
মহান আল্লাহ তাঁর বান্দাকে সকাল-সন্ধ্যা জিকির করার নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘তোমার রবকে স্মরণ করো মনে মনে কাকুতি-মিনতি ও ভীতি সহকারে অনুচ্চ স্বরে সকালে ও সন্ধ্যায়। আর তুমি উদাসীনদের অন্তর্ভুক্ত হয়ো না।’ (সুরা আরাফ : ২০৫)।
জিকির এমন একটি ইবাদত যার কোনো সময়, সীমা, পরিমাণ ও শর্ত নেই। দিনে-রাতে, সকাল-সন্ধ্যায়, হাঁটতে-বসতে, এমনকি শয়ন অবস্থায় ও অজু অবস্থায় হোক কিংবা অজুবিহীন হোক- সর্বাবস্থায় জিকির করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তা ছাড়া এই ইবাদতের জন্য কোনো বিশেষ পরিশ্রমও করতে হয় না এবং কোনো অবসরের দরকার পড়ে না। আল্লাহ বলেন, ‘আর তুমি নিজেকে ধরে রাখো তাদের সঙ্গে, যারা সকালে ও সন্ধ্যায় তাদের পালনকর্তাকে আহ্বান করে- তাঁর সন্তুষ্টি কামনায় এবং তুমি তাদের থেকে তোমার দুচোখ ফিরিয়ে নিয়ো না- পার্থিব জীবনের সৌন্দর্য কামনায়। আর তুমি ওই ব্যক্তির আনুগত্য কোরো না, যার অন্তর আমরা আমাদের স্মরণ থেকে গাফেল করে দিয়েছি এবং সে তার খেয়ালখুশির অনুসরণ করে ও তার কার্যকলাপ অতিক্রম করে গেছে।’ (সুরা কাহফ : ২৮)।
যে অন্তর আল্লাহর জিকির থেকে উদাসীন, তা জীবিত নয়, মৃত। রাসুল (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি তার রবকে স্মরণ করে আর যে করে না, তাদের দৃষ্টান্ত হলো জীবিত ও মৃতের মতো। (অর্থাৎ যে আল্লাহকে স্মরণ করে সে জীবিত। আর যে স্মরণ করে না সে মৃত)।’ (বোখারি : ৬৪০৭)।
জিকির হতে পারে একাকী কিংবা মজলিসে। আল্লাহর জিকিরের মজলিসে অবস্থান করলে ঈমান বৃদ্ধি পায়। পক্ষান্তরে আল্লাহ থেকে উদাসীন ব্যক্তিদের মজলিসে অবস্থান করলে ঈমান হ্রাসপ্রাপ্ত হয়। ঠিক যেমন মসজিদে ও গানের মজলিসে অবস্থান করা। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘যখন একদল বান্দা আল্লাহর গৃহগুলোর কোনো একটি গৃহে সমবেত হয় এবং আল্লাহর কিতাব পাঠ করে ও নিজেদের মধ্যে তা পর্যালোচনা করে, তখন (আল্লাহর পক্ষ থেকে) তাদের ওপর বিশেষ প্রশান্তি নাজিল হয়। আল্লাহর রহমত তাদের ঢেকে ফেলে, ফেরেশতারা তাদের ঘিরে রাখে এবং আল্লাহ তাদের কথা আলোচনা করেন তাদের মধ্যে, যারা তাঁর কাছে থাকে (অর্থাৎ নৈকট্যশীল ফেরেশতাদের কাছে)। আর যার আমল তাকে পিছিয়ে দেয়, তার উচ্চ বংশ তাকে এগিয়ে দিতে পারে না।’ (মুসলিম : ২৬৯৯)।
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর অন্যতম অহি লেখক হানজালা (রা.) বলেন, আবু বকর আমার সঙ্গে সাক্ষাৎ করলেন। অতঃপর বললেন, হে হানজালা! তুমি কেমন আছ? আমি বললাম, হানজালা মুনাফিক হয়ে গেছে। তিনি বললেন, সুবহানাল্লাহ! সেটা কি? আমি বললাম, আমরা যখন আল্লাহর রাসুলের কাছে থাকি এবং তিনি আমাদের সামনে জাহান্নাম ও জান্নাতের আলোচনা করেন, তখন আমরা যেন সেগুলো চোখের সামনে দেখি। কিন্তু যখন আমরা তাঁর কাছ থেকে বেরিয়ে যাই এবং স্ত্রী-সন্তান ও পেশাগত কাজকর্মে জড়িয়ে পড়ি, তখন আমরা অনেক কিছু ভুলে যাই। আবু বকর (রা.) বলেন, আল্লাহর কসম! আমারও এমন অবস্থা হয়। তখন আবু বকর ও আমি রওনা হয়ে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর নিকট হাজির হলাম। আমি তাঁকে বললাম, আল্লাহর কসম! হে আল্লাহর রাসুল! হানজালা মুনাফিক হয়ে গেছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, সেটা কিভাবে? আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসুল! আমরা যখন আপনার কাছে থাকি এবং আপনি আমাদের নিকট জাহান্নাম ও জান্নাতের আলোচনা করেন, তখন আমরা যেন সেগুলো চোখের সামনে দেখি। কিন্তু যখন আমরা আপনার কাছে থেকে বেরিয়ে যাই এবং স্ত্রী-সন্তান ও পেশাগত কাজকর্মে জড়িয়ে পড়ি, তখন আমরা অনেক কিছু ভুলে যাই।
তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, যার হাতে আমার জীবন তাঁর কসম করে বলছি, যদি তোমরা সর্বদা ঐরূপ থাকতে, যেরূপ আমার কাছে থাকো এবং সর্বদা জিকিরের মধ্যে থাকতে, তাহলে নিশ্চয়ই ফেরেশতারা তোমাদের বিছানায় ও তোমাদের রাস্তায় করমর্দন করত। কিন্তু হে হানজালা! একটি অবস্থা অন্য অবস্থার কাফফারা মাত্র। কথাটি তিনি তিনবার বলেন।’ (তিরমিজি : ২৫১৪)। অর্থাৎ কখনো স্মরণ করায় এবং কখনও ভুলে যাওয়ায় তুমি মুনাফিক হবে না, বরং এই আল্লাহভীরুতাই তোমার মুমিন হওয়ার বড় নিদর্শন। এতে বোঝা গেল যে সর্বদা ঈমান বৃদ্ধির মজলিসে থাকার চেষ্টা করতে হবে। ঈমানের আলোচনা করার দ্বারাও জিকিরের মজলিস কায়েম হয়। মুয়াজ বিন জাবাল (রা.) একদিন তাঁর সাথি আসওয়াদ বিন হেলালকে বলেন, ‘তুমি আমাদের সঙ্গে বসো। কিছুক্ষণ আমরা ঈমানের আলোচনা করি। অতঃপর তারা উভয়ে বসলেন এবং আল্লাহকে স্মরণ করলেন ও প্রশংসা করলেন।’ (ফাতহুল বারি, ‘ঈমান’ অধ্যায় : ১/৪৮)। জিকিরের মজলিসে আল্লাহর রহমত বর্ষিত হয়। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী (সা.) বলেছেন, যখন কোনো সম্প্রদায় আল্লাহর কোনো ঘরে সমবেত হয়ে আল্লাহর কিতাব তিলাওয়াত করে এবং পরস্পর তা নিয়ে আলোচনা করে, তখন তাদের ওপর শান্তি বর্ষিত হয়, তাদের রহমত ঢেকে নেয়, ফেরেশতারা তাদের ঘিরে রাখে এবং আল্লাহর নিকটবর্তী ফেরেশতাদের কাছে তাদের প্রশংসা করেন। (আবু দাউদ : ১৪৫৫)। শায়খুল ইসলাম ইমাম ইবনু তায়মিয়াহ (রহ.) বলেন, ‘সাহাবিরা কখনও কখনও একত্রে জমা হতেন। তাঁরা তাঁদের একজনকে আদেশ করতেন কোরআন পাঠের জন্য এবং অন্যরা তা মনোযোগ দিয়ে শুনতেন। উমর ইবনুল খাত্ত্বাব (রা.) বলতেন, হে আবু মুসা! তুমি আমাদের রবকে স্মরণ করিয়ে দাও। তখন তিনি কোরআন পাঠ করতেন এবং লোকেরা তা মনোযোগ দিয়ে শুনতেন। সাহাবিদের মধ্যে এমন অনেকে ছিলেন, যিনি বলতেন, আমাদের সঙ্গে বসো, কিছুক্ষণ ঈমানের আলোচনা করি।
রাসুলুল্লাহ (সা.) জামাতের সঙ্গে সালাত আদায়ের পর আহলে সুফফাহর সাহাবিদের সঙ্গে গিয়ে বসতেন। তাঁদের মধ্যে একজন কোরআন পাঠ করতেন এবং তিনি বসে তা মনোযোগ দিয়ে শুনতেন। এভাবে কোরআন শ্রবণ করা ও আল্লাহকে স্মরণ করার মাধ্যমে হৃদয়ে যে ভয়ের সঞ্চার হয়, চক্ষু দিয়ে অশ্রু প্রবাহিত হয় এবং আতঙ্কে শরীরে যে কাঁটা দিয়ে ওঠে, এটাই হলো ঈমানের শ্রেষ্ঠ অবস্থা, যে বিষয়ে কোরআন ও সুন্নাহ বর্ণনা করেছে।’ (মাজমুউল ফাতাওয়া : ২২/৫২১-২২)।