প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ৩১ অক্টোবর, ২০২৬
কা'রে বী চোন রা' কে কাইফিয়ত নাহাদ
ঈন কে গোফ্তাম হাম জরুরত মী দাহাদ
৩১১. অনুপম প্রভুর কাজের ধরন অনুধাবন করবে কীভাবে?
আমি যেটুকু বললাম তাও প্রয়োজনের তাগিদে।
এ বয়েতের ব্যাখ্যায় মওলানা থানবি (রহ.) বলেন, আল্লাহর নৈকট্য হাসিলের পথ হচ্ছে দেহের চাহিদা অস্বীকার করে রুহের পরিচর্যা করা। কিন্তু আল্লাহর নৈকট্য ও সান্নিধ্য অর্জনের জন্য এটিই একমাত্র পন্থা-এ কথা বলা যাবে না। কারণ আল্লাহর কাজকে কোনো নির্দিষ্ট মাপে বা ছাঁচে সীমাবদ্ধ মনে করার ক্ষমতা কারো নেই; বরং কোনো বিপরীত পন্থায়ও তিনি তাঁর সান্নিধ্য ও নৈকট্য দান করতে পারেন। প্রথম প্রক্রিয়াটিকে বলা হয় সুলুক বা সাধনা। দ্বিতীয় পন্থাটি জায্ব বা আকর্ষণ। অর্থাৎ আল্লাহর পক্ষ থেকেই প্রথমে বান্দাকে আকর্ষণ করা হয়, এরপর তার মধ্যে ইবাদত ও সাধনার প্রেরণা জন্মায়। মাওলানা বলছেন, এই বাস্তবতা সত্ত্বেও সাধনার পথে আল্লাহকে পাওয়ার জন্য জরুরি কিছু কথা আমি ব্যক্ত করেছি। তবে মনে রাখতে হবে যে, তিনি যেমন কোনো উপমার ঊর্ধ্বে তেমনি তাঁর কাজের ধরনও মানুষের হিসাব-নিকাশ ও অনুমানের বাইরে এবং তা মানুষের মনে বিহ্বলতা ও বিমূঢ়তার সৃষ্টি করে।
বর্তমানে সামান্য কম্পিউটারের অভ্যন্তরে যারা প্রবেশ করে, অপারেট করে তারাও দেখে যে, কী বিশাল জগত সীমাহীন রহস্য ও তথ্যের ভাণ্ডার সামান্য কম্পিউটার। রুহের জগত তো আরও বিশাল, অন্তহীন রহস্যে ভরা। তাতে সাধক অপারেটররা প্রতি পদে বিস্ময়ে অভিভূত হয়।
গাহ্ চোনীন বেন্মা'য়দ ও গাহ্ যেদ্দে ঈন
জুয্কে হায়রা'নী নাবা'শাদ কা'রে দীন
৩১২. কখনও এভাবে দেখান আর কখনও বিপরীতভাবে
দ্বীনের কাজে বিহ্বলতা ছাড়া আর কিছুই নাই বাস্তবে।
দ্বীনের কাজে বিহ্বলতা ছাড়া কিছুই নেই। এ কথার তাৎপর্য হচ্ছে আল্লাহর সব কাজ সর্বদা এক নিয়মে সম্পন্ন হয় না এবং মানুষ নিজের জ্ঞান-বুদ্ধি দিয়ে আল্লাহর কাজের রহস্য উদ্ঘাটন করতে সক্ষম নয়। তাছাড়া সাধক-সাধনার পথে যতই অগ্রসর হয়, ততই মারিফাতের নতুন নতুন স্তর তার সামনে উদ্ঘাটিত হয়, তখন মনে বিহ্বলতা ও বিমূঢ়তা আরও বেড়ে যায়।
নাই,চোনা'ন হায়রা'ন কে পুশ্তাশ্ সূয়ে উস্ত
বল্ চোনীন হায়রা'ন ও গার্ক্ব-ও মস্তে দূস্ত
৩১৩. এই বিহ্বলতা এমন নয় যে, তাতে বন্ধুর প্রতি বিরাগ সৃষ্টি করে
বরং এমন বিহ্বলতা- যা বন্ধুর মধ্যে নিমজ্জিত ও মস্ত মাতাল করে।
মাওলানা বলছেন, আমি যে বিহ্বলতার কথা বলেছি তার মানে এই নয় যে, বিহ্বল সাধক বন্ধু বা আল্লাহ্র দিকে পৃষ্ঠপ্রদর্শন করে চলে যাবে; বরং এই বিহ্বলতা তাকে আল্লাহর মধ্যে ডুবিয়ে দেয়, আল্লাহ্র জন্য মাতাল করে ফেলে।
আ'ন য়্যকী রা' রূয়ে উ শুদ সূয়ে দুস্ত
ওয়া'ন য়্যকী রা' রূয়ে উ খোদ রূয়ে উস্ত
৩১৪. তার চেহারা নিবিষ্ট আছে বন্ধুর (প্রভুর) পানে,
ওর চেহারা নিবদ্ধ তার নিজের চেহারার দিকে।
আল্লাহর সৌন্দর্য দর্শনে বিভোর-বিহ্বল লোকের চেহারা, মন-ধ্যান সারাক্ষণ আল্লাহর দিকেই নিবদ্ধ। আর যে লোক আল্লাহবিমুখ, নিজের চেহারার দিকেই তার ধ্যান-মন নিমগ্ন। আল্লাহ যার প্রভু নয়, নিজের নফসই তার প্রভু। আল্লাহর ভালোবাসা যাকে জয় করতে পারেনি, সে তার নফসের গোলাম।
রূয়ে হার য়্যক মী নেগার মী দা'র পা'স্
বূকে গর্দী তো যে খেদমত রূ শেনা'স
৩১৫. উভয় শ্রেণির চেহারার পানে তাকাও, পরখ কর,
খেদমতে গিয়ে তুমি করতে পারবে চেহারা পরখ।
সত্যিকার বুজুর্গ ও কৃত্রিম বুযুর্গদের সাহচর্যে গিয়ে সত্য-মিথ্যা বিচারের দৃষ্টিতে উভয়ের চেহারা পরখ করে দেখবে। তাহলে সত্যিকার বুযুর্গ আর ভণ্ডদের মাঝে পার্থক্য করা তোমার পক্ষে সম্ভব হবে।
চোন বাসী ইবলিসে আ'দাম রূয় হাস্ত
পাস বেহার দাস্তী নাশা'য়াদ দা'দ দাস্ত
৩১৬. যেহেতু অনেক ইবলিস আছে মানুষরূপী,
কাজেই যার তার হাতে হাত দেওয়া অনুচিত।
এরা ভেতরে শয়তান, বাইরে বুজুর্গ, মহা নামধাম। সরলপ্রাণ লোকদের ফাঁদে আটকানোর জন্যে নেক্কার বুজুর্গদের বেশ ধারণ ও বুলি রপ্ত করে নানা ফাঁদ পেতে আছে। কাজেই যার তার হাতে বায়আত করলে শয়তানের জালে আটকা পড়ার আশঙ্কা আছে।
যা'ন্কে সাইয়া'দ আ'ওয়ারাদ বা'ঙ্গে সাফীর
তা ফারীবাদ মোর্গ রা' আ'ন মোর্গ গীর
৩১৭. কারণ শিকারী, পাখির বুলিতে ডাক দিয়ে যায়
ধোঁকা দিয়ে পাখিকে ফাঁদে ফেলার মতলবে শিকারী।
বেশ্নাওয়াদ আ'ন মোর্গ বা'ঙ্গে জিন্সে খী'শ
আয্ হাওয়া' আ'য়াদ, বেয়া'য়াদ দা'ম ও নীশ
৩১৮. দূর থেকে পাখি যখন শুনতে পায় স্বগোত্রীয়ের ডাক
অমনি আকাশ থেকে নেমে আটকা পড়ে খাঁচার ফাঁদে ।
হারফে দারবীশা'ন বেদুযদাদ মার্দে দূন
তা বেখা'নাদ বার সালীমী যা'ন ফুসূন
৩১৯. কমজাত লোকেরা বুজুর্গদের বচন চুরি করে
সরল লোকদের জালে আটকায় সেই মন্ত্র পড়ে।
কা'রে মর্দা'ন রওশানী ও গার্মী আস্ত
কা'রে দূনা'ন হীলে ও বী শর্মী আস্ত
৩২০. সুপুরুষদের কাজ দিলে জ্বালে ঊষ্ণতা-রোশনাই
নিকৃষ্টদের কাজে সর্বস্ব প্রতারণা, ওদের চক্ষু লজ্জা নাই।
শীরে পাশমীন আয বরা'য়ে গাদ কুনান্দ
বূ মুসায়লাম রা' লকব আহমাদ কুনান্দ
৩২১. এরা ভিক্ষা করার জন্য চামড়ার বাঘ বানায়
মুসায়লামাকে ডাকে আহমদ অভিধায়।
ভিক্ষার জন্য, মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণের লক্ষ্যে যেমন খড়ের ওপর বাঘের চামড়া জড়িয়ে প্রতিকৃতি বানানো হয়, এই ভণ্ডরাও তরিকত ও তাসাউফের বাঘ সদৃশ বুযুর্গদের বেশ ধারণ করে। আর অজ্ঞ লোকেরা এদের দেখে সহজে প্রতারিত হয় এবং ভণ্ডনবী মুসায়লামা কাযযাবকে নবী মুহাম্মদুর রাসুলুল্লাহ (সা.) সাব্যস্ত করে বসে।
নবম হিজরিতে মুসায়লামা নামের এক ব্যক্তি ইয়ামামা গোত্রের একদল লোক সঙ্গে নিয়ে রাসুলে পাক (সা.)-এর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে। মদিনা থেকে ফিরে যাওয়ার পর সে নবুওতের দাবি করে এবং এ মর্মে রাসুলে পাকের (সা.) কাছেও চিঠি লেখে। রাসুলুল্লাহ (সা.) তাকে ভণ্ড মিথ্যুক মুসায়লামা নামে অভিহিত করেন। নবীজির মৃত্যুর পর তার প্রভাব-প্রতিপত্তি সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে। প্রথম খলিফা হজরত আবু বকর (রা.) তাকে দমন করার জন্য হজরত খালিদ ইবন ওয়ালিদের নেতৃত্বে এক বিরাট বাহিনী প্রেরণ করেন। প্রচণ্ড রক্ষক্ষয়ী যুদ্ধে হজরত ওয়াহশি ইবন হারবের বর্শার আঘাতে মুসায়লামা নিহত হয় এবং তার ফিতনা তিরোহিত হয়। মওলানা ইতিহাসের এ ঘটনা থেকে উদাহরণ টেনে বলছেন, মূর্খরা যেমন মুসায়লামাকে নবী বলে মুরতাদ হয়েছিল, তেমনি আজকের দিনের অজ্ঞরাও ভণ্ড পীরদের আল্লাহ্র পথের দিশারী মুর্শিদ ভেবে প্রতারিত হয়। অথচ প্রকৃত অবস্থা ও পরিণতি হচ্ছে ইতিহাসে—
বূ মুসায়লাম রা' লাক্বাব কাযযা'ব মান্দ
মর মুহাম্মদ রা' উলুল আলবা'ব মান্দ
৩২২. মুসায়লামার জন্য ভণ্ড মিথ্যুকের উপাধিই রয়ে গেল। আর
মুহাম্মদ সকল জ্ঞানের আধার উপাধিতে ভূষিত অম্লান।
আ'ন শরা'বে হাক খেতা'মশ মোশ্কে না'ব
বা'দে রা' খাত্মাশ্ বুওয়াদ গন্দো আযা'ব
৩২৩. তারা খোদায়ী শরাবের মতো, যার ছিপি খাঁটি মেশক নিখাঁদ
আর সাধারণ মদের পরিণাম হচ্ছে দুর্গন্ধ ও আযাব।
ভণ্ডদের উদাহরণ সাধারণ মদের মতো। দুর্গন্ধ আর আজাব ছাড়া তাতে আর কিছুই নেই। অথচ আল্লাহর অলিদের সাহচর্য সুবাসিত খোদায়ী শরাবের মত জীবনকে সৌভাগ্যবান ও সুবাসিত করে।
(ড. মুহাম্মদ ঈসা শাহেদী রচিত মসনবি শরিফের গল্প ১-৬ খণ্ড প্রকাশ করেছে, ছায়াপথ প্রকাশনী ৩১/১, পুরানা পল্টন, (শরীফ কমপ্লেক্স) লিফট-৪, ঢাকা-১০০০। ফোন ০১৭১১১১৫৮২৯। মসনবির গল্পভিত্তিক আলোচনা শুনতে ইউটিউবে ভিজিট করুন— CHAYAPATH PROKASHONI)