
জুলাই সনদে মানুষের মুক্তির কথা বলা হয়েছে। একটি জবাবদিহিতামূলক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের কথা বলা হয়েছে। দুর্নীতি দমন কমিশন, বিচার বিভাগ এবং সরকারি কর্ম কমিশন স্বাধীন করার কথা বলা হয়েছে। জুলাই সনদে এমন কিছু নেই, যা আপনি সাধারণ মানুষকে বোঝাতে পারবেন না বলে মন্তব্য করেছেন প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী অধ্যাপক আলী রীয়াজ।
সোমবার (২ ফেব্রুয়ারি) সকালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে গণভোট ২০২৬ বিষয়ে জনসচেতনতামূলক প্রচার-প্রচারণা সংক্রান্ত মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তৃতায় তিনি এসব কথা বলেন। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় যৌথভাবে এ সভার আয়োজন করে।
অধ্যাপক আলী রীয়াজ বলেন, বাংলাদেশের মানুষ যে পরিবর্তন চায় তার সবচেয়ে বড় উদাহরণ হচ্ছেন আপনারা। আপনারা যখন ডাক দিয়েছেন, দেশের মানুষ তখন রাস্তায় নেমে এসেছে কি কারণে? এসেছে, কারণ তারা পরিবর্তন চায়, আপনাদের ওপর তারা আস্থা রেখেছে।
তিনি আরো বলেন, বাংলাদেশের এক তৃতীয়াংশ জনগোষ্ঠী ৩৭ বছরের নিচে। বাংলাদেশের যে ১৩ কোটি ভোটার আছে তার মধ্যে পৌনে ৫ কোটি ভোটারই হচ্ছে ৩৭ বছরের নিচে। ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ আপনাদের হাতে গড়া। সেই জন্য আমি তরুণদের বলি, জুলাই জাতীয় সনদ শুধু একটি দলিল নয়, এটা বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ। কারণ এটা তরুণদের রক্ত দিয়ে তৈরি হয়েছে। ভবিষ্যতে বাংলাদেশের তরুণরা যাতে জবাবদিহিতামূলক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থায় জীবনযাপন করতে পারে, নাগরিকের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়, সুরক্ষিত হয় সেজন্য লড়াই অব্যাহত আছে। গণভোট হচ্ছে সেই লড়াইয়ের অংশ।
শহিদদের অবদানের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমরা যে বয়সেরই হই না কেন শহিদদের আত্মদানকে যদি আমরা যথার্থ মনে করি, যদি কোনো দায় অনুভব করি তবে দুই-পাঁচ জনকে আপনি গণভোটের কথা বলুন। গত ৫৫ বছরে বাংলাদেশে যে সুযোগ তৈরি হয়নি সে সুযোগ কাজে লাগানোর এখনই সময়।
জুলাই যোদ্ধাদের কাছে আমাদের কি কোনো দায় নেই- এমন প্রশ্ন রেখে তিনি আরও বলেন, জুলাইয়ে যারা আহত হয়েছে তারা অনেকেই স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে পারছে না, হয়তো কখনও পারবেনা। যারা দেশের জন্য প্রাণ দিতে রাজি হয়েছিল তাদের জন্য আমাদের কোনো দায় থাকবে না এটা হতে পারে না। আমরা কি অপেক্ষা করব- সরকার কী বলবে? রাজনীতিবিদ কী বলবে? মঞ্জুরি কমিশন কী বলবে? এনজিও কী বলবে?- তার জন্য।
এসময় বাংলাদেশের পরিবর্তন চাইলে, সরকারি ঘোষণার উপর নির্ভর না করে প্রত্যেককে নিজ নিজ এলাকায় গিয়ে গণভোটের প্রচার অংশগ্রহণ করতে তিনি সকলকে অনুরোধ করেন।
৩০টি রাজনৈতিক দলের সাথে নয় মাস ধরে বহুবার আলোচনার পরেও গণভোটের প্রয়োজন হচ্ছে কেন-সে বিষয়ে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে আলী রীয়াজ বলেন, আমরা সকলে রাজনীতি করি না। সর্বোপরি সংবিধানের সাত অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে প্রজাতন্ত্রের মালিক হচ্ছে জনগণ। তাদের সার্বভৌম অভিপ্রায়ের প্রকাশ ঘটেছে ২৪ এর অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে। আমরা আরেকবার সেই অভিপ্রায়ের প্রকাশ দেখতে চাই। যাতে ভবিষ্যতে এগুলো সুরক্ষা করা যায়। সেই সুরক্ষার জন্য, সেই প্রচেষ্টার জন্য আমাদের প্রত্যেকের ভূমিকা আছে।
তিনি বলেন, সংসদ নির্বাচনের ব্যালট সাদা আর গণভোটের ব্যালট গোলাপি কালার। গণভোটের মার্কা হচ্ছে টিক চিহ্ন। যারা শুধু মার্কা দিয়ে বুঝতে চায়, তাদের সেটাই বোঝান। এই সুযোগ হেলায় হারানো যাবে না, অনেক প্রাণ, অনেক আত্মদান এবং অনেক কিছুর বিনিময়ে আমরা এটি পেয়েছি।
তিনি আরও বলেন, যারা ওই সময় ভূমিকা রেখেছেন তারা ভূমিকা অব্যাহত রাখবেন আর যারা ওই সময় ভূমিকা রাখতে পারেননি তাদের কাছে আমার অনুরোধ আপনাদের জন্য আরেকবার সুযোগ তৈরি হয়েছে, বাংলাদেশকে একটি প্রকৃত গণতান্ত্রিক জবাবদিহিতামূলক রাষ্ট্রে পরিণত করার। সেই চেষ্টায়, সংগ্রামে, যুদ্ধে এবং লড়াইয়ে আপনারা যুক্ত হন। সকলে মিলে চেষ্টা করলে আমরা অবশ্যই পারবো। আমরা একটি ফ্যাসিস্ট সরকারকে সরাতে পেরেছি, তাকে পালিয়ে যেতে বাধ্য করেছি। মানুষের মধ্যে যে আকাঙ্ক্ষা আছে সেই আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের জন্য কাজ শুরু করতে যাচ্ছি। সকলে যদি সহযোগিতা করেন তাহলে এটা আমরা সাফল্যমণ্ডিত করতে পারব। আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি বাংলাদেশের মানুষ পরিবর্তনের পক্ষে ‘হ্যাঁ’ ভোট দিতে প্রস্তুত হয়ে আছে।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক সালেহ্ হাসান নকীব এর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের সদস্য অধ্যাপক ড. মো. আনোয়ার হোসেন। স্বাগত বক্তব্য রাখেন উপউপাচার্য ড. মোহাম্মদ মাঈন উদ্দীন।
বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্যগণ, ছাত্র প্রতিনিধি, আহত জুলাই যোদ্ধাগণ এবং জুলাই শহিদ সাকিব আনজুম-এর পিতা মো. মাইনুল হক প্রমুখ সভায় বক্তৃতা করেন। অনুষ্ঠানে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক- শিক্ষার্থী, সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারী, সুধীজন এবং গণমাধ্যমকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।