ঢাকা রোববার, ২৩ আগস্ট ২০২৬, ৮ ভাদ্র ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

শরিফুলের বীরত্বে রোমাঞ্চকর দিন বাংলাদেশের

শরিফুলের বীরত্বে রোমাঞ্চকর দিন বাংলাদেশের

মিচেল স্টার্ক যখন বাংলাদেশের ব্যাটিং লাইনআপকে ছিন্নভিন্ন করছিলেন, তখন হয়তো অস্ট্রেলিয়া ভেবেছিল ম্যাকাই টেস্টের প্রথম দিনটা তাদের জন্য একতরফা আনন্দেরই হবে।

২২ বলের মধ্যে পাঁচ উইকেট, শেষ পর্যন্ত ছয় শিকার-স্টার্কের আগুনে বাংলাদেশ গুটিয়ে যায় মাত্র ৬৪ রানে। কিন্তু অস্ট্রেলিয়ার সেই স্বস্তি বেশিক্ষণ স্থায়ী হতে দিলেন না শরিফুল ইসলাম।

ব্যাট হাতে বাংলাদেশের হয়ে সর্বোচ্চ ১৪ রান করার পর বল হাতে যেন অন্য এক শরিফুলকে দেখা গেল। ইনজুরি কাটিয়ে একাদশে ফেরা বাঁহাতি এই পেসারের তোপে অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিং লাইনআপও বারবার কেঁপে উঠেছে। প্রথম দিন শেষে ৮ উইকেটে ১৬৫ রান নিয়ে মাঠ ছেড়েছে স্বাগতিকরা। বাংলাদেশের বিপক্ষে তাদের লিড ১০১ রান হলেও ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি নিজেদের হাতে নিতে পারেনি অস্ট্রেলিয়া। বাংলাদেশের ৬৪ রানের জবাবে ব্যাট করতে নেমে শুরুতেই স্বস্তিতে ছিল না অস্ট্রেলিয়া। তাসকিন আহমেদের বলে ম্যাট রেনশ ৮ রানে ফিরলে ২২ রানে প্রথম উইকেট হারায় স্বাগতিকরা। এরপর বল হাতে নিজের প্রথম স্পেলেই ম্যাচের রং বদলে দেন শরিফুল। অষ্টম ওভারে এসে প্রথমে ট্র্যাভিস হেডকে ২২ রানে বোল্ড করেন তিনি। চার বল পর মার্নাস লাবুশেনকেও ফেরান মাত্র ৪ রানে। ৪১ রানেই তিন উইকেট হারিয়ে অস্ট্রেলিয়া তখন চাপে। তবে সেখান থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেন স্টিভ স্মিথ ও ক্যামেরন গ্রিন। চতুর্থ উইকেটে দুজনের ৭৭ রানের জুটি অস্ট্রেলিয়াকে বিপদমুক্ত করার পথ দেখায়। বাংলাদেশকে ফের চাপে ফেলার মুহূর্তে জুটি ভাঙেন সেই শরিফুলই। ৭৪ বলে ৪২ রান করা স্মিথকে এলবিডব্লিউয়ের ফাঁদে ফেলেন তিনি।

রিভিউ নিয়েও বাঁচতে পারেননি অস্ট্রেলিয়ার সাবেক অধিনায়ক; আম্পায়ার্স কলে সিদ্ধান্ত বহাল থাকে। স্মিথ ফেরার পর অস্ট্রেলিয়ার ইনিংসে আবারও নামে ধস। মেহেদী হাসান মিরাজের বলে অ্যালেক্স ক্যারি ৫ রানে ফিরে যাওয়ার পর মাত্র তিন রানের মধ্যে চার উইকেট হারায় স্বাগতিকরা। আর সেই ধসের মূল কারিগর হয়ে ওঠেন শরিফুল।

পরপর বেউ ওয়েবস্টার, প্যাট কামিন্স ও মিচেল স্টার্ককে ফিরিয়ে পাঁচ উইকেট পূর্ণ করেন তিনি। ওয়েবস্টার গোল্ডেন ডাক মেরে ফেরেন এলবিডব্লিউ হয়ে। রিভিউ নিয়েও সিদ্ধান্ত বদলাতে পারেননি তিনি। এরপর কামিন্সকে লিটন দাসের ক্যাচ বানান শরিফুল। দুই বল পর বাংলাদেশের ইনিংসের সবচেয়ে বড় কাঁটা স্টার্ককেও বোল্ড করে দেন তিনি। মাত্র পাঁচ বলের মধ্যে তিন উইকেট। আর স্টার্কের পর স্টার্ককেই যেন জবাব দিলেন শরিফুল। বাংলাদেশের ইনিংসে ৬ উইকেট নেওয়া অস্ট্রেলিয়ান পেসারকে নিজের ষষ্ঠ শিকার বানিয়ে ম্যাকাইয়ের প্রথম দিনটাকে দুই পেসারের ব্যক্তিগত লড়াইয়ে পরিণত করেন বাংলাদেশের এই বাঁহাতি। শেষ পর্যন্ত ১১ ওভারে ৩৫ রান দিয়ে ছয় উইকেট নিয়ে দিন শেষ করেছেন শরিফুল। প্রথম দিন পতন হওয়া ১৮ উইকেটের ১২টিই গেছে স্টার্ক ও শরিফুলের শিকার হিসেবে। দুই পেসারের এমন দাপটে ব্যাটারদের জন্য ম্যাকাইয়ের পিচ যেন হয়ে উঠেছে আতঙ্কের জায়গা। অস্ট্রেলিয়ার ইনিংসে এখন বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তার নাম ক্যামেরন গ্রিন। এক প্রান্ত আগলে রেখে ৮টি বাউন্ডারিতে ৫১ রানে অপরাজিত আছেন তিনি। নাথান লায়ন ১০ রানে তাকে সঙ্গ দিচ্ছেন। দুজনের অবিচ্ছিন্ন জুটি এখন পর্যন্ত ১৭ রান যোগ করেছে। বাংলাদেশের জন্য অবশ্য পরিস্থিতি পুরোপুরি হতাশার নয়। ৬৪ রানে অলআউট হওয়ার পরও অস্ট্রেলিয়াকে আটকে রাখার সুযোগ তৈরি করেছে বোলাররা। প্রথম ইনিংসে ১০১ রানের লিড নিয়েও তাই প্যাট কামিন্সের দলের নিশ্চিন্ত থাকার সুযোগ নেই। দিনের গল্পটা যেন দুই পেসারের। শুরুতে স্টার্কের আগুনে বাংলাদেশের ব্যাটিং পুড়েছে, পরে সেই আগুনই শরিফুল ফিরিয়ে দিয়েছেন অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিংয়ে।

এখন দ্বিতীয় দিনের অপেক্ষা-গ্রিন কি অস্ট্রেলিয়ার লিড আরও বাড়াবেন, নাকি শরিফুলের আগুনে আবারও পুড়বে স্বাগতিকদের শেষ দুই উইকেট? ফিরেই শরিফুলের ক্যারিয়ারে নতুন অধ্যায়: ম্যাকাই টেস্টের প্রথম দিনটা শুরু হয়েছিল মিচেল স্টার্কের নামে। শেষদিকে এসে গল্পের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠলেন শরিফুল ইসলাম।

সকালে অস্ট্রেলিয়ার বাঁহাতি পেসার বাংলাদেশের ব্যাটিংকে ৬৪ রানে গুটিয়ে দিয়ে যে ধাক্কা দিয়েছিলেন, বিকালে তারই পাল্টা জবাব দিলেন বাংলাদেশের বাঁহাতি পেসার।

অস্ট্রেলিয়ার প্রথম আট উইকেটের ছয়টিই তুলে নিয়ে ক্যারিয়ারের প্রথম টেস্ট ফাইফার পেলেন শরিফুল। ডারউইন টেস্টে চোটের কারণে খেলতে পারেননি শরিফুল। তার জায়গায় সুযোগ পেয়েছিলেন এবাদত হোসেন। সেই ম্যাচে হাসান মাহমুদের সঙ্গে বাংলাদেশের পেস আক্রমণ অস্ট্রেলিয়ান ব্যাটারদের বেশ ভুগিয়েছিল। ম্যাকাইয়ে ফিরেই শরিফুল যেন বুঝিয়ে দিলেন, একাদশের বাইরে থাকার সময়টা তিনি ভুলে যাননি।

আজ টেস্টের প্রথম দিনে অস্ট্রেলিয়ার ইনিংসে প্রথম বড় আঘাত অবশ্য এসেছিল তাসকিন আহমেদের হাত ধরে। ম্যাট রেনশকে ৮ রানে ফেরানোর পর বল হাতে নিজের আসল কাজ শুরু করেন শরিফুল। ৪৩ রানে অস্ট্রেলিয়া প্রথম উইকেট হারানোর পরই ট্রাভিস হেডকে ইনসাইড এজে বোল্ড করেন তিনি। একই ওভারে মার্নাস লাবুশেনকে বোল্ড করে অস্ট্রেলিয়ার টপ অর্ডারে কাঁপন ধরিয়ে দেন।

এরপর কিছুটা সময় প্রতিরোধ গড়েছিলেন স্টিভ স্মিথ ও ক্যামেরন গ্রিন। তাদের ৭৭ রানের জুটি অস্ট্রেলিয়াকে বিপদ থেকে টেনে তুলছিল। কিন্তু সেই জুটিও ভাঙেন শরিফুল। ৪২ রান করা স্মিথকে এলবিডব্লিউ করে ফেরান তিনি। স্মিথের পর যেন অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিংয়ের দরজা খুলে যায়।

বেউ ওয়েবস্টার, প্যাট কামিন্স ও মিচেল স্টার্ক-তিনজনকেই পরপর সাজঘরে পাঠান শরিফুল। এর মধ্যে কামিন্স ও স্টার্ককে ফিরিয়ে পাঁচ ও ছয় উইকেট পূর্ণ করেন তিনি।

স্টার্ককে আউট করার মুহূর্তটিই হয়তো শরিফুলের দিনের সবচেয়ে বড় প্রতীক। সকালে স্টার্ক বাংলাদেশের ছয় ব্যাটারকে ফিরিয়েছিলেন। তার আগুনে বাংলাদেশ থেমেছিল মাত্র ৬৪ রানে। কয়েক ঘণ্টা পর সেই স্টার্কই বাংলাদেশের শরিফুলের ষষ্ঠ শিকার। একই দিনে দুই বাঁহাতি পেসারের দুই ভিন্ন গল্প। শরিফুলের বোলিং ফিগার শেষ পর্যন্ত দাঁড়ায় ৮.৫ ওভারে ৩৪ রান দিয়ে ৬ উইকেট। টেস্টে এর আগে এক ইনিংসে পাঁচ উইকেট তো দূরের কথা, তার সেরা ছিল ২৮ রানে ৩ উইকেট। দুই ইনিংস মিলিয়ে তার সেরা ছিল ৫৬ রানে ৫ উইকেট। এক দিনেই সেই সব রেকর্ড পেছনে ফেললেন তিনি। ফাইফারটাও এসেছে দ্রুত। বাংলাদেশের বোলারদের মধ্যে দ্রুততম পাঁচ উইকেটের রেকর্ড অবশ্য এখনো তাইজুল ইসলামের। ২০১৮ সালে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে চট্টগ্রাম টেস্টে মাত্র ৬.৫ ওভারে পাঁচ উইকেট নিয়েছিলেন তিনি। শরিফুলের লেগেছে ৮.৫ ওভার। বাংলাদেশের ইতিহাসে দ্রুততম ফাইফারের তালিকায় তাইজুলের পরেই থাকছেন তিনি।

অস্ট্রেলিয়ার মাটিতেও এই পারফরম্যান্সের আলাদা গুরুত্ব আছে। আগের টেস্টে হাসান মাহমুদের পর শরিফুল হলেন বাংলাদেশের দ্বিতীয় পেসার, যিনি অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে এক ইনিংসে পাঁচ উইকেট পেলেন। আর দুজনের ফাইফারই এসেছে একই সিরিজে, পরপর দুই টেস্টে।

মজার ব্যাপার, শরিফুলের ব্যক্তিগত সাফল্য এসেছে এমন এক ম্যাচে যেখানে বাংলাদেশ ব্যাট হাতে ভয়াবহভাবে ব্যর্থ। মিচেল স্টার্কের ছয় উইকেটের তোপে মাত্র ৬৪ রানে শেষ হয় বাংলাদেশের ইনিংস। কিন্তু সেই ধসের পরও শরিফুল অস্ট্রেলিয়াকে স্বস্তিতে থাকতে দেননি।

অস্ট্রেলিয়ার প্রথম আট উইকেটের ছয়টিই যখন একজন বোলারের, তখন সেটিকে আর নিছক ভালো স্পেল বলা যায় না। শরিফুলের জন্য এটি ছিল নিজের সামর্থ্যের বড় ঘোষণা। চোটের কারণে এক টেস্ট বাইরে থাকা, ফিরে এসে ক্যারিয়ারের প্রথম ফাইফার-ম্যাকাইয়ে শরিফুলের গল্পটা তাই শুধু ছয় উইকেটের নয়; এটি ফিরে এসে নিজের জায়গা পুনরুদ্ধারেরও গল্প!

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত