প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ১৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬
জান্নাতে পুরুষদের সংখ্যা বেশি হবে নাকি নারীদের- এ ব্যাপারে সাহাবা যুগ থেকেই বিতর্ক চলে আসছে। ইবনে সিরিন থেকে সহিহ মুসলিমে এ প্রসঙ্গে একটি বর্ণনা পাওয়া যায়, জান্নাতে কারা সংখ্যায় বেশি হবে- এ নিয়ে একবার নারী-পুরুষদের মধ্যে বিতর্ক দেখা দেয়। আবু হুরায়রা (রা.)-কে এ ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন, নারীরা সংখ্যায় বেশি হবে। এরপর তার বক্তব্যের সমর্থনে নিচের হাদিসটি উপস্থাপন করেন- জান্নাতে সর্বপ্রথম যে দলটি প্রবেশ করবে, তাদের চেহারা হবে পূর্ণিমা রাতের চাঁদের মতো উজ্জ্বল। এর পরবর্তী দলের চেহারা হবে সবচেয়ে উজ্জ্বল ও ঝলমলে তারকার মতো।
প্রত্যেক পুরুষের দুজন করে স্ত্রী থাকবে। তারা এতই ফর্সা হবে, গোশত ও হাড় ভেদ করে মজ্জা পর্যন্ত দেখা যাবে। আর জান্নাতে কেউ নিঃসঙ্গ থাকবে না।’ (মুসলিম : ২৮৩৪)। হাদিসে স্পষ্ট করে বলা হচ্ছে, জান্নাতে একজন পুরুষের একাধিক স্ত্রী থাকবে। অতএব, এটা হলফ করেই বলা যায়, সেখানে পুরুষদের চেয়ে নারীদের সংখ্যাই বেশি হবে। অনেকে আবার মনে করেন, জান্নাতে নারীদের তুলনায় পুরুষদের সংখ্যাই বেশি হবে। তারা তাদের এই বক্তব্যকে প্রমাণসিদ্ধ করার জন্য নিম্নোক্ত হাদিসটির আশ্রয় নিয়ে থাকেন, যেখানে রাসুলুল্লাহ (সা.) নারীদের সম্বোধন করে বলেছেন, ‘আমি তোমাদের অধিকাংশকেই জাহান্নামে দেখতে পেয়েছি।’ (বোখারি : ১৪৬২)।
জান্নাতে নারীরা সংখ্যায় কম হওয়ার আরও একটি দলিল হলো, আমর ইবনুল আস (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘একবার আমরা একটি উপত্যকায় রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সঙ্গে ছিলাম। হঠাৎ তিনি বলে ওঠেন, ওখানে তাকাও! কিছু কি দেখতে পাচ্ছ? তখন আমরা একঝাঁক কাক দেখতে পেলাম। ঝাঁকের ভেতর ধবধবে সাদা একটি কাক। কাকটির ঠোঁট ও পা লাল। আল্লাহর রাসুল (সা.) বললেন, যে সকল নারী জান্নাতে প্রবেশ করবে, (পুরুষদের তুলনায়) তারা হবে এই বিরল প্রজাতির সাদা কাকের মতো!
দ্বিতীয় পক্ষের উদ্ধৃত দলিলের জবাবে ইবনে হাজার আসকালানি (রহ.) বলেন, জাহান্নামে নারীদের সংখ্যা বেশি হওয়ার কারণে এটা আবশ্যক নয় যে, জান্নাতে তাদের সংখ্যা পুরুষদের চেয়ে কম হবে। কেননা, হতে পারে নারীরা জান্নাতেও সংখ্যায় বেশি হবে, জাহান্নামেও বেশি হবে। আর এ কারণেই দুনিয়ায় পুরুষদের তুলনায় নারীদের সংখ্যা যথেষ্ট বেশি।
অবশ্য এমনও বলা যেতে পারে যে, আবু হুরায়রা (রা.) হাদিসে নারীদের সংখ্যা বেশি বলা হয়েছে, দুনিয়ার নারী ও জান্নাতের হুর-উভয়ের বিচারে; আর পরের হাদিসে জাহান্নামে নারীদের সংখ্যা বেশি বলা হয়েছে, শুধু দুনিয়ার নারীদের সংখ্যার ভিত্তিতে। কিন্তু প্রশ্নকারী যদি বলে, আমরা শুধু দুনিয়ার নারী-পুরুষের কথা বলছি, তাহলে এই ব্যাখ্যাটি ঠিক থাকে না। ইমাম কুরতুবি এটিরও একটি সমাধান বের করেছেন। তার মতে, সুপারিশের আগপর্যন্ত জাহান্নামে পুরুষের তুলনায় নারীদের সংখ্যা বেশি থাকবে। কিন্তু সুপারিশের মাধ্যমে যখন গুনাহগার মুমিনদের জাহান্নাম থেকে বের করে আনা হবে, তখন জান্নাতেও তারাই সংখ্যাগরিষ্ঠ হবে। (জান্নাত-জাহান্নাম, শায়খ ড. উমার সুলাইমান, অনুবাদ : মাওলানা আকরাম হোসাইন, পৃষ্ঠা : ১০৩)।
দুনিয়ায় যারা দুর্বল, জান্নাতে তারাই হবে সংখ্যাগরিষ্ঠ : ধর্মীয় অনুশাসন মানার কারণে সমাজের চোখে যারা নিতান্ত দুর্বল, নগণ্য ও অপাঙক্তেয়, আল্লাহর কাছে তারাই মহান, সম্মানিত ও অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত। কারণ, তারা তাদের রবের প্রতি বিনয়াবনত থাকে।
তার কাছে দীনতা প্রকাশ করে এবং প্রভুর হক আদায়ের জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা-সাধনা করে। হারিসা ইবনে ওয়াহাব (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘আমি কি তোমাদেরকে জান্নাতি মানুষের পরিচয় বলে দেব না? উত্তরে সাহাবিরা বললেন, অবশ্যই। তিনি বলেন, যারা দুর্বল এবং যাদের দুর্বল মনে করা হয় (যদিও তারা দুর্বল না- যারা আল্লাহর নামে কোনো কসম করলে, আল্লাহ তাদের কসম পূরণের ব্যবস্থা করে দেন।’ (বোখারি : ৪৯১৮)। রাসুলুল্লাহ (সা.) আরো বলেন, আমি জান্নাতের দরজায় দাঁড়িয়েছিলাম। তখন দেখেছি, যারা জান্নাতে প্রবেশ করেছে, তাদের অধিকাংশই দরিদ্র। ধনীদের হিসাবের জন্য আটকে রাখা হয়েছে। অবশ্য জাহান্নামিদের ব্যাপারে এরমধ্যেই জাহান্নামের ফয়সালা হয়ে গেছে।’ (বোখারি : ৯১৯৬)।