ঢাকা শনিবার, ১৪ মার্চ ২০২৬, ২৯ ফাল্গুন ১৪৩২ | বেটা ভার্সন

জাকাত না দেওয়ার শাস্তি

মাওলানা কেফায়াতুল্লাহ
জাকাত না দেওয়ার শাস্তি

ইসলামের ফরজ বিধান জাকাত। সামর্থবানদের ওপর জাকাত আদায় করা ফরজ। যার কাছে প্রয়োজন অতিরিক্ত সাড়ে সাত তোলা স্বর্ণ বা সাড়ে ৫২ তোলা রুপা কিংবা সমপরিমাণ ব্যবসায়ী পণ্য বা নগদ অর্থ থাকবে, তাকে জাকাত দিতে হবে। এ বিধান পালন না করার অর্থ আল্লাহর নির্দেশ অমান্য করা। যারা এ বিধান পালন করবে না, তাদের জন্য দুনিয়াতে লাঞ্ছনা ও আখেরাতে আজাবের হুঁশিয়ারি রয়েছে।

জাকাত না দিলে দুনিয়ায় যে শাস্তি হবে : জাকাত আদায় না করলে দুনিয়ায় ভয়াবহ শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে। এখানে কয়েকটি শাস্তির কথা উল্লেখ করা হলো-

আল্লাহর রহমত থেকে বঞ্চিত : পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেন, ‘আমার রহমত সব কিছুতে পরিব্যাপ্ত। তা আমি সেই লোকদের জন্য লিখব, যারা তাকওয়া অবলম্বন করে, জাকাত দেয় ও আমার আয়াতগুলোর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করে।’ (সুরা আরাফ : ১৫৬)।

আল্লাহর সাহায্য পায় না : যে আল্লাহকে সাহায্য করেন তিনি তাকে সাহায্য করেন। জাকাত দেওয়া আল্লাহকে সাহায্যকারীর অন্যতম বৈশিষ্ট্য। কোরআনে আছে, ‘যে আল্লাহকে সাহায্য করবে আল্লাহ অবশ্যই তাকে সাহায্য করবেন; নিঃসন্দেহে আল্লাহ শক্তিসম্পন্ন, সর্বজয়ী। তারা সেসব লোক, যাদের আমি পৃথিবীতে ক্ষমতা দিলে তারা নামাজ প্রতিষ্ঠা করে, জাকাত দেয়, সৎকাজের আদেশ দেয় ও অসৎ কাজে নিষেধ করে।’ (সুরা হজ: ৪০-৪১)। জাকাত আদায় না করলে আল্লাহর সাহায্য থেকে বঞ্চিত হতে হয়।

নিজের বিরুদ্ধে যুদ্ধ অবশ্যম্ভাবী করে নেওয়া : মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘আমি লোকজনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য আদিষ্ট হয়েছি, যে পর্যন্ত না তারা সাক্ষ্য দেবে, ‘আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাসক নেই ও মুহাম্মদ আল্লাহর রাসুল। নামাজ প্রতিষ্ঠা করবে ও জাকাত আদায় করবে। যখন তারা এ কাজগুলো করবে, তখন তারা আমার হাত থেকে তাদের জীবন-সম্পদ রক্ষা করবে, অবশ্য তাদের চূড়ান্ত বিচারের ভার আল্লাহর ওপর।’ (বোখারি: ২৫)।

আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের পৃষ্ঠপোষকতা হারানো : আল্লাহ ও তাঁর রাসুল যাদের পৃষ্ঠপোষকতা করেন, তাদের মধ্যে জাকাত দেওয়ার গুণাবলি থাকতে হবে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘তোমাদের একমাত্র বন্ধু আল্লাহ, তাঁর রাসুল ও ঈমানদারগণ যারা নামাজ কায়েম করে, জাকাত দেয় এবং তারা রুকুকারী।’ (সুরা মায়েদা : ৫৫)।

জাতীয় বিপর্যয় : জাকাত আদায় না করার কারণে নানা ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও জাতীয় বিপর্যয়ের মুখোমুখি হতে হয়। হাদিসে আছে, ‘যে সমাজের লোকেরা জাকাত দিতে অস্বীকার করবে, আল্লাহ তাদের কঠিন ক্ষুধা ও দুর্ভিক্ষে নিমজ্জিত করবেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে জাতি জাকাত দেয় না, মহান আল্লাহ তাদের ওপর বৃষ্টিপাত বন্ধ করে দেন।’ (মুসতাদরাকে হাকিম, হাদিস: ২৫৭৭)

জাকাত আদায় না করার পরকালীন শাস্তি : যারা জাকাত দিতে অস্বীকার করে, পরকালে তাদের কঠিন ও ভয়ংকর আজাবের মুখোমুখি হতে হবে।

ধন-সম্পদ আগুনে গরম করে সেঁক দেওয়া : আল্লাহ বলেন, ‘যারা স্বর্ণ ও রূপা পুঞ্জিভূত করে রাখে, আর তা আল্লাহর রাস্তায় খরচ করে না, তুমি তাদের বেদনাদায়ক আজাবের সুসংবাদ দাও। যেদিন জাহান্নামের আগুনে তা গরম করা হবে, অতঃপর তা দিয়ে তাদের কপালে, পার্শ্বে এবং পিঠে সেঁক দেওয়া হবে। (আর বলা হবে) ‘এটা তা-ই, যা তোমরা নিজেদের জন্য জমা করে রেখেছিলে, সুতরাং তোমরা যা জমা করেছিলে তার স্বাদ উপভোগ করো।’ (সুরা তওবা : ৩৪-৩৫)।

বিষধর সাপের দংশন : মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘যে সম্পদের জাকাত দেয় না, কিয়ামতের দিন ওই সম্পদকে দুটি বিষের থলিবিশিষ্ট মাথায় টাকপড়া মারাত্মক বিষধর সাপে পরিণত করা হবে, যা তাকে পেঁচিয়ে তার চোয়ালে আঘাত করে করে বলতে থাকবে, ‘আমি তোমার সম্পদ, আমি তোমার গচ্ছিত ধন।’ (বোখারি : ২১০)।

কেয়ামতে বেড়ি পরানো : আল্লাহ বলেন, ‘আল্লাহ যাদেরকে তাঁর অনুগ্রহ থেকে যা দান করেছেন তা নিয়ে যারা কৃপণতা করে, তারা যেন ধারণা না করে যে, তা তাদের জন্য কল্যাণকর। বরং তা তাদের জন্য অকল্যাণকর। যা নিয়ে তারা কৃপণতা করেছিল, কিয়ামতের দিন তা দিয়ে তাদের বেড়ি পরানো হবে। আর আসমানগুলো ও জমিনের উত্তরাধিকার আল্লাহরই জন্য। আর তোমরা যা আমল করো, সে ব্যাপারে আল্লাহ সম্যক জ্ঞাত।’ (সুরা আলে ইমরান : ১৮০)।

পশু দিয়ে পদদলিত : রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে নিজের উটের হক আদায় করবে না, সে উট দুনিয়া অপেক্ষা অধিক শক্তিশালী হয়ে খুর দিয়ে মালিককে পিষ্ট করতে আসবে, যে ব্যক্তি নিজের ছাগলের হক আদায় করবে না, সে ছাগল দুনিয়া অপেক্ষা অধিক শক্তিশালী হয়ে খুর দিয়ে মালিককে পদদলিত করবে এবং শিং দিয়ে আঘাত করবে।’ (বোখারি : ২০৯)।

উত্তপ্ত পাথর ব্যবহার : রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যারা সম্পদ জমা করে রাখে, তাদেরকে এমন গরম পাথরের সুসংবাদ দাও, যা তাদের শাস্তি দেওয়ার জন্য জাহান্নামে উত্তপ্ত করা হচ্ছে। তা তাদের স্তনের বোঁটার ওপর স্থাপন করা হবে আর তা কাঁধের পেশি ভেদ করে বের হবে এবং কাঁধের ওপর স্থাপন করা হবে, তা নড়াচড়া করে সজোরে স্তনের বোঁটা ছেদ করে বের হবে।’ (বোখারি : ২১৫)।

আগুনের চুড়ি পরিধান : আমর ইবন শুয়াইব (রা.) তার পিতা, তিনি তার দাদার সূত্রে বর্ণনা করেছেন, ‘এক মহিলা রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে তার মেয়েকে নিয়ে এলেন যার হাতে ছিল দুটি স্বর্ণের মোটা চুড়ি। তিনি বললেন, তুমি কি এটার জাকাত দাও? সে বলল, না। তিনি বললেন, এ দুটির পরিবর্তে কিয়ামতের দিন আল্লাহ তোমাকে দুটি আগুনের চুড়ি পরিধান করলে তা কি তোমাকে খুশি করবে? বর্ণনাকারী বলেন, এরপর সে চুড়ি দুটি খুলে মহানবী (সা.)-এর কাছে রেখে বলল, এ দুটি আল্লাহ ও তাঁর রাসুল (সা.)-এর জন্য।’ (আবু দাউদ : ১৫৬৫)।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত