ঢাকা শনিবার, ২৭ জুন ২০২৬, ১৩ আষাঢ় ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

মওলানা রুমির মসনবি শরিফ (কিস্তি- ৬/২৪)

সুলতান মাহমুদের ধন-ভাণ্ডার চুরির অভিযান

ড. মওলানা মুহাম্মদ ঈসা শাহেদী
সুলতান মাহমুদের ধন-ভাণ্ডার চুরির অভিযান

সুলতান মাহমুদ গজনবী জনগণের অবস্থা জানার জন্য রাতে একাকী টহল দিচ্ছিলেন আত্মপরিচয় গোপন করে। আলো-আঁধারে একদল চোরের আড্ডায় গিয়ে তিনি হাজির হন অতর্কিতে। চোরেরা বলল, কে ভাই তুমি, কোথায় যাও, তোমার পরিচয় বল। আমিও তোমাদের দলীয় লোক, ঘুরছি সুযোগের সন্ধানে- সুলতান জবাব দিলেন। চোরেরা বলল, তাহলে এসো আমাদের আড্ডায়। আজ রাতে অভিযানে যাওয়ার আগে প্রত্যেকে আমরা বলব কার কি কৃতিত্ব, বিশেষ যোগ্যতা আছে। যাতে অভিযানে কাজে লাগাতে পারি প্রত্যেকের যোগ্যতা সঠিকভাবে। তাদের আসল উদ্দেশ্য, সুলতান কোন ধরনের চোর তার পরীক্ষা নেওয়া, মান নির্ণয় করা। জোসনার আলো-আঁধারিতে গল্পের ছলে তারা ব্যক্ত করে প্রত্যেকের বিশেষ কৃতিত্ব।

একজন বলল, আমার কৃতিত্ব আমার দুই কানে গচ্ছিত। চুরি করতে গেলে গৃহস্থের কুকুর যখন ঘেউ ঘেউ করে তখন আমি বুঝতে পারি কুকুর কী বলছে। চোররা বলল, যদি মূল্য নির্ণয় করি তাহলে বলতে হবে দুই পয়সার বেশি হবে না তোমার এই কৃতিত্বের দাম। কুকুরের আওয়াজের মর্ম বুঝে এমন কী লাভ হবে আমাদের।

আরেক চোর বলল, আমার কৃতিত্ব আমার দুই চোখে দেখ। রাতের নিকষ অন্ধকারে আমি যাকে দেখি, দিনের আলোতে তাকে দেখলে হুবহু চিনতে পারি। আমার চোখকে ফাঁকি দিতে পারে না রাতের আঁধারি বা আলোর ঝলকানি।

আরেক চোর বলল, আমার বাহুতে এমন শক্তি ও কৃতিত্ব আছে, যা দ্রত সাহায্য করে অভিযান এগিয়ে নিতে। আর তাহল যত শক্ত মাটি হোক সিঁধ কাটতে আমার বাহুবলের শক্তি অজেয়। একেবারে সুড়ঙ্গ তৈরি করতে পারি নিমিষে।আরেক চোর বলল, আমার কৃতিত্ব সঞ্চিত আমার নাকে। আমি যদি মাটির গন্ধ শুঁকি ঠিকঠিক বলতে পারি মাটির ভেতরে লুকানো ধন কোথায় কী আছে। তখন তোমাদের বলতে দিতে পারব, মাটির কোন স্তরে কোন ধরনের ধনরত্ন সংরক্ষিত কীভাবে। মাটির গর্তের মতো মাটির দেহেও গচ্ছিত থাকে অগাধ ধনরত্ন। তবে এই রহস্য খুব কম লোকই জ্ঞাত।

