
বাংলাদেশের অস্ট্রেলিয়া সফর এবার শুধুই আরেকটি বিদেশ সফর নয়। এটি সময়ের ব্যবধান, সামর্থ্যের পরিবর্তন আর মানসিকতার বিবর্তনের গল্পও। ২৩ বছর আগে যখন প্রথমবার অস্ট্রেলিয়ায় টেস্ট খেলতে গিয়েছিল বাংলাদেশ, তখন আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে নিজেদের জায়গা তৈরি করাই ছিল সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। আর এবার সেই একই দেশে যাচ্ছে বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের পয়েন্ট তালিকার চার নম্বর দল হিসেবে। ফলে বদলে গেছে লক্ষ্য, বদলে গেছে প্রত্যাশাও। ১৮ বছর পর দ্বিপক্ষীয় সিরিজ এবং ২৩ বছর পর অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে টেস্ট খেলতে যাওয়া বাংলাদেশকে ঘিরে আত্মবিশ্বাসের সুরই শোনালেন প্রধান নির্বাচক হাবিবুল বাশার সুমন। বিমানবন্দরে দলকে বিদায় জানাতে গিয়ে তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিলেন, এই সফরের উদ্দেশ্য আর আগের মতো শুধু প্রতিপক্ষের সামনে টিকে থাকা নয়।
হাবিবুল বাশার সুমন বলেন, ‘চ্যালেঞ্জ ২৩ বছর আগেও ছিল, এখনও আছে। তখন লক্ষ্য একরকম ছিল, এখন ভিন্ন। তখনকার প্রেক্ষাপট একরকম ছিল, এখন অন্যরকম। তখন মূল লক্ষ্য ছিল সার্ভাইভ করা। এবার আমরা শুধু সার্ভাইভ করতে যাচ্ছি না, ভালো কিছু করতে চাই।’ এই বক্তব্যেই যেন ফুটে উঠেছে বাংলাদেশের ক্রিকেটের দীর্ঘ পথচলা। একসময় যেখানে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে সম্মানজনকভাবে ম্যাচ শেষ করাই ছিল সাফল্য, এখন সেখানে জয় কিংবা অন্তত প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ক্রিকেট খেলার স্বপ্ন দেখছে দল।
তবে এই আত্মবিশ্বাসের পেছনে রয়েছে বাস্তবতার উপলব্ধিও। অস্ট্রেলিয়া যে বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী টেস্ট দল, সেটি অস্বীকার করছেন না প্রধান নির্বাচক। কিন্তু তিনি মনে করেন, এই সফর বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের সামনে এমন একটি সুযোগ এনে দিয়েছে, যা তাদের ক্যারিয়ারের সংজ্ঞাই বদলে দিতে পারে। বাশার যেমনটা বলছিলেন, ‘যাদের সাথে যেটুকুই কথা হয়েছে, সবাই খুব এক্সাইটেড। গেলে আরও ভালো করে কথা হবে। সবাই এখানে বিশেষ কিছু করে ক্যারিয়ারের মনে রাখার মতো কিছু করতে চায়। আমরা জানি চ্যালেঞ্জ অনেক বেশি। অবশ্যই অস্ট্রেলিয়া অনেক শক্তিশালী দল। তবে সবাই এমন কিছু করতে চায় যাতে সারা জীবন মনে রাখতে পারবে, ক্যারিয়ারে হাইলাইট হতে পারবে। সবাই খুব পজিটিভ। জানি কাজটা অবশ্যই কঠিন। তবে কাজটা করতে পারলে সবারই ভালো লাগবে।’
বাংলাদেশের প্রস্তুতির সবচেয়ে বড় বাধা অবশ্য চোট। সিরিজ শুরুর আগেই ছিটকে গেছেন গতিতারকা নাহিদ রানা। চোটে পড়েছিলেন শরিফুল ইসলাম ও লিটন দাসও। তবে শেষ মুহূর্তে লিটনের দলে ফেরা কিছুটা স্বস্তি এনে দিয়েছে টিম ম্যানেজমেন্টকে। এনিয়ে বাশার বলেন, ‘আমাদের নিয়মিত সদস্য তিনজন বাইরে চলে গিয়েছিল-নাহিদ রানা, শরিফুল ও লিটন। লিটনকে ফিরে পেয়েছি, যা খুবই ভালো। নাহিদ রানাকে হয়তো পাব না। শরিফুলকেও যদি পাই, তাহলে সেটা আমাদের জন্য অনেক ভালো হবে। তবে লিটনের ফিরে আসা অবশ্যই ইতিবাচক লক্ষণ। এতে আমাদের ব্যাটিং আরও শক্তিশালী হলো।’ লিটনের ফেরা নিয়ে আরও প্রধান নির্বাচক বলছিলেন, ‘ইতিবাচক দিক অবশ্যই। একটা একাদশের ৩ জন খেলোয়াড় যখন থাকে না, কাজটা কঠিন হয়, যেকোনো দলের জন্য। ৩ জন বাইরে ছিল। লিটনকে পেয়েছি। নাহিদকে পাব না। শরিফুলকেও যদি পাই অনেক ভালো। তবে লিটনকে পাওয়া অবশ্যই পজিটিভ সাইন। ও ফিরে আসায় ব্যাটিং শক্তিশালী হবে।’
শুধু লিটনই নন, শরিফুল ইসলামকেও দ্বিতীয় টেস্টে পাওয়ার আশায় আছেন প্রধান নির্বাচক। তিনি বলেন, ‘আমি আশাবাদী। ওরও লিটনের মতো উন্নতি ভালো হচ্ছে। যেহেতু ফাস্ট বোলার, ফাস্ট বোলারদের জন্য বেশি পরিকল্পনা প্রয়োজন। আমি আশাবাদী শেষ টেস্টে খেলবে।’ চোটের কারণে পূর্ণশক্তির দল না পেলেও বর্তমান স্কোয়াড নিয়েই আশাবাদী বাংলাদেশ। বাশার মনে করেন, ইনজুরি আন্তর্জাতিক ক্রিকেটেরই অংশ, তাই তা নিয়ে অতিরিক্ত ভাবার সুযোগ নেই, ‘এখন যে দল এটা নিয়ে আশাবাদী। ইনজুরি সমস্যা তো থাকবেই। যখন কোনো দল যায়, কে ইনজুরিতে কে যাচ্ছে না এসব নিয়ে ভাবতে চাই না। যে দল নিয়ে যাচ্ছি এই দল নিয়েই ভালো করতে চাই।’ এই আত্মবিশ্বাসের পেছনে অতীতের একটি স্মৃতিও মনে করিয়ে দেন প্রধান নির্বাচক। নিউজিল্যান্ড সফরে মাউন্ট মঙ্গানুই টেস্টে ঐতিহাসিক জয়ের সময়ও বাংলাদেশ পূর্ণশক্তির দল নিয়ে খেলতে পারেনি। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই তিনি এবারও অসম্ভবকে উড়িয়ে দিচ্ছেন না। হাবিবুল বাশার বলেন, ‘আমরা এর আগে নিউজিল্যান্ডকে টেস্ট হারিয়েছি। সেটাও কঠিন সফর ছিল। সেখানেও সেরা একাদশ ছিল না, তখন যারা খেলতেন। অনেকে ইনজুরিতে ছিলেন। কিছুই অসম্ভব না। কঠিন তবে অসম্ভব কিছু না।’ আগামী ১৩ আগস্ট ডারউইনে শুরু হবে সিরিজের প্রথম টেস্ট। দ্বিতীয় ও শেষ টেস্ট শুরু হবে ২২ আগস্ট সাউথ ম্যাকায়েতে। ফল যাই হোক, বাংলাদেশের জন্য এই সফরের সবচেয়ে বড় পরিবর্তন হয়তো স্কোরবোর্ডে নয়, বরং মানসিকতায়। যে দল একসময় অস্ট্রেলিয়ায় গিয়ে শুধু টিকে থাকার কথা ভাবত, সেই দলই এখন মাঠে নামছে ইতিহাস গড়ার স্বপ্ন নিয়ে।