
আবুধাবির আকাশে তখন যেন উইকেটের আকাল! একের পর এক ওভার পেরিয়ে যাচ্ছে, বাংলাদেশের বোলাররা প্রাণপণ চেষ্টা করেও খুঁজে পাচ্ছেন না কাঙ্ক্ষিত ব্রেকথ্রু।
এমন সময় ইবাদত হোসেনের একটি বাউন্সার। ব্যাট চালালেন ইকরাম আলীখিল। বলটি ব্যাটের কানায় লেগে উইকেটের পেছনে ছুটল। মুহূর্তের মধ্যে ডান দিকে শরীর ছুড়ে দিলেন লিটন দাস। শূন্যে ভেসে থাকা শরীর, প্রসারিত গ্লাভস, আর অবিশ্বাস্য এক ক্যাচ! আজ এই একটি ক্যাচেই যেন বদলে গেল ম্যাচের দৃশ্যপট। কিন্তু লিটনের জন্য এটি শুধুই আরেকটি উইকেট নয়।
এই ক্যাচের সঙ্গে জড়িয়ে গেল ক্রিকেট ইতিহাসের পাতায় নিজের নাম নতুন করে লেখার গল্প। ব্যাট হাতে সেঞ্চুরি ও ফিফটি, উইকেটের পেছনে নয়টি শিকার-টেস্ট ক্রিকেটে আগে কোনো উইকেটকিপার এক ম্যাচে এমন কীর্তি দেখাতে পারেননি।
আবুধাবি টেস্টে লিটন যেন একাই খুলে বসেছেন রেকর্ডের দোকান। প্রথম ইনিংসে ব্যাট হাতে ৫৩ রান। দ্বিতীয় ইনিংসে খেলেছেন ১০২ রানের দুর্দান্ত ইনিংস। আর উইকেটের পেছনে আটটি ক্যাচ ও একটি স্টাম্পিং। সব মিলিয়ে নয়টি ডিসমিসাল। ব্যাট হাতে দুই ইনিংসেই পঞ্চাশের গণ্ডি পেরোনো, পাশাপাশি উইকেটকিপিংয়ে নয় শিকার-এক ম্যাচে এমন অলরাউন্ড কিপিং-ব্যাটিং প্রদর্শন টেস্ট ইতিহাসে প্রথম।
লিটনের এই কীর্তিতে ধূলিসাৎ হয়েছে প্রায় ছয় দশক ধরে টিকে থাকা একটি রেকর্ড। ১৯৬৬ সালে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে জোহানেসবার্গ টেস্টে দক্ষিণ আফ্রিকার ডেনিস লিন্ডসে গড়েছিলেন অনন্য নজির। দুই ইনিংসে তার ব্যাট থেকে এসেছিল ৬৯ ও ১৮২ রান। উইকেটের পেছনে নিয়েছিলেন আটটি ক্যাচ। এত দিন সেটিই ছিল এক টেস্টে দুই ইনিংসে পঞ্চাশোর্ধ্ব রান এবং সর্বোচ্চ ডিসমিসালের রেকর্ড। লিটন এবার নয়টি ডিসমিসাল করে লিন্ডসেকে ছাড়িয়ে গেলেন।
তবে গল্প এখানেই শেষ নয়। বরং সামনে অপেক্ষা করছে আরও বড় এক ইতিহাস। টেস্টের এক ম্যাচে উইকেটকিপার হিসেবে সর্বোচ্চ ডিসমিসালের বিশ্বরেকর্ড ১১টি। যৌথভাবে এই রেকর্ডের মালিক ইংল্যান্ডের জ্যাক রাসেল, দক্ষিণ আফ্রিকার এবি ডি ভিলিয়ার্স ও ভারতের ঋষভ পন্ত। রাসেল ১৯৯৫ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে জোহানেসবার্গে ১১টি ডিসমিসাল করেছিলেন। ২০১৩ সালে একই মাঠে পাকিস্তানের বিপক্ষে তার রেকর্ডে ভাগ বসান ডি ভিলিয়ার্স।
আর ২০১৮ সালে অ্যাডিলেডে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ১১টি ডিসমিসাল করে সেই তালিকায় নাম লেখান পন্ত। লিটনের সামনে এখন সেই রেকর্ডের দরজা। আর দুটি ডিসমিসাল পেলেই বসবেন বিশ্বসেরাদের পাশে।
আর তিনটি পেলেই এককভাবে নিজের করে নিতে পারবেন টেস্ট ইতিহাসের সর্বোচ্চ ডিসমিসালের রেকর্ড। আবুধাবির শেষ প্রহরে তাই শুধু বাংলাদেশের জয়-পরাজয়ের হিসাব নয়, নজর থাকবে লিটনের গ্লাভসের দিকেও।
বাংলাদেশের ক্রিকেটেও লিটনের এই কীর্তি এক নতুন উচ্চতা। এক ম্যাচে সাতটি ডিসমিসাল নিয়ে এত দিন দেশের রেকর্ডের মালিক ছিলেন খালেদ মাসুদ। ২০০৪ সালে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে সেই কীর্তি গড়েছিলেন তিনি। গতকালই আটটি ডিসমিসাল নিয়ে সেই রেকর্ড নিজের করে নিয়েছিলেন লিটন। আর আজ ইকরামের সেই দুর্দান্ত ক্যাচে পৌঁছে গেলেন নয় নম্বরে।
এক ম্যাচে উইকেটকিপারদের নয়টি ডিসমিসাল টেস্ট ইতিহাসে এর আগে ৩০ বার দেখা গেছে। লিটনের হাত ধরে সংখ্যাটি হলো ৩১। তবে এই ৩১তম ঘটনাটির গুরুত্ব অন্যদের চেয়ে আলাদা। কারণ, এই নয় শিকারের সঙ্গে জুড়ে আছে দুই ইনিংসে পঞ্চাশোর্ধ্ব রান এবং একটি সেঞ্চুরি। ইকরামের জন্য মুহূর্তটি ছিল হতাশার, বাংলাদেশের জন্য স্বস্তির। আর লিটনের জন্য? সেটি ছিল ইতিহাসের সঙ্গে হাত মেলানোর মুহূর্ত! ক্রিকেটে অনেক সময় একটি বল, একটি ক্যাচ কিংবা একটি মুহূর্ত একজন খেলোয়াড়কে আলাদা করে দেয়। আবুধাবিতে লিটনের ক্ষেত্রে ঘটেছে ঠিক সেটিই।
ব্যাট হাতে রান করেছেন, গ্লাভসে আটকে রেখেছেন প্রতিপক্ষের স্বপ্ন, আর একটি উড়ন্ত ক্যাচে পৌঁছে গেছেন এমন এক উচ্চতায়, যেখানে আগে দাঁড়ানোর সুযোগ পাননি কোনো উইকেটকিপার। লিটন এবার শুধু বাংলাদেশের ম্যাচের নায়ক নন; তিনি টেস্ট ক্রিকেটের রেকর্ড বইয়ে নতুন এক অধ্যায়ের লেখক!