সিররে আন্নাসু মাআদেন দাদ দস্ত

কে রাসুল আন রা পেয়ে ছে গুফতে আস্ত

মানুষ গুপ্তধন স্বরূপ- এ কথার রহস্য এখানে

ভেবে দেখ নবীজি বলেছেন কোন উদ্দেশ্যে।

গুপ্তধন উদ্ঘাটন করতে হলে গুপ্তধনে অভিজ্ঞ রত্নবিশারদ হতে হবে। তারাই গুপ্তধনের মর্ম বুঝতে পারবে। মানুষের প্রতিভা, ভালো মন্দের মূল্যমান নিরূপণের জন্যও প্রত্যেকের মাঝে লুক্কায়িত গুপ্তধন চেনার যোগ্য লোক হতে হবে। হাদিস শরিফে বলা হয়েছে, মানুষ প্রকৃতি স্বর্ণ ও রৌপ্যের খনির মতো। যারা ইসললামপূর্ব যুগে উত্তম ইসলাম গ্রহণের পর দ্বীনের পাণ্ডিত্য অর্জন করলে তারাই উত্তম বিবেচিত হবে। অর্থাৎ প্রত্যেকে যোগ্যতা প্রতিভা ও পাপপুণ্যের চেতনার বিচারে মৌলিক যোগ্যতার অধিকারী। তবে তার মূল্যমান বিশ্বাস ও আচবণের নিরিখে। দক্ষ জহুরীই এই মূল্যমান নির্ণায়ের ক্ষমতা রাখে। জহুরী দেহের মাটি শুঁকে বলতে পারে, কোন ধরনের ধনরত্ন গচ্ছিত আছে, প্রত্যেকের আত্মার জগতে। হ্যাঁ, মানুষের ভেতরকার প্রতিভা, যোগ্যতা ও মানবীয় গুণাবলি নিরূপণের কষ্টিপাথর আল্লাহর ওলিদের আয়ত্বে আছে। গন্ধ বিশারদ চোর বলল, কোন খনিতে কত ধনরত্ন আছে বা কোন খনি ধনরত্নশূন্য আমি বলতে পারি। মজনুর মতো আমি মাটি শুকিয়ে পেয়ে যাব লাইলিল কবরের ঠিকানা। লাইলি মারা যাওয়ার পর মজনু লাইলির গোত্রের কাছে গিয়ে জানতে চায়, লাইলির কবর কোথায়। কিন্তু কেউ তাকে বলে না লাইলির কবরের ঠিকানা। মজনু তখন কবরস্তানে গিয়ে একে একে কবরের মাটি শুঁকতে থাকে। শেষে লাইলির কবর ঠিকই আবিষ্কার করে। জনৈক আরবি কবি বলেছেন,

আরাদু লিয়ুখফু কাবরাহা আন মুহিব্বিহা

ওয়া তিবু তুরাবিল কাবরি দাল্লা আলাল কাবরি

লোকেরা চেয়েছিল তার কবর গোপন রাখবে প্রেমিকের কাছ থেকে; কিন্তু কবরের মাটির খুশবু বলে দিল লাইলির কবর কোথায় আছে।

নাসিকান্দ্রীয় বিশেষজ্ঞ চোর আরও বলল, যেকোনো জামা আমি শুঁকে বলতে পারব কোনটি ইউসুফ (আ.)-এর জামা কিংবা কোনটি কোনো দৈত্যের কাছ থেকে নেওয়া। নবীজির কথা চিন্তা কর, তিনি বলেছিলেন, আমি দূর ইয়ামেনের দিক থেকে ওয়াইস কারানির সুবাস পাচ্ছি।

এবার আরেক চোর এগিয়ে তার দক্ষতার বর্ণনা দিল। আমার বাহুতে পাঞ্জায় এমন জোর আছে যদি কোনো ফাঁদ ছুঁড়ে দেই পাহাড়ের মতো উঁচু দেয়ালের ওপর, অমনি আমি নিজে আর সবাই প্রাচীর টপকে পৌঁছে যাই কাঙ্ক্ষিত প্রাসাদে। আমার এই ফাঁদের মাজেজা নবীজির ফাঁদের মতো। তিনি ফাঁদ পেতেছিলেন আকাশের নিলীমায় দৃষ্টির সীমানায়।

