
রংপুরের পীরগঞ্জ উপজেলার স্মৃতিবিজড়িত ও প্রাচীন নিদর্শনসমৃদ্ধ একটি স্থান রাজা ভীম চন্দ্রের প্রাসাদ। সরকারের যথাযথ কর্তৃপক্ষের দৃষ্টির অভাবে যার স্মৃতিচিহ্ন আজ বিলুপ্তির পথে। বেদখল হয়ে গেছে রাজপ্রাসাদসহ প্রায় ৩০ একর জমি। এখনও এ দখল প্রক্রিয়া অব্যাহত রয়েছে।
প্রাপ্ত তথ্য ও সরেজমিন এলাকা ঘুরে জানা গেছে, পীরগঞ্জ উপজেলার ভেন্ডাবাড়ী ইউনিয়নের ভীমশহর মৌজায় এ রাজপ্রাসাদটির অবস্থান।
কথিত আছে, এক সময়ের প্রভাবশালী রাজা ছিলেন ভীম চন্দ্র। তিনি উক্ত মৌজায় বসবাসের মাধ্যমে বিশাল এলাকা শাসন করতেন। তার বসবাসের জন্য সেখানে প্রায় ৮ একর আয়তনের জমির ওপর নির্মাণ করেন সুউচ্চ রাজপ্রাসাদ।
চতুর্পাশে বিশাল উঁচু প্রাচীরবেষ্টিত নিরাপদ প্রাসাদে অবস্থান করতেন রাজা ভীম চন্দ্র ও তার ছোট ভাই ভূবন চন্দ্রসহ পরিবারের সদস্যরা, যেখানে প্রতিপক্ষের আক্রমণের কোনো সামর্থ্য ছিল না।
প্রাসাদ সংলগ্ন পূর্ব পাশে সুরক্ষিত ও উঁচু স্থানে ছিল তাদের হাওয়া খানা। সেখানে তারা উপভোগ করতেন নির্মল বায়ু। এ প্রাসাদটি এলাকাবাসীর কাছে এখন ‘বুরুজ’ নামে পরিচিত। এ রাজপ্রাসাদ থেকে পূর্বে প্রায় ৫০০ মিটার দূরে ছিল উঁচু পাড়বেষ্টিত এক বিশাল আয়তনের পুকুর।
প্রায় ১৬ একর আয়তনের এ পুকুরে রাজা ভীম চন্দ্র ও তার পরিবারের সদস্যরা হাতির পিঠে চড়ে এসে গোসল করতেন, যা এখন ‘ভুয়ার পুকুর’ নামে পরিচিত। সে পুকুর ও পাড়ের অস্তিত্ব আজও বিদ্যমান থাকলেও পুকুরটি অনেকটাই ভরাট হয়ে গেছে।
রাজা ভীম চন্দ্রের অপর ভাই ভূবন চন্দ্রের গোসলের জন্যও ভুয়ার পুকুর থেকে অনতিদূরে ছিল পৃথক একটি পুকুর, যা এখন ‘ছোট পকড়া’ নামে পরিচিত। কথিত আছে, প্রায় ৬ একর আয়তনের এ পুকুরটিতে ভূবন চন্দ্র ও তার পরিবারের সদস্যরা পৃথক হাতির পিঠে চড়ে এসে গোসল করতেন। সেটির প্রায় ভরাট হয়ে গেলেও নামমাত্র পুকুরটির অস্তিত্ব আজও বিদ্যমান রয়েছে।
এ প্রাসাদের পরিস্থিতি সম্পর্কে বলতে গিয়ে দখলদারদের ভয়ে কেউ নিজেকে প্রকাশ করতে চান না। তবে তাদের অনেকে প্রতিক্রিয়ায় জানান, রাজা ভীম চন্দ্র ও ভূবন চন্দ্রের রাজপ্রাসাদটি মূল সমতল ভূমি থেকে প্রায় ৩০ ফুট উঁচু ছিল। দীর্ঘদিন ধরে এলাকার লোকজন প্রাসাদের ইট ও সড়কি নিয়ে যাওয়ার কারণে এর উচ্চতা ১০ ফুট হ্রাস পেয়েছে।
অপরদিকে, রাজাদের জন্য ভুয়ার পুকুর ও ছোট পকড়া নামে যে দুটি বিশাল আয়তনের পুকুর ছিল, সেগুলোও অনেকটাই ভরাট হওয়ার কারণে শুধু মাত্র পুকুরগুলোর অস্তিত্ব বিদ্যমান রয়েছে।
এদিকে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন এ প্রতিনিধির কাছে অভিযোগ করে বলেন, রাজা ভীম চন্দ্র ও ভূবন চন্দ্রের রাজপ্রাসাদসহ তাদের গোসলের পুকুরগুলো মিলিয়ে প্রায় ৩০ একরের মতো জমি রয়েছে। কিন্তু সে জমিগুলো এলাকার কয়েকজন ব্যক্তি তাদের দখলে নিয়ে সেখানে চাষাবাদ ও মাছ চাষ করছেন। তারা কীভাবে জমিগুলো ভোগদখলের সুযোগ পেল, তা এলাকার লোকজনের বোধগম্য নয়।
এদিকে কিছুদিন পূর্বে রাজা ভীম চন্দ্রের স্মৃতি নির্মূলের লক্ষ্যে প্রাসাদের বিলুপ্তপ্রায় অংশ থেকে একাধিক ব্যক্তি স্কেভেটর দিয়ে মাটি কেটে বিক্রি করছেন। এ পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে প্রাসাদের পুরো জমি বেদখলে যাবে। থাকবে না রাজপ্রাসাদের কোনো অস্তিত্ব।
তবে এলাকাবাসী মনে করেন, রাজা ভীম চন্দ্র ও ভূবন চন্দ্রের রাজপ্রাসাদ ও তাদের জমিগুলোর ব্যাপারে সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগের খতিয়ে দেখা উচিত।
তাদের মতে, জমিগুলো বেদখল হয়ে গেছে। বেদখলকৃত জমিগুলো উদ্ধারের সম্ভাবনার পাশাপাশি রাজপ্রাসাদ ও দুটি পুকুর সংরক্ষণের মাধ্যমে এ স্থান থেকে সরকারের মোটা অঙ্কের রাজস্ব আদায়ও সম্ভব। তাই এলাকাবাসী এ ব্যাপারে সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ কামনা করছেন।