প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ১৪ মার্চ, ২০২৬
মওলানা রুমি (রহ.)-এর বিশাল ফারসি কাব্যগ্রন্থ মসনবি শরিফ গল্পের পর গল্প দিয়ে সাজানো। গল্পের ভেতর দিয়েই তিনি তার চিন্তাদর্শন মানব জাতির পথের দিশা হিসেবে উপস্থাপন করেছেন অভিনব পদ্ধতিতে। মসনবির গল্প শুরুতে মনে হবে সবুজ বন-বনানীর মধ্য দিয়ে আঁকাবাঁকা রাস্তা বেয়ে এগিয়ে যাচ্ছি। কিন্তু হঠাৎ কিছু টের পাওয়ার আগেই তিনি জমিনে নেই, নীলিম আকাশের সীমানা ছাড়িয়ে উর্ধ্বলোকে, আধ্যাত্মিকতার বিশাল প্রান্তরে বিচরণ করছেন। পাঠকের মন তখন উড়াল দিতে চায় চেতনার ডানায় ভর করে। কিন্তু না হঠাৎ মওলানা ডুব দিয়েছেন রহস্যময়তার মহাসগরের তলায় আধ্যাত্মিকতার মণিমুক্তা আহরণ করবার জন্য। আবার যখন পাঠক চিন্তা ও চেতনায় দিকভ্রান্ত হয়ে খেই হারিয়ে ফেলার উপক্রম হয় তখন তিনি ফিরে আসেন গল্পের ধারাভাষ্যে। মসনবীতে চিন্তার এই উথাল-পাতাল টালমাটাল অবস্থার কারণেই হয়ত মধ্যযুগে অনেক ফারসি কাব্যের বাংলা অনুবাদ হলেও মসনবি শরিফের কোনো পূর্ণাঙ্গ অনুবাদ হয়নি।
বর্তমানে বাংলাদেশের বাজারে মসনবি শরিফের দুটি অনুবাদ সহজলভ্য। প্রকাশকের দাবি, মসনবি শরিফের পূর্ণ অনুবাদ। আসলে বাংলা মসনবির ৪ খণ্ড মূল মসনবির ১ম খণ্ডের চারটি অংশমাত্র। এই ভাগটি করেছেন উপমহাদেশের প্রোথিতযশা আলেমে দ্বীন মওলানা আশরফ আলি থানবি (রহ.)। অনুবাদকগণ ফারসি ভাষায় সুদক্ষ হলেও তারা থানবি (রহ.)-এর উর্দু ব্যাখ্যাগ্রন্থ ‘কলিদে মসনবি’র অনুবাদ করেছেন। মসনবির তত্ত্বরহস্য সম্পর্কিত ব্যাখ্যাগুলো উর্দু থেকে অনুবাদ করতে গিয়ে অনেক ক্ষেত্রে জটিল ও দুর্বোধ্য হয়ে গেছে। যার ফলে অনেকের কাছে গ্রন্থগুলো সুখপাঠ্য হতে পারেনি। ইসলামিক ফাউন্ডেশনের কার্যাদেশ পেয়ে মসনবি শরিফের অনুবাদে হাত দিয়ে বিষয়টি আমাকেও ভাবিয়ে তোলে। তাই আমার সাধ্যের আওতায় অনুবাদ ও ব্যাখ্যার ভাষা প্রঞ্জল এবং সুখপাঠ্য করার চেষ্টা করেছি।
এরপরও আমার উপলব্ধি হলো, মসনবি শরিফের গভীর তত্ত্বরহস্য অনুধাবন করার জন্য যে সময়, অনুধ্যান ও পরিবেশ দরকার বাংলাদেশের মাটিতে তা সহজসাধ্য নয়। এরমধ্যে বড় বাধা ভাষা। উর্দু ও ফারসি ভাষার সঙ্গে আরবির যে আত্মীয়তা তা বাংলার সঙ্গে নেই। ধর্মীয়, তাত্ত্বিক ও যৌাক্তক পরিভাষাগুলো আরবি, ফারসি বা উর্দুতে বলার সঙ্গে সঙ্গে পাঠক ভাবার্থ সহজে বুঝতে পারেন। অথচ বাংলায় এসব পরিভাষার যথেষ্ট ব্যাখ্যা করলেও পুরো বিষয়টি হৃদয়ঙ্গম করতে সময় লাগে।
মসনবি বুঝার বেলায় এই অভাবটি দূর করার জন্য বা শুরু থেকে পাঠক মনকে আধ্যাত্মিক মণিমুক্তা আহরণের উপযোগী করার জন্য আমি আরও কয়েকটি পুস্তক রচনার প্রয়াস পেয়েছি, যেগুলো এরইমধ্যে পাঠক সমাজে প্রশংসিত হয়েছে। এর একটি হযরত শামসে তাবরিজি। শামসে তাবরিজির সঙ্গে মওলানা রুমির সাক্ষাত ও তাতে মওলানা রুমির জীবনে আধ্যাত্মিক বিপ্লবের ঘটনাটি বিস্ময়ভরা, রহস্যে ঘেরা। আমি এই রহস্যের কুল-কিনারা করার জন্য বইটিকে গবেষণামূলক আঙ্গিকে সাজিয়েছি এবং আমার নিজস্ব প্রকাশনী ‘ছায়াপথ প্রকাশনী’ থেকে প্রকাশ করেছি।
এ সম্পর্কিত দ্বিতীয় বইটির শিরোনাম ‘মওলানা রুমি ও মসনবির দর্শন’। ইরানি সূত্র থেকে আহরিত তথ্যের ভিত্তিতে বিন্যস্ত বইটি ইসলামিক ফাউন্ডেশন মুদ্রণ করেছে। যারা মওলানা রুমি ও মসনবির জীবন দর্শন উপলব্ধি করতে চান বা মসনবি শরিফের যথার্থ পরিচিতি পেতে আগ্রহী তাদের জন্য এটি খুবই সুন্দর একটি উপহার হতে পারে। তবে এ বই থেকে সাধারণ পাঠকদের চেয়ে চিন্তাশীল ও শিক্ষিত শ্রেণিই বেশি লাভবান হবেন।
মসনবি বা মওলানা রুমিকে বুঝতে হলে তাসাউফকে বুঝতে হবে। তাসাউফ নিয়ে এক শ্রেণির লোক বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছেন। আবার কতক শরীয়ত বিরোধী লোক তাসাউফের দোহাই দিয়ে কোরআন হাদিসের এমন ব্যাখ্যা দেন এবং কথায় কথায় মওলানা রুমির উদ্ধৃতি দেওয়ার চেষ্টা করেন, যাতে মনে হবে যে, তাসাউফ বুঝি ইসলামের বিকল্প আরেকটি মতবাদ বা জীবনদর্শন। উভয় শ্রেণির মানুষের চিন্তার ভ্রান্তিগুলো চিহ্নিত করার বাসনায় সম্প্রতি যে বইটি রচনা করেছি তার নাম ‘তাসাউফের দার্শনিক ভিত্তি’। বইটি ইসলামিক ফাউন্ডেশন থেকে প্রকাশিত হয়েছে।
কিছুদিন আগেও আমাদের আধুনিক শিক্ষিতরা পশ্চিমা সংস্কৃতির গোলকধাঁধাঁয় দিকহারা ঘুরছিল এবং এখনও অনেকে সেই জ্বরে ধুঁকছে। পাশাপাশি আমাদের ধর্মীয় মহলও এক ধরনের শুষ্কচিন্তার মরিচিকায় আটকা পড়েছেন। এর ফলে এক ধরনের ধর্মীয় উগ্রতার বিস্তার ঘটছে, যেখানে কোরআন হাদিসের রুহানি ও ভালোবাসা মিশ্রিত ব্যাখ্যার স্থান নেই। সত্যিকথা সমাজের এসব অসংগতি নিয়ে চিন্তা করে তার প্রতিকারের কোনো পথ খুঁজে পাচ্ছিলাম না। আমার তো এমন বিদ্যাবুদ্ধি বা আধ্যাত্মিক শক্তি নেই যা নিয়ে সমাজের মানুষের সামনে কোনো আলো জ্বালাতে পারি। দেখলাম, মওলানা রূমী এবং তার ভাবশিষ্য ড. আল্লামা ইকবালের চিন্তাদর্শন এ ক্ষেত্রে আমাকে পথ দেখাতে পারে এবং মুসলিম সমাজের চলার পথটিও উজ্জ্বল হতে পারে। এই চিন্তা থেকেই নিজের শত দুর্বলতা সত্ত্বেও মওলানা রুমিকে নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার সংকল্প করেছি।
এই পথে সব মানুষের যাত্রাকে সহজতর করার জন্য অপর যে পদক্ষেপটি নিয়েছি তা হলো মসনবি শরিফের গল্প সংকলন। গল্পগুলো পড়লে পাঠকের মনে একদিকে মসনবির দর্শন উপলব্ধি করার জন্য ক্ষেত্র প্রস্তত হবে অন্যদিকে রুমির ভাব জগতে প্রবেশের জন্য উদ্বেলিত করবে। এই গল্প রচনার প্রেক্ষাপট আজকে ব্যাখ্যা করার সুযোগ নেই। আজ এটুকুই বলব যে, পাঁচ বছরের বেশি সময় ধরে দৈনিক আলোকিত বাংলাদেশের শনিবারের তাসাউফ পাতায় একটি করে মসনবির গল্প প্রকাশিত হয়ে আসছে।
আলহামদু লিল্লাহ, এরইমধ্যে মূল ছয়খণ্ড মসনবির গল্পগুলো তুলে এনে সংবাদ পত্রের পাঠকদের বোধগম্য ভাষায় পরিবেশন করতে পেরেছি। এতো দীর্ঘ সময় দৈনিক পত্রিকায় ধারাবাহিক লেখা প্রমাণ করে লেখাগুলো পাঠকদের মন ছুঁইতে পেরেছে। শুনে খুশি হবেন যে, পত্রিকা কর্তৃপক্ষের মতে দৈনিক আলোকিত বাংলাদেশ পাঠক মহলে জনপ্রিয়তার প্রধান কারণ প্রতিদিনের ইসলামি পাতা। আর ইসলামি পাতার প্রধানমত আকর্ষণ হচ্ছে প্রতি শনিবারের সিরিজ লেখা মওলানা রুমির মসনবি শরিফ।
বলতে পারেন, মসনবি শরিফে গল্পের সংখ্যা তো চারশর বেশি, আমি কেন আড়ইশ এর মধ্যে সীমাবদ্ধ করলাম? এর সহজ উত্তর হল, মসনবির যেসব গল্পকে সংবাদপত্রের পাঠকদের জন্য সহজবোধ্য মনে করেছি সেগুলোই উপস্থাপন করেছি। যেসব গল্পে অনেক জটিল, দীর্ঘ ও গভীর তত্ত্বরহস্য ব্যক্ত হয়েছে সেগুলো মূল মসনবির জন্য রেখে দিয়েছি, যার প্রথম খণ্ড ৬২৪ পৃষ্ঠায় ইসলামিক ফাউন্ডেশন থেকে প্রকাশিত হয়েছে এবং ৭০০ এর অধিক পৃষ্ঠায় দ্বিতীয় খণ্ড প্রকাশের অপেক্ষায় আছে।
মসনবির গল্পগুলো পদ্যে বা কবিতায় লেখা; কিন্তু আমি বর্তমান সময়ের পাঠকদের অভিরুচির কথা বিবেচনায় রেখে সরল গদ্যে বর্ণনা করেছি, তবে যেখানে শিক্ষনীয় বিষয় আছে বা মওলানা রুমির পক্ষ থেকে মানব সমাজের জন্য আবেদন রয়েছে বলে মনে করেছি সেখানে সংশ্লিষ্ট এক বা একাধিক বয়েতের অবতারণা করেছি। ফলে পাঠক মওলানা রুমির জবানীতে ফারসি বয়েত পড়ে মসনবীর আমেজ পেয়ে আপ্লুত হওয়ার সুযোগ পান। পত্রিকায় বয়েতগুলো ফারসিতে ছাপানো সম্ভব না হলেও বাংলা উচ্চারণ পেয়েও অনেকে ফারসির অনুরণন করে টেলিফোনে আমাকে শোনান বা ভুলচুক আছে কিনা যাঁচাই করে নেন।
মওলানা যেখানে অন্তহীন শিকলের ন্যায় গল্পের পিঠে গল্পের অবতারণা করেছেন, সেখানে আমাকে একটি গল্পের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে হয়েছে। এখানে একটি কথা পরিষ্কার করতে চাই যে, গল্প বলা মওলানার উদ্দেশ ছিল না। মসনবির এমন অনেক গল্প আছে যেগুলো সরল গল্প আকারে হলে সমাজে বিরূপ প্রভাব পড়ার আশংকা আছে। যেমন মসনবির প্রথম দীর্ঘ গল্প ‘বাদশাহ বাঁদীর প্রেম কাহিনি’। তাই আমি শুধু গল্প বলিনি, বরং গল্পের ফাঁকে ও বাঁকে মওলানা যেসব তত্তকথা ব্যক্ত করেছেন সেগুলোই তুলে ধরেছি। আমার লেখায় প্রত্যেক গল্পের যে শিরোনাম দেওয়া হয়েছে তা মওলানার নয়; বিষয়বস্তুর আবেদন সামনে রেখে নিজ থেকে দিয়েছি।