হামচো আহমদ কে কমন্দ আন্দাখত জাঁশ

তা কমন্দশ বুর্দ সুয়ে আসেমাঁশ

আমার ফাঁদ নবীজির ফাঁদের মতো যিনি

রুহের ফাঁদ ছুঁড়ে দিয়েছিলেন আসমান পাড়ি।

মেরাজ রজনীতে তিনি যেভাবে সাত আসমান পাড়ি দিয়ে আরশে আজিমে পৌঁছেন, তাকে বলা যায় আসমান পাড়ি দেওয়ার ফাঁদ হিসেবে। আল্লাহ তো তাঁকে বলেন,

গোফত হক্কাশ আই কামন্দ আন্দাজে বাইত

অন যেমন দান মা রামাইতা ইজ রামাইত

বায়তুল মামুরে পাড়ি দেয়ার যে ফাঁদ পেতেছিলেন আপনি

আমারই ফাঁদ ছিল, যখন ছুঁড়েছিলেন, আপনি করেননি।

নবীজি মেরাজে আসমান পাড়ি দিয়েছিলেন। মনে হবে, তিনি উর্ধ্বলোকে ফাঁদ ছুঁড়ে আরশে গিয়েছিলেন সাত আসমান ছাড়ি। নবীজিকে আল্লাহ বলেছিলেন, ওহে যে আমার দিকে আসতে ফাঁদ ছুড়ে দিয়েছেন, এই ফাঁদ আপনি ছুড়েননি; বরং আমি নিজেই ছুঁড়েছি। আপনার সব কাজ চিন্তা ও অবস্থা আমার জন্যই নিবেদিত। আমিই আপনাকে পরিচালনা করি। ‘হে নবী, আপনি যখন কাফেরদের দিকে তীর নিক্ষেপ করেছিলেন, তখন আপনি নিক্ষেপ করেননি; বরং আল্লাহই সেই তীর নিক্ষেপ করেছিলেন।’ (সুরা আনফাল : ১৭)। নবীজির নিক্ষেপণ ছিল আল্লাহর নিক্ষেপণ। নবীর কাজ আল্লাহর কাজ। নবীজির কদমের অনুগামী আল্লাহর নেক বান্দা ওলি আল্লাহরাও আল্লাহর সেই সাহায্যে বলিয়ান। তাদের জীবন-মরণ, ধ্যান-জ্ঞান আল্লাহর জন্যই নিবেদিত। সর্বাবস্থায় আল্লাহতে সমর্পিত।

এবার বাদশাহর কৃতিত্ব জাহিরের পালা। চুরি করতে গিয়ে কোন বিশেষ কৃতিত্ব তার আছে প্রমাণ করতে হবে চোরদের দলে ভিড়তে হলে। বলল, নতুন বন্ধু! বল দেখি, তোমার এমন কী কৃতিত্ব আছে যা আমাদের শক্তির জোগান দিতে পারে।

গোফত দর রিশাম বুয়াদ খাসিয়্যাতাম

কে রহানাম মুজারেমান রা আজ নেকাম

বলল, আমার কৃতিত্ব রক্ষিত আমার দাঁড়ির ভাঁজে

যত অপারাধী পার পেয় যায় শাস্তির হাত থেকে।

আমার কৃতিত্ব যা আছে আমার এই দাড়ির মাঝেই আছে। দাগি আসামিদের ছাড়িয়ে নেওয়ার বিশেষ কৃতিত্ব আছে আমার দাঁড়ির ভাঁজে। ধর, ফাঁসির আসামিকে জল্লাদের হাতে সোপর্দ করা হয়েছে, সেই মুহূর্তে যদি নীরবে মুখের না-বাচক ইঙ্গিতে আমার দাড়ি দুলে উঠে তখন অপরাধী শাস্তির হাত থেকে রেহাই পেয়ে যাবে।

