
কিছু ফুটবলগল্পের শুরু হয় একটি দেশের জার্সি দিয়ে, আবার কিছু গল্পের শিকড় ছড়িয়ে থাকে একাধিক মহাদেশে। সুলিভান পরিবারের গল্পটা তেমনই। যুক্তরাষ্ট্রে বেড়ে ওঠা তিন ভাইয়ের ফুটবলপথ এখন তিন রকম হলেও তাদের পারিবারিক গল্পের একটি সুতো এসে মিশেছে বাংলাদেশে।
বড় দুই ভাই রোনান ও ডেক্লান বাংলাদেশের বয়সভিত্তিক ফুটবলে খেলেছেন, আর ছোট ভাই কাভান সুলিভান এখন যুক্তরাষ্ট্রের ফুটবলে একের পর এক রেকর্ড ভাঙছেন! সেপ্টেম্বর মাসে সেই গল্পে সবচেয়ে উজ্জ্বল অধ্যায় যোগ করেছেন কাভান।
ফিলাডেলফিয়া ইউনিয়নের এই মিডফিল্ডার ১৭ বছর ২ দিন বয়সে এমএলএসের 'প্লেয়ার অব দ্য মান্থ' হয়েছেন। এর মধ্য দিয়ে মেজর লিগ সকারের ইতিহাসে এই পুরস্কার পাওয়া সবচেয়ে কম বয়সী খেলোয়াড়ের রেকর্ড গড়েছেন তিনি।
আগের রেকর্ডটি ছিল ড্যারিল ডাইকের, যিনি ২০২০ সালে ২০ বছর ৯৮ দিন বয়সে মাসসেরা হয়েছিলেন।
কাভানের সেপ্টেম্বরের পারফরম্যান্স ছিল রীতিমতো চোখ ধাঁধানো। চার ম্যাচে করেছেন চার গোল, করিয়েছেন আরও পাঁচটি। মাত্র চার ম্যাচেই নয়টি গোল-অবদান। সেপ্টেম্বরের হিসাবে পুরো এমএলএসে গোল-অবদানে সবার ওপরে ছিলেন তিনি। তার পারফরম্যান্সের সঙ্গে ফিলাডেলফিয়ার ফলও ছিল নিখুঁত-মাসে পাঁচ ম্যাচের পাঁচটিতেই জিতেছে ইউনিয়ন। তবে সংখ্যাগুলো কাভানের গল্পের পুরোটা বলে না। সেপ্টেম্বরের আগে থেকেই ধারাবাহিকভাবে ম্যাচে প্রভাব রাখছিলেন তিনি। টানা আট ম্যাচে গোল অথবা অ্যাসিস্ট করেছেন এই কিশোর। এমএলএসের ইতিহাসে কোনো কিশোর ফুটবলারের জন্য এটিই সবচেয়ে দীর্ঘ এমন ধারা।
মাসের এক পর্যায়ে সান দিয়েগোর বিপক্ষে জোড়া গোলের সঙ্গে একটি অ্যাসিস্ট করে ম্যাচসেরাও হন তিনি।
চলতি মৌসুমেও তার পরিসংখ্যান তাই আলাদা করে বলার মতো। ২৬ ম্যাচে ৭ গোল ও ১২ অ্যাসিস্ট-মোট ১৯ গোল-অবদান। কিশোর ফুটবলারদের এক মৌসুমে এমএলএসের ইতিহাসে এই সংখ্যা এখন দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। তার ওপরে আছেন দিয়েগো ফাগুন্দেজ, ২০১৩ সালে যার গোল-অবদান ছিল ২০টি। কাভানের ১৯ গোল-অবদান আবার ২০১৮ সালে আলফনসো ডেভিসের করা কিশোর রেকর্ডের সঙ্গেও সমান। কাভানের উত্থান অবশ্য সেপ্টেম্বরেই শুরু হয়নি। মাত্র ১৪ বছর বয়সে পেশাদার অভিষেকের পর ধাপে ধাপে উঠে এসেছেন ফিলাডেলফিয়া ইউনিয়নের মূল দলে। এমএলএস নেক্সট থেকে এমএলএস নেক্সট প্রো হয়ে প্রথম দলে-এই পুরো পথ পেরিয়ে এসে মাসসেরা হওয়ার নজিরও তার আগে কেউ গড়তে পারেননি।
ক্লাবের আলো পেরিয়ে খুব দ্রুত জাতীয় দলের দরজাও খুলে যায়। সেপ্টেম্বরে প্রথমবার যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় দলে ডাক পান কাভান। ২৬ সেপ্টেম্বর পেরুর বিপক্ষে ৪-১ জয়ের ম্যাচে শুরুর একাদশে নামেন তিনি। ১৬ বছর ৩৬৩ দিন বয়সে অভিষেক করে আধুনিক যুগে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় দলের চতুর্থ সর্বকনিষ্ঠ অভিষিক্ত খেলোয়াড় হন কাভান। সেই ম্যাচে শুরু করা একাদশে তিনি ছিলেন দলের সবচেয়ে কম বয়সী খেলোয়াড়। পরে চিলির বিপক্ষে ৪-২ জয়ের ম্যাচেও খেলেছেন।
আর এখানেই বাংলাদেশের সঙ্গে কাভানের গল্পটি আলাদা মাত্রা পায়। তার মাতামহী সুলতানা আলমের শিকড় ঢাকায়। সেই পারিবারিক সূত্রেই কাভানের বড় যমজ ভাই রোনান ও ডেক্লান বাংলাদেশের হয়ে খেলার যোগ্যতা পেয়েছেন। চলতি বছর দুজনই বাংলাদেশের অনূর্ধ্ব-২০ দলের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন। বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনও তাদের জাতীয় ফুটবলের পরিসরে আনার প্রক্রিয়ায় কাজ করেছে। সুলিভান পরিবারের বাংলাদেশ-যোগ অবশ্য কেবল কাগজে-কলমে কোনো বংশপরিচয় নয়। সুলতানা আলম ঢাকার মানুষ; পরবর্তী সময়ে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে উচ্চশিক্ষা ও পেশাগত জীবনে যুক্ত হন। তার পরিবারেই পরবর্তী প্রজন্মে ফুটবল হয়ে ওঠে বড় একটি পরিচয়।
ফলে একই পরিবারের ফুটবল মানচিত্রে এখন এক অদ্ভুত সমান্তরাল ছবি। রোনান ও ডেক্লান বাংলাদেশের লাল-সবুজ জার্সিতে নিজেদের পরিচয় তৈরি করছেন। আর কাভান যুক্তরাষ্ট্রের জার্সিতে অভিষেকের পাশাপাশি ক্লাব ফুটবলে লিখছেন নিজের রেকর্ড। একজনের গল্পের সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাংলাদেশের বয়সভিত্তিক ফুটবল, অন্যজনের গল্পে আছে এমএলএসের ইতিহাস ও যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় দল। আর কাভানের বয়স এখনও মাত্র ১৭। সেপ্টেম্বরের পুরস্কারটি তাই তার যাত্রার শেষ কোনো অধ্যায় নয়; বরং এখন পর্যন্ত সবচেয়ে উজ্জ্বল একটি মাইলফলক। যে পরিবারটির এক প্রজন্মের শিকড় ঢাকায়, সেই পরিবারেরই এক কিশোর এখন যুক্তরাষ্ট্রের ফুটবলে নিজের নামটাকে রেকর্ডের পাতায় আরও বড় করে লিখে চলেছেন!