিজ দেশে ফুটবলের উন্নয়নে আরও বেশি বিনিয়োগ করতে পারে।
সংস্থাটির দাবি, আগামী চার বছরে (২০২৭-২০৩০) প্রতিটি সদস্য সংস্থা ২ কোটি মার্কিন ডলার ‘ফিফা ফরোয়ার্ড ডেভেলপমেন্ট’ তহবিল পাবে, তারা প্রস্তাবের পক্ষে থাকুক বা না থাকুক। পাশাপাশি ‘ফিফা ফাস্ট ফরোয়ার্ড প্রোগ্রাম’-এর আওতায় অতিরিক্ত এককালীন ২ কোটি মার্কিন ডলারের উন্নয়ন তহবিলের সুযোগ থাকবে। তবে এই অতিরিক্ত তহবিল সম্পূর্ণ ঐচ্ছিক এবং বাহ্যিক বিনিয়োগের মাধ্যমে অর্থায়ন করা হবে বলে জানিয়েছে ফিফা। ফিফা আরও স্পষ্ট করেছে, সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্য সংস্থার সমর্থন না পেলে তাদের বাণিজ্যিক কার্যক্রমে কোনো পরিবর্তন আনা হবে না এবং এফএফই গঠনও করা হবে না। প্রস্তাবটি সম্পূর্ণ বা আংশিক অনুমোদন, সংশোধন কিংবা প্রত্যাখ্যান-সব ধরনের বিকল্পই আলোচনার জন্য উন্মুক্ত রয়েছে বলেও উল্লেখ করেছে সংস্থাটি। ফিফার ২১১ সদস্যদেশের ভোটে আগামী ১৯ সেপ্টেম্বর এই প্রস্তাবের ভাগ্য নির্ধারণ হবে। অনুমোদনের জন্য প্রয়োজন হবে সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোট এবং ফিফা কাউন্সিলের সমর্থন। ফলে উয়েফার পাশাপাশি অন্যান্য কনফেডারেশনের সমর্থন আদায় এখন বিরোধী পক্ষের জন্য যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি কনকাকাফের প্রকাশ্য প্রত্যাখ্যান ফিফার পরিকল্পনাকে আরও কঠিন পরীক্ষার মুখে ফেলেছে।