মূল মসনবি ছয় খণ্ড থেকে বাছাইকৃত প্রায় দুই হাজার পৃষ্ঠার ৬টি বই এরইমধ্যে ছায়াপথ প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত হয়েছে। আলহামদুলিল্লাহ বইগুলো এরইমধ্যে পাঠক মহলে ব্যাপকভাবে সমাদৃত হয়েছে।
আজকের লেখাটি মূলত ইরানের ইসফাহান বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৭ নভেম্বর ২০২০ অনুষ্ঠিত ভার্চুয়াল রুমি সম্মেলনে আমার আলোচনার সারসংক্ষেপ। দক্ষিণ চট্টগ্রামের চুনতিতে আশেকে রাসূল শাহ হাফেয আহমদ (রহ.) প্রবর্তিত ১৯ দিন ব্যাপী সিরাতুন্নবী (সা.) মাহফিল শেষে চুনতি শাহ মঞ্জিলে বসেই এই সম্মেলনে অংশ নেই।
আলোচনার এ পর্যায়ে সম্মেলনের সঞ্চালক ড. কাহদূয়ীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেছিলাম, আমি বোধ’য় বেশি সময় নিয়ে নিয়েছি। তিনি বললেন, আপনার আলোচনা আকর্ষনীয় ছিল, তাই...। আপনি নির্ধারিত ২০ মিনিটের পর অতিরিক্ত ৮ মিনিট কথা বলেছেন। উপমহাদেশের শ্রেষ্ঠ ইসলামি চিন্তানায়ক ও আলেমগণ যেমন আল্লামা ইকবাল, মওলানা আশরফ আলি থানবি (রহ.) বাংলাদেশে শায়খুল হাদিস মওলানা আজিজুল হক (রহ.), মওলানা আব্দুল মজিদ ঢাকবি (রহ.)সহ অনেক অনেক বুজর্গ মসনবি শরিফ চর্চার যে জমিন আবাদ করেছেন সেখান থেকে আমি ফসল তুলেছি। এর বেশিকিছু নয়।
পরদিন একটি ভিডিও বার্তায় ড. কাহদুয়ি অনেক কথার মধ্যে বললেন, ইরানি অধ্যাপকরা আপনার আলোচনা শুনে বললেন, এতদিন আমার মুখে আপনার মসনবি চর্চার কথা শুনে তারা নাকি বিশ্বাস করতে পারছিলেন না। এবারে সরাসরি বিবরণ শুনে বিশেষ করে আনজুমনে ফারসি ইরান এর সভাপতি ড. মির বাকেরি আপ্লুত হয়েছেন। সম্মেলনের অন্যতম আলোচক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এফ রহমান হলের প্রভোষ্ট ড. সাইফুল ইসলাম খান বললেন, আপনার আলোচনা বাংলাদেশে যারা ফারসি ভাষা ও সহিত্য চর্চা করছেন তাদের জন্য বিরাট উপকার বয়ে আনবে। কারণ, ইরানের বিদগ্ধ মহল রুমি চর্চার জীবন্ত বর্ণনা শুনে নিশ্চয়ই বাংলাদেশের প্রতি মনোযোগ দেওয়ার গুরুত্ব অনুধাবন করবেন।
(ড. মুহাম্মদ ঈসা শাহেদী রচিত মসনবি শরিফের গল্প ১-৬ খণ্ড প্রকাশ করেছে ছায়াপথ প্রকাশনী, মসজিদ বায়তুশ শরফ কমপ্লেক্স, ১৪৯/এ, এয়ারপোর্ট রোড, ফার্মগেট, ঢাকা। ফোন ০১৭১১১১৫৮২৯। মসনবির গল্প ভিত্তিক আলোচনা শুনতে ইউটিউবে ভিজিট করুন- CHAYAPATH PROKASHONI)