মুজরেমান রা চোন বে জল্লাদান দাহান্দ

চোন বেজুম্বদ রিশে মন ঈশান রাহান্দ

অপরাধীদের যখন সোপর্দ করা হয় জল্লাদের হাতে

আমার দাঁড়ি নড়ে উঠলে ওরা মুক্তি পেয়ে যায় তাতে।

চোরেরা শুনে বলল, আমাদের দলনেতা কুতুব তুমিই। আমরা যদি কোনো বিপদের সম্মুখীন হই আমাদের জন্য যদি শাস্তি অবধারিত হয়, তখন তোমার দাড়ি নেড়ে দিলে আমরা মুক্তি পেয়ে যাব- এর চেয়ে বড় পাওনা আর কী হতে পারে। কাজেই তুমি আমাদের দলনেতা। চল সবাই, আজ রাতের অভিযান হবে রাজপ্রাসাদে।

চোরেরা চলল ধীর-পদক্ষেপে সুলতান মাহমুদের রাজভবন পানে। সুলতানও চলেছেন তাদের সাথি হয়ে সন্তর্পণে। কিছুদূর অগ্রসর হতেই ডান দিক থেকে একটি কুকুর ঘেউ ঘেউ করে উঠল। তখন কুকুরের আওয়াজের মর্মবোদ্ধা চোর বলে উঠল, বন্ধুরা এই কুকুর বলছে বাদশাহ আমাদের সাথেই আছেন। কিন্তু তারা ছিল রাজপ্রাসাদ চুরির অভিযানে সাফল্যের নেশায় বিভোর। কুকুরের আওয়াজের সমঝদার চোরের কথায় কর্ণপাত করার ফুরসত তাদের নেই। আরেফবিল্লাহ তত্ত্বজ্ঞানীরা বলেন, হে মানুষ, তুমি যেখানেই থাক তিনি তোমাদের সঙ্গে আছেন। তোমাদের দেখছেন। তোমাদের সবকথা শুনছেন। তোমরা নিজেদের কথা ও কাজের ব্যাপারে খুবই সতর্ক থাক। কারণ একদিন কড়ায়-গণ্ডায় হিসাব দিতে হবে। কিন্তু দুনিয়ার সহায়সামগ্রী জোগাড় করার, দুনিয়াকে লুটেপুটে খাওয়ার নেশায় মোহে যারা বুঁদ হয়ে আছে, তাদের ফুরসত নেই আল্লাহর ওলিদের সতর্কবণী শ্রবণ করার। আল্লাহ সবখানে আছেন, সবকিছু দেখেন, সবার সবকথা শোনেন এ কথা তারা বিশ্বাস করেও করে না। এখানেও চোরের দল তাদের তত্ত্বজ্ঞানী বন্ধুর কথায় সায় দিল না। কুকুর যে, বলল, বাদশাহ তোমাদের সঙ্গে আছেন তা নিয়ে মোটেও চিন্তা করল না। কারণ, সবাই আচ্ছন্ন ছিল স্বর্ণ রৌপ্য হীরা জহরত ও দুনিয়া কামানোর ঘোরে। (মওলানা রুমির মসনবি শরিফ, খণ্ড : ৬, বয়েত : ২৮১৬-২৮৪২)

(ড. মুহাম্মদ ঈসা শাহেদী রচিত মসনবি শরিফের গল্প ১-৬ খণ্ড প্রকাশ করেছে ছায়াপথ প্রকাশনী, মসজিদ বায়তুশ শরফ কমপ্লেক্স, ১৪৯/এ, এয়াপোর্ট রোড, ফার্মগেট, ঢাকা। ফোন ০১৭১১১১৫৮২৯। মসনবির গল্পভিত্তিক আলোচনা শুনতে ইউটিউবে ভিজিট করুন- CHAYAPATH PROKASHONI)